kalerkantho

মঙ্গলবার । ৩০ আষাঢ় ১৪২৭। ১৪ জুলাই ২০২০। ২২ জিলকদ ১৪৪১

চেনা আঙিনায় মমিনুলের ফেরা

সামীউর রহমান   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চেনা আঙিনায় মমিনুলের ফেরা

ছবি : মীর ফরিদ

বছর তিনেক আগে, মিরপুরের শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের এ সংবাদ সম্মেলনকক্ষেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজের জন্য দলের নাম ঘোষণায় নির্বাচকরা যখন মমিনুল হকের নামটা বাদ দিয়েছিলেন, তখন তুমুল হট্টগোল। এ বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে বাদ দিতে চেয়েছিলেন সেই সময়কার কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে। তাঁর ব্যাখ্যা মমিনুল শর্ট বলে দুর্বল, ইত্যাদি ইত্যাদি। গণমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর মমিনুল স্কোয়াডে এলেন। বছর তিনেক পর বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে মিরপুরের সেই সংবাদ সম্মেলনকক্ষেই কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর পাশে বসলেন মমিনুল। হাতুরাসিংহে এখন কার্যত বেকার, নিজের দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে ইতি টানার অধ্যায়টা সুখকর হয়নি তাঁর। জীবনের বহতা স্রোতে কখনো জোয়ার, কখনো বা ভাটার টান। টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে অনাকাঙ্ক্ষিত একটা পরিস্থিতিতে আচমকা দায়িত্ব পাওয়ার পর মমিনুল হয়তো বিমানের বিজনেস ক্লাস টিকিট বা হোটেলের স্যুইট রুম পাচ্ছেন ঠিকই; কিন্তু ব্যাটে যে রানখরা। অবশ্য মমিনুল তাঁর টেস্ট ক্যারিয়ারের বেশির ভাগ রান করেছেন বাংলাদেশের মানচিত্রের ভেতরই। অধিনায়ক হিসেবে আজ খেলতে নামছেন চতুর্থ টেস্ট, দেশের মাটিতে প্রথম। প্রকৃতিতে বসন্ত এসে গেছে, মমিনুলের ব্যাটে বসন্তের সৌরভ কি আসবে?

বছর সাতেকের খেলোয়াড়ি জীবনে ৩৯টা টেস্ট খেলেছেন মমিনুল, যার ২২টি দেশের মাটিতে। এখন পর্যন্ত করেছেন ২৭২৮ রান, যার ভেতর ১৯৯২ রান করেছেন দেশে। অঙ্কের হিসাবে, ক্যারিয়ারের প্রায় ৭১ শতাংশ রানই মমিনুল করেছেন দেশের মাটিতে। সর্বোচ্চ ১৮১ রানের ইনিংসসহ ক্যারিয়ারের ৮ টেস্ট সেঞ্চুরির সব কয়টিই মমিনুল করেছেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের চৌহদ্দিতেই। তাই প্রতিপক্ষ যখন জিম্বাবুয়ে, যাদের বিপক্ষে ৫ টেস্টে দুটো শতরান আর দুটো অর্ধশত রানের ইনিংস আছে, তখন আশা করাই যায় তাদের বিপক্ষে হাসবে মমিনুলের ব্যাট। আর অধিনায়কের ব্যাট যদি হাসে, তাহলে সেই আত্মবিশ্বাস ছড়াবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আর সতীর্থদের কাছ থেকে জবাবদিহি আদায়ের ক্ষমতায়ও, আখেরে যেটা প্রভাব ফেলবে ম্যাচের ফলে।

মমিনুলের দুর্ভাগ্য, তাঁর অধিনায়কত্বের শুরুতেই ভারত ও পাকিস্তান সফরের মতো দুটো কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ভারত সফরের আগে খেলোয়াড়দের ধর্মঘটসহ নানা ঘটনা পরিক্রমায় হয়নি ঠিকঠাক প্রস্তুতি। এর ওপর কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই ইডেনে গোলাপি বলে খেলাটা অনেকটা হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দেওয়ার মতোই। ভারত সফরে মমিনুলের ব্যাটিংটাও হয়েছে খারাপ, সেটা প্রভাব ফেলেছে তাঁর মনোজগতেও। সংবাদ সম্মেলনে এসে ‘সাংবাদিকদের চাপেই খেলোয়াড়রা ভালো খেলতে পারে না’ ধরনের কথাবার্তা বলে-সেধে সমালোচনা কুড়িয়েছেন। ভারত সফরের পর পাকিস্তান সফর, সেখানেও নিরাপত্তার ঘেরাটোপে মনোসংযোগ প্রবাহিত ভিন্ন খাতে। অধিনায়ক হিসেবে মমিনুলের প্রথম দুটো সফরের পরিস্থিতি ছিল একই রকম, সফর ঘিরে অনিশ্চয়তা আর সেরা খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি। ভারত সফরের আগে ধর্মঘট আর পাকিস্তান সফরের আগে নিরাপত্তা—দুটো ব্যাপার নিয়েই যথেষ্ট জল ঘোলা হওয়ার পর প্রায় বিনা প্রস্তুতিতেই খেলতে নেমে পড়তে হয়েছে মমিনুলের দলকে। ভারত এবং পাকিস্তান—দুটো সিরিজেই ছিল না কোনো ট্যুর ম্যাচ, যা টেস্টের আদর্শ প্রস্তুতিরই অংশ। সেই সঙ্গে দুটো সফরেই দলের সেরা খেলোয়াড়দের পাননি মমিনুল। ভারত সফরে অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর পাশে থাকতে ছুটিতে ছিলেন তামিম ইকবাল। পাকিস্তান সফরে নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজেকে সরিয়ে নেন মুশফিকুর রহিম। সাকিব আল হাসান তো নিষিদ্ধই। মাহমুদ উল্লাহ লাল বলে ক্রমাগত ব্যর্থতার খেসারত দিয়ে এ সিরিজে তো বাদই পড়ে গেলেন। অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতি এবং নিষপ্রভ পারফরম্যান্সের দায়ভারও নিতে হয়েছে অধিনায়ক মমিনুলকে।

অন্ধকার রাতের পরই তো আসে সূর্যের দিন। মমিনুলও মনে করছেন, আস্তে আস্তে গণমাধ্যম সামাল দেওয়াসহ মাঠে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং অন্যান্য কাজও উপভোগ করতে শিখছেন, ‘প্রথম প্রথম আমি এসব জায়গায় (গণমাধ্যম) একটু অস্বস্তিতে ভুগতাম, পাকিস্তানেও সহজ হয়ে এসেছিল। এখন পর্যন্ত আল্লাহর রহমতে এখন অনেক ভালো। পরিবেশ বলেন বা অন্য কিছু আগের তুলনায় অনেক অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। আর জিনিসটা (অধিনায়কত্ব) অনেক বেশি উপভোগ করছি। মাঠে সব সময়ই উপভোগ করতাম। ফিল্ডিং বলেন, ব্যাটিং বলেন; যা বলেন সব এখন আরো বেশি মানিয়ে নিয়েছি। প্রথম একটা সিরিজ একটু চ্যালেঞ্জিং ছিল এখন আরো বেশি স্বাচ্ছন্দ্য এসেছে।’ কিছুদিন আগে প্রধান নির্বাচক থেকে বোর্ড প্রধান, সবারই সমালোচনার লক্ষ্য ক্রিকেটাররা। মাঠের পারফরম্যান্সের দুর্দশাই যার কারণ। মমিনুল মনে করেন, একটা জয়ই বদলে দিতে পারে পরিস্থিতিটা, ‘আমরা যদি ম্যাচটা জিততে পারি পুরো জিনিসটাই বদলে যাবে। আমরা যে খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, সেটা পার করা হবে। আমার কাছে মনে হয়, যেভাবে আমরা অনুশীলন করছি এবং ট্রেনিং সেশন চলছে, তাতে খারাপ সময়টা অনেকটাই বদলে যাবে।’

গত বছর নিউজিল্যান্ড সফরে হ্যামিল্টনে সৌম্য সরকার ও মাহমুদ উল্লাহর শতরানের পর টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের আর কোনো ক্রিকেটারেরই শতরান নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে এ খরাটাও কাটবে বলেও কথা দিলেন মমিনুল, ‘পুরো দলের কথাই বলছি, আমার কথা বলছি না। আমাদের দলের কেউ ১০০, ২২০ বা ৩০০ করবে কথা দিলাম। যে কেউই হোক বড় ইনিংস খেলবে ইনশাআল্লাহ।’

কথা তো দিলেন অধিনায়ক, কথা রাখতে নিজেই যদি সবচেয়ে সচেষ্ট হন তাহলেই সবার ভালো। দলের, নিজের এবং দিন শেষে বাংলাদেশের ক্রিকেটেরও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা