kalerkantho

শুক্রবার । ২০ চৈত্র ১৪২৬। ৩ এপ্রিল ২০২০। ৮ শাবান ১৪৪১

কেন বারবার জিম্বাবুয়ে?

সামীউর রহমান   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কেন বারবার জিম্বাবুয়ে?

বিমান সংস্থাগুলোর ‘ফ্রিকোয়েন্ট ফ্লাইয়ার’ কর্মসূচিতে নিশ্চয়ই হাজার হাজার ‘স্কাই মাইল’ জমা হয়ে আছে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটারদের। পাসপোর্ট বইয়ের পাতাগুলোও বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের সিল-ছাপ্পরে ভরে যাওয়ার কথা। কারণ গত এক দশকে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটাররা প্রায় প্রতিবছরই এসেছেন বাংলাদেশে। কখনো টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে, কখনো ত্রিদেশীয় সিরিজের একটি দল হিসেবে আবার কখনো বা পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে। এবারও জিম্বাবুয়ে চলে এসেছে বসন্তের প্রথম দিনে। বাংলাদেশের জাতীয় দলের সাফল্যে যখন চৈত্রের খরা, তখন জিম্বাবুয়ের আগমন মানেই বাসন্তী বাতাস। জিম্বাবুয়ে মানেই যে কিছু নিশ্চিত সাফল্য, নামের পাশে কিছু রান ও উইকেট। কিন্তু এ সাফল্য দমকা হাওয়ার সামনে খড়কুটোর মতোই উড়ে যায়, যখন প্রতিপক্ষ হয় শক্তিশালী কোনো দল। তাই অবধারিতভাবে প্রশ্ন চলেই আসে, এত দল থাকতে ঘুরেফিরে জিম্বাবুয়ের সঙ্গেই কেন এত খেলা হয় বাংলাদেশের?

নিরাপত্তার অজুহাতে কোনো দল সফর বাতিল করলে কিংবা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে হারের পর খানিকটা জয়ের দাওয়াই দিয়ে দলকে চাঙ্গা করার উপায় হিসেবেই আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে জিম্বাবুয়েকে। তাতে দেশের ক্রিকেটারদের সামর্থ্যের প্রমাণ যতটা না মিলছে, তার চেয়ে বেশি উপকার হচ্ছে জিম্বাবুয়ের ক্রিকেটের। বাংলাদেশে এলে সিকান্দার রাজাদের রোজগার তো হচ্ছেই, ভালো করলে ডাক মিলছে বিপিএল ও প্রিমিয়ার লিগেও। রায়ান বার্লের কথাই ধরা যাক। জিম্বাবুয়ের এ অখ্যাত লেগস্পিনার গত বছর ত্রিদেশীয় সিরিজে খেলতে এসে সাকিব আল হাসানের এক ওভারে ৩০ রান নিয়ে হয়ে যান বিখ্যাত! পরে বিপিএলে চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স তাঁকে দলে নেয় বেশ মোটা টাকাতেই। অঙ্কটা ৩০ হাজার মার্কিন ডলার! হ্যামিল্টন মাসাকাদজা, ব্রেন্ডন টেলর. ম্যালকম ওয়ালার, সিকান্দার রাজাসহ বেশ কয়েকজন জিম্বাবুইয়ান ক্রিকেটার বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটেরও নিয়মিত মুখ।

বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে ঠাঁই না পাওয়া জিম্বাবুয়ে কেন টেস্ট খেলতে ঢাকায়? ক্রিকেট অপারেশনস কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খান জানিয়েছেন, অতীতের ‘জমে থাকা’ ম্যাচগুলো খেলতেই তাদের বাংলাদেশে আসা, ‘ওদের সঙ্গে আমাদের এ সিরিজটা এফটিপিরই (ফিউচার ট্যুরস প্রগাম) অংশ। ২০১৮-১৯ মৌসুমে ওদের সঙ্গে খেলা ব্যস্ততার কারণে স্থগিত করা হয়েছিল। এশিয়া কাপ ছিল। যে কারণে খেলা হয়নি।’ আকরাম খান এটাও নিশ্চিত করেছেন, নিকট ভবিষ্যতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খেলা নেই বাংলাদেশের, টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরে কোনো দলের সঙ্গে খেলায় কোনো পয়েন্ট না থাকায় বাংলাদেশ আগ্রহী নয়। অবশ্য ২০১৫ সালে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে যখন অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশ সফর বাতিল করেছিল, তখন কিন্তু এফটিপির বাইরে থেকে এসেই ফাঁকা জায়গাটায় খেলেছিল জিম্বাবুয়ে!

আদর্শ প্রস্তুতি কখনোই নয়, তবে মন্দের ভালো। জিম্বাবুয়ে প্রস্তুতি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য খুব ভালো কোন প্রতিপক্ষ নয়।

ফারুক আহমেদ

সাবেক অধিনায়ক ও নির্বাচক ফারুক আহমেদ জিম্বাবুয়ের সঙ্গে খেলাটাকে দেখছেন ‘মন্দের ভালো’ হিসেবে, ‘আদর্শ প্রস্তুতি কখনোই নয়, তবে মন্দের ভালো। জিম্বাবুয়ে প্রস্তুতি বা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের সামর্থ্য যাচাইয়ের জন্য খুব ভালো কোনো প্রতিপক্ষ নয়। তবে কিছু রান করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়া, জয়ের অভ্যাসটা তৈরি হওয়ারও দরকার আছে। কিন্তু ভালো করতে হলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলেই তৈরি হতে হবে।’ একই সঙ্গে কৃতজ্ঞতাবোধেরও একটা জায়গা আছে বলে মনে করেন ফারুক, “আমরা যখন ‘ছোট’ (টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার প্রথম দিককার সময়ে) ছিলাম, তখন জিম্বাবুয়ে কিন্তু আমাদের পাশে ছিল।” জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট সিরিজজয়ী দলে ছিলেন নাফিস ইকবাল। তাঁর কথায়ও একই সুর, ‘কোনো দলকেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তারা কিন্তু দেশে এসেও গত বছর আমাদের হারিয়েছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুটো টেস্টেই খুব প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েছে। আর আমাদের আসলে এ মূহর্তে দলটা একটা খারাপ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, একটা জয় দরকার।’

২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া দল ও দক্ষিণ আফ্রিকা নারী দল বাংলাদেশ সফর বাতিল করলে জিম্বাবুয়ে তাদের জাতীয় দল ও নারী দল, দুটোই পাঠিয়ে দিয়েছিল বাংলাদেশে। সেই কৃতজ্ঞতার নাগপাশ এতটাই শক্ত যে আইসিসি যখন নিষিদ্ধ করেছে জিম্বাবুয়েকে, তখনো বাংলাদেশ তাদের আতিথ্য দিয়েছে। পুরনো বন্ধুকে ফিরিয়ে দেয়নি বিপদের সময়, তখন বিসিবি প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন সুজন বলেছিলেন, ‘একটা সময় বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনামূলক বেশি দ্বিপক্ষীয় সিরিজ খেলত জিম্বাবুয়ে। আমাদের অনুরোধে জিম্বাবুয়েই বেশি হাত বাড়িয়ে দিত। এখন আমরাও তাদের দিকে হাত বাড়িয়েছি।’ বিপদে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার উদাহরণ অবশ্য আরো আছে জিম্বাবুয়ের। ২০১৫ সালে পাকিস্তান সফর করেছিল জিম্বাবুয়ে, যখন অন্য কোনো দেশই পাকিস্তান সফর করতে জানিয়েছিল অপারগতা। সে জন্য প্রত্যেক ক্রিকেটারকে দেওয়া হয়েছিল ১২ হাজার ডলার, এমনটাই খবর এসেছে বেশ কিছু গণমাধ্যমে।

সাফল্যের নিশ্চয়তা, সহজলভ্যতা আর কৃতজ্ঞতা—এ সমীকরণেই সময়ে-অসময়ে বাংলাদেশে আসছে জিম্বাবুয়ে। তবে তাতে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নতি কতটা হচ্ছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ৩ ওয়ানডেতে ১৪৪, ৯০ ও ১১৫ রানের ইনিংস খেলে ৩৪৯ রান করার মাসখানেকের মাথায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সিরিজে ইমরুল কায়েসের দুটো ইনিংস ছিল যথাক্রমে ৪ ও শূন্য রানের। এরপর আর ওয়ানডেই খেলা হয়নি এ বাঁহাতি উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানের! নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার জিম্বাবুয়ের দলটাকে তুলনা করেছেন প্রিমিয়ার লিগের দলের সঙ্গে। তাই নামে ‘আন্তর্জাতিক’ হলেও মানে এবং বারবার আগমনে ‘স্থানীয়’ বনে যাওয়া জিম্বাবুয়ে দলের বিপক্ষে সাফল্যের আত্মতৃপ্তিতে সাময়িক হাততালি পাওয়া গেলেও সার্বিক বিচারে খেলোয়াড়দের সামর্থ্য বাড়াচ্ছে সামান্যই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা