kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দুঃসময়ের ঘূর্ণাবর্তে টেস্টের বাংলাদেশ

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুঃসময়ের ঘূর্ণাবর্তে টেস্টের বাংলাদেশ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : তাইজুল ইসলাম রেগে যান। কেন রাগেন, তিনিই জানেন। সাম্প্রতিক সময়ে টেস্টে বাংলাদেশের ভরাডুবির বড় কারণ যে স্পিনারদের ব্যর্থতা, সেটি কার না জানা! স্পিনের সবচেয়ে বড় তুরুপের তাস যে সাকিব আল হাসান, তা-ও কারো অজানা নয়।

কিন্তু সেগুলো মনে করিয়ে দিতেই কাল জাতীয় দলের অনুশীলন শুরুর দিন যেন রেগে যান তাইজুল। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজে ক্রোধের চেয়ে স্পিনারদের পারফরম্যান্সটা বেশি প্রয়োজন যদিও।

টেস্ট ক্রিকেটে বড্ড খারাপ সময় যাচ্ছে বাংলাদেশের। ২০১৯ সালের শুরু থেকে ধরলে যে ছয়টি ম্যাচ খেলেছে, হার সবগুলোতে। এর মধ্যে ইনিংস হার পাঁচ টেস্টে। যেখানে ওই পরিণতি না, সেটির পরিণতিও কম করুণ নয়। দেশের মাটিতে আফগানিস্তানের মতো দলের কাছে ২২৪ রানে হার। এমন ছন্নছাড়া পারফরম্যান্সে স্পিনারদের দায় এড়ানোর উপায় নেই। সাকিবের অনুপস্থিতি এখানে রাখে বড় ভূমিকা। এ অর্ধডজন টেস্টের মধ্যে কেবল আফগানিস্তানের বিপক্ষেই খেলেছেন তিনি। ইনজুরির কারণে যাননি নিউজিল্যান্ড, এরপর নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারত-পাকিস্তানে। চ্যাম্পিয়ন ওই বাঁহাতি স্পিনারের অনুপস্থিতিতে স্পিন-নেতৃত্ব তো নিজের কাঁধেই তুলে নেওয়ার কথা তাইজুলের। ২৮ টেস্টে ১০৮ শিকারের অভিজ্ঞতায় যিনি সাকিবের সবচেয়ে কাছাকাছি।

কেন এমন হচ্ছে? বিদেশের উইকেট-কন্ডিশনের দায় কতটা? আবার সাকিবের অনুপস্থিতির কতটা। তাঁর উপস্থিতিতে তো বিদেশেও ভালো পারফরম্যান্স রয়েছে স্পিনারদের। এ সূত্র ধরিয়ে করা প্রশ্নেই কাল তাইজুলের উষ্মা, ‘তাহলে আমরা এখন যারা স্পিনার আছি, তারা ভালো স্পিনার না। সাকিব ভাইয়ের মতো না। এটাই সত্যি। সাকিব ভাই থাকলে যেহেতু ভালো হতো, তাহলে এটাই উত্তর।’ কিন্তু রাগ করে হবেটা কী! বরং সাকিবের শূন্যতা পূরণে বর্তমান স্পিনারদের প্রস্তুতির কথা জানতে চাওয়া হয় তাইজুলের কাছে। তাতেও যেন রাগ কমে না, ‘তাহলে ওই মানের ক্রিকেটার আসতে হবে। ওই মানের স্পিনার আমাদের নেই।’ নেই বলেই কি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টে এত বেশি পেসার নেওয়া? বাঁহাতি স্পিনারের জবাব, ‘এ কারণে বেশি পেসার নেওয়া হয়েছে কি না, তা জানি না। পাকিস্তানে দুজন স্পিনার গিয়েছিল, আমি খেলেছি। আসলে বললাম তো, ওই মানের স্পিনার এখনো হয়নি। তাই ফলাফল এমন হচ্ছে।’

কারণ যা-ই হোক, টেস্টে বাংলাদেশের স্পিনারদের প্রভাব যে কমছে, পরিসংখ্যানেই তা স্পষ্ট। সর্বশেষ ছয় টেস্টে পাঁচটি ইনিংস ব্যবধানে হারের কথা আগেই বলা। অর্থাৎ, সে পাঁচ টেস্টে বোলাররা একবারই বোলিংয়ের সুযোগ পেয়েছেন। তাতে পেসার-স্পিনার কারো অবস্থাই খুব সুবিধার না। তবে বাংলাদেশের প্রথাগত শক্তি যেহেতু স্পিন বিভাগ, সেখানকার ব্যর্থতা তাই বেশি দৃষ্টিকটু।

নিউজিল্যান্ড সফরে হ্যামিল্টনে প্রথম টেস্টের কথা ধরুন। সেখানে একমাত্র স্পেশালিস্ট স্পিনার খেলেন মেহেদী হাসান। দুই উইকেট নেন ৪৯ ওভারে ২৪৬ রান দিয়ে। বাংলাদেশের বোলারদের মধ্যে টেস্টের এক ইনিংসে সবচেয়ে খরুচে বোলিংয়ের বিব্রতকর রেকর্ড এটি। ২০১৮ সালে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাইজুলের ৬৭.৩ ওভারে ২১৯ রান ছাপিয়ে। মেহেদীর বোলিং ফিগার আরো বিশ্রী দেখাচ্ছে ৫.০২ ইকোনমির কারণে!

ওয়েলিংটনেও নিউজিল্যান্ডের এক ইনিংসের বেশি ব্যাটিং করার প্রয়োজন পড়েনি। এবার একাদশে একমাত্র স্পিনার হিসেবে খেলা তাইজুল ২১ ওভারে ৯৯ রানে নেন দুই উইকেট। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ঘরের মাঠের টেস্টে আবার একাদশে চার স্পিনার। কোনো স্পেশালিস্ট পেসার নেই। সাকিব-তাইজুল-মেহেদী-নাঈম হাসানের সঙ্গে সে ম্যাচে হাত ঘোরান মাহমুদ উল্লাহ, মমিনুল, মোসাদ্দেকরাও। দুই ইনিংসে ২০৭.১ ওভারের মধ্যে কেবল সৌম্য সরকারের চার ওভার পেস বোলিং। বাকি পুরোটাই স্পিনারদের। একটি রান আউট বাদে ম্যাচে আফগানদের ২০ উইকেটের বাকিগুলোর শিকার ঘূর্ণি বোলারদের। কিন্তু প্রতিপক্ষের রশিদ খান-মোহাম্মদ নবী-জহির খান ত্রয়ীর সঙ্গে যে পেরে ওঠেননি, টেস্টে ২২৪ রানে বাংলাদেশের হারেই এর প্রমাণ।

এরপর সাকিবহীন অধ্যায়ের শুরু ভারতের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে। ইন্দোরের প্রথম টেস্টে ২৮ ওভারে  উইকেটশূন্য তাইজুল, ১২৫ রানে ১ উইকেট মেহেদীর। কলকাতার দ্বিতীয় টেস্টে একাদশে ছিলেন নাঈম। বাউন্সারে মাথায় আঘাত পেয়ে বেরিয়ে গেলে তাঁর জায়গায় খেলেন তাইজুল। ৮০ রান দিয়ে এক শিকার তাঁর। আর মেহেদী ব্যাটিং করলেও বোলিং করতে পারেননি। কারণ লিটন দাসের ‘কনকাশন সাব’ হিসেবে নামায় শুধু ব্যাটিংয়ের অনুমোদন ছিল। কলকাতায়ও বাংলাদেশের বোলারদের এক ইনিংস। পাকিস্তানের বিপক্ষে রাওয়ালপিন্ডিতেও তাইজুল ১৩৯ রান দিয়ে দুই উইকেট নেন তিনি।

সর্বশেষ ছয় টেস্টে বাংলাদেশের ব্যর্থতা যেন স্পিনারদের ব্যর্থতারই প্রতিবিম্ব। স্পিনারদের প্রতিনিধি হিসেবে তাইজুলের পারফরম্যান্স যেন এরই প্রতিচ্ছবি। এ সময়ে দেশের খেলায় ছয় টেস্টের পাঁচটিতে বোলিং করেছেন। এর আগ পর্যন্ত বাঁহাতি স্পিনারের ক্যারিয়ার গড় যেখানে ছিল ৩০.৬৫, এ সময়ের ১১ শিকারে সেটি প্রায় দ্বিগুণ—৫৮.১৮। স্ট্রাইকরেটের বেলাতেও ছবিটা অভিন্ন। আগে যেখানে প্রতি উইকেটের জন্য ৫৮টি বল করেছেন, সর্বশেষ ছয় টেস্টে সেখানে ১০০.৩টি করে বল করতে হয়েছে।

তাইজুল তাই শুধু শুধু রেগে গেলেই তো হবে না!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা