kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ চৈত্র ১৪২৬। ৭ এপ্রিল ২০২০। ১২ শাবান ১৪৪১

ডাউন দ্য উইকেট

বাংলা-ক্রিকেট

সাইদুজ্জামান   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের গা সওয়া হয়ে গেছে। তবে বিদেশিদের কথা ভিন্ন। বিশেষ করে ওটিস গিবসনের মতো নবাগতদের। সাবেক ক্যারিবীয় এ ক্রিকেটার তাই জাতীয় দলের প্রতিটি প্র্যাকটিস সেশনে সংবাদকর্মীদের উপচে পড়া কৌতূহল দেখে একদিন টিপ্পনী কাটলেন, ‘তোমাদের কি ঘর-সংসার নেই?’ গিবসন তো আর জানেন না যে খেলা কিংবা প্রস্তুতি ক্যাম্প না থাকলেও বিসিবির ডেরায় নিয়মিত যাতায়াত থাকে জনা পঞ্চাশেক সংবাদকর্মীর।

খুব কৌতূহল ছিল গিবসনের কাছ থেকে জানার যে গতকালের অনুশীলনে বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসানের আকস্মিক আবির্ভাব দেখে কতটা চমকেছিলেন তিনি! নিয়মিত মাঠে-ঘাটে ছোটাছুটি করা স্থানীয় সংবাদকর্মীদের কাছে অবশ্য এ দৃশ্য অভূতপূর্ব নয়। পাকিস্তান সফরের আগে সেন্টার উইকেটে তামিম ইকবালের ব্যাটিং অনুশীলন থামিয়ে বোর্ড সভাপতির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা গেছে। সেটা নিয়ে যথারীতি ট্রলিং হয়েছিল। তবে পরে জানা গেছে, দুজনের আলোচনায় ক্রিকেট ছিল না। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মগ্ন জাতির কি আর অত ভাবনার সময় আছে! বোর্ড সভাপতিকে কোচ বানিয়ে বিস্তর কৌতুক করা হয় তখন। অবশ্য আজকাল ফেসবুক বোধকরি বাজার হারাচ্ছে মারমুখী ‘ইউজার’দের কারণে। গতকালই এক ফেসবুক সেলিব্রিটি এ নিয়ে আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘মানুষ কি ভয়ংকর সব কমেন্ট করে! তাই আজকাল আর লিখি না। নতুন বইয়ের প্রোমো করি আর মাঝেমধ্যে বাচ্চাদের ছবি দিই।’ তার মানে, নেটের পাশে দাঁড়িয়ে তামিমের সঙ্গে ফ্রেমে বন্দি হওয়া ওই ছবির ‘সামাজিক’ প্রতিক্রিয়া দেখে সম্ভবত বিচলিত হননি বোর্ড সভাপতি।

তিনি বিচলিত নন কখনোই। নইলে গতকাল আবার প্র্যাকটিসে আসবেন কেন? এসেছেন এবং এক এক করে হেড কোচ রাসেল ডমিঙ্গো থেকে শুরু করে তামিম এমনকি, প্রধান মাঠকর্মী গামিনি ডি সিলভার সঙ্গেও সৌজন্য বিনিময় করেছেন। এসব দেখে সংবাদকর্মীদের ঘিরে জেগে ওঠা ওটিস গিবসনের বিস্ময়ভাব কেটে যাওয়ার কথা। যে দেশের বোর্ড প্রধান প্র্যাকটিসে আসেন সে দেশের সংবাদকর্মীদের তো মাঠের সবুজ গালিচায় রাত কাটানোর কথা!

এটাই বাংলাদেশ। অবশ্য ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের অনুসারীরা ‘এটাই বাংলাদেশ’ মানতে আপত্তি করবেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের আর কোনোকালের সভাপতিই তো প্রকাশ্যে বলেননি যে, ‘এখন থেকে দলে ইন্টারফেয়ার করব’। তবে অনেকেই করেছেন, নাজমুলের মতো ‘স্বীকারোক্তি’ দেননি।

এটাকে স্বীকারোক্তি বলার কারণ দল গঠন থেকে শুরু করে একাদশ নির্বাচন, এমনকি ব্যাটিং অর্ডার ঠিক করার ব্যাপারেও মতামত দিয়ে থাকেন নাজমুল হাসান—দলসংশ্লিষ্টদের দীর্ঘদিনের অনুযোগ বোর্ড সভাপতি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন ওই ঘোষণায়। এ তো স্বীকারোক্তিই। তবু সংবাদকর্মীদের বছরজুড়ে মাঠে পড়ে থাকা কিংবা প্র্যাকটিসে বোর্ড সভাপতির উপস্থিতির চেয়ে জাতীয় দল গঠনে নাজমুলের হস্তক্ষেপ করার অভিপ্রায় প্রকাশ অভাবিত। অভাবিত কারণ, এ জাতীয় ঘোষণা ক্রিকেট পরিমণ্ডলে বিশ্বজয়ী যুবদলকে সংবর্ধনার দিনেই প্রথম শোনা গেছে।

এটা ঠিক যে বিসিবির দুই স্তরের নির্বাচকদেরই দল চূড়ান্ত হয় বোর্ড সভাপতি অনুমোদন দেওয়ার পর। অনুমোদনের ব্যাপার যখন গঠনতন্ত্রে আছেই, তখন পছন্দ-অপছন্দ জানাতে দোষ কোথায়? হতে পারে, এ ভাবনা থেকেই সময় সুযোগ পেলে টিম মিটিংয়েও উপস্থিত থাকেন নাজমুল হোসেন। গঠনতন্ত্রের কোথাও তো আর লেখা নেই যে, দলীয় সভায় থাকতে পারবেন না বোর্ড সভাপতি। কিন্তু সমস্যা হলো, তাঁর সঙ্গে কিছু সভায় বোর্ডসংশ্লিষ্ট নন এমন ব্যক্তিদেরও দেখা গেছে। জাতীয় দলের প্রত্যেকের একটির বেশি মাথা নেই কিংবা অজানা ভয় থেকেও সভাপতির পাশের অননুমোদিত ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে না কেউ। তা আড়ালে যতই অস্বস্তির কথা বলুন না কেন তাঁরা।

সংবাদমাধ্যমে বোর্ড সভাপতির খোলামেলা বক্তব্য নিয়েও অস্বস্তি আছে দলে। টিম মিটিংয়ের খুঁটিনাটি যে প্রকাশ্য করে ফেলেন নাজমুল হাসান! সবশেষ ভারত ও পাকিস্তান সফরে টসের সিদ্ধান্ত, একাদশ এবং ব্যাটিং অর্ডার সাজানো নিয়ে বোর্ড সভাপতি এমন কিছু ‘সত্য’ প্রকাশ করেছেন, যা কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পুরো টিম ম্যানেজমেন্টকে। যদিও টিম ম্যানেজমেন্টের কাছে ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। কিন্তু বোর্ড সভাপতির বিরাগভাজন হওয়ার আশঙ্কায় সে ব্যাখ্যা ড্রেসিংরুমের চার দেয়ালেই বন্দি আছে। প্রশাসক হিসেবে এটা নাজমুল হাসানের বিরল সাফল্য। দেশের ক্রিকেট পরিবারের গুরুজন তিনি উপভোগ করছেন সর্বজনীন একাধিপত্য।

এমন কর্তৃত্ব অর্জন যেকোনো প্রশাসকের জন্য কৃতিত্বের। কিন্তু আশঙ্কার জায়গা হলো এ কর্তৃত্ব না তাঁকে আবার ভুল পথে পরিচালিত করে! নাজমুল হাসান না-ও জানতে পারেন যে, তাঁকে ‘না’ বলার কেউ নেই ক্রিকেটাঙ্গনে। তাই বোর্ড সভাপতি ভুল করলেও সেটি শুধরে দেওয়ার মতো কেউ তাঁর আশপাশে নেই। অথচ নাজমুল হাসান তো রক্তমাংসেরই একজন মানুষ, ভুল তাঁরও হতে পারে। তিনি করেনও। এই যেমন জাতীয় দলে হস্তক্ষেপের ঘোষণা দেওয়া নিয়ে অনেক ফিসফাস হয়েছে বোর্ড সভাপতিরই ঘনিষ্ঠদের মাঝে। কিন্তু তাঁদের কেউই মুখফুটে বলেননি, ‘স্যার, এভাবে না বললেও হতো।’ নেতা প্রবল ক্ষমতাধর হলে এমনটাই হয়। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো এ ঘরানার নেতা আকস্মিক বিপদগ্রস্ত হলে চারপাশে কাউকে খুঁজে পান না। তার চেয়েও আশঙ্কার, তত দিনে তাঁর নেতৃত্বের ক্ষেত্রটাও প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন এর ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কেউ আশপাশে থাকে না।

অবশ্য তবু শ্রীলঙ্কার থেকে ভালো অবস্থা বাংলাদেশ ক্রিকেটের। সরাসরি ক্রিকেটের লোক না হয়েও দল নির্বাচন এবং বোর্ড পরিচালনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করে শ্রীলঙ্কার ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। তবে ক্রিকেট সংগঠক হিসেবে পূর্বপরিচিতি রয়েছে নাজমুল হাসানের। বিসিবি সভাপতির চেয়ারে বসার আগে নাজমুল ছিলেন আবাহনী লিমিটেডের ক্রিকেট কমিটির চেয়ারম্যান।

ইনিয়ে-বিনিয়ে এই এত কথা বলার অবশ্য ভিন্ন কারণও রয়েছে। ইদানীং দুটি ইংরেজি ভাষার জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট রয়েছে। দেশীয় ইংরেজি দৈনিক তো রয়েছেই। তো, এদের বরাতে সারা বিশ্বের ক্রিকেট অনুসারীরা এরই মধ্যে হয়তো জেনে গেছেন যে বিসিবি সভাপতি জাতীয় দলে ‘ইন্টারফেয়ার’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের অন্যতম সফল অধিনায়ক হয়েও সৌরভ গাঙ্গুলি এ জাতীয় কোনো পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেননি। অন্য অনেক দেশের ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতির নামই তো অনেকের অজানা, পর্দার আড়ালেই থাকেন তাঁরা। তাই বলে সেসব দেশের ক্রিকেট তো পিছিয়ে যায়নি। ভারত বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করছে। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডকে নিয়ে ক্রিকেটীয় শক্তিতেও তারা ‘বিগ থ্রি’। সেখানে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবস্থান কোথায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব বিসিবির বোর্ডরুমের। নীতিনির্ধারকরা ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা ঠিক করবেন। আর সেটির অনুসরণে ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন নির্বাহীরা।

হতাশার ছবি হলো, তারাও নিজেদের ক্যারিয়ার ‘সভাপতিমুখী’ জ্ঞান করেন। গতকালের ছোট্ট একটি ঘটনার কথাই বলি। মিরপুরের আউটফিল্ডের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই শোচনীয়। উকুন বাছার মতো বছরজুড়ে বাজে ঘাস বাছেন মাঠকর্মীরা। তাই স্বভাবতই এর ওপর দিয়ে অনাহূতদের হাঁটাহাঁটি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করেছেন বিসিবির গামিনি। এ নিয়ে আগের দিন একদফা বাগ্যুদ্ধও হয়েছে মাঠকর্মী ও সংবাদকর্মীদের। কিন্তু কি আশ্চর্য, গতকাল বোর্ড সভাপতির সঙ্গে আরো দুজনকে জুতা পায়ে মাঠে হাঁটাহাঁটি করতে দেখেও কিছু বলেননি গামিনি!

কেন বলেননি? তাঁকে জিজ্ঞাসা করে উত্তর জানার দরকার নেই। দেশীয় ক্রিকেট সংস্কৃতিটাই এখন একমুখী—বোর্ড সভাপতি খুশি তো? তাই হাইপ্রফাইল অনাহূতদের মাঠ ছাড়ার কথা বলে ভিনদেশি গামিনি সম্ভবত বিরাগভাজন হতে চাননি বোর্ড সভাপতি ঘনিষ্ঠদের।

গামিনি দীর্ঘদিন আছেন, তাই তরিকা জানেন। শুনছি কয়েক মাসের অভিজ্ঞতায় ‘বাংলা-ক্রিকেট’ বুঝে গেছেন ডমিঙ্গোও। গিবসনের আর কয়েকটা দিন লাগবে হয়তো!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা