kalerkantho

এবার ঘরে ফেরা

দলের বাইরে থেকে এসে বিশ্বজয়ী অধিনায়ক

সামীউর রহমান    

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দলের বাইরে থেকে এসে বিশ্বজয়ী অধিনায়ক

গোটা আসরে ফাইনালের আগে ব্যাটে বলার মতো রান নেই। অথচ ফাইনালে চাপের মুখে অমন ম্যাচ জেতানো ইনিংস! এই একটা ইনিংসই বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে জিতিয়েছে বিশ্বকাপ। তাই তো আকবর আলীকেই যুব বিশ্বকাপের এবারের আসরের সেরা দলের অধিনায়কও নির্বাচিত করেছে আইসিসি। অথচ এবারের বিশ্বকাপে খেলারই কথা ছিল না আকবরের। আপাতদৃষ্টিতে ছোট্ট একটা ঘটনা বদলে দিল ইতিহাসের গতিপথ। বিকেএসপিতে হয়ে যাওয়া দুটো ম্যাচ বদলে দিল আকবরের ভাগ্য, সেই সঙ্গে হয়তো বাংলাদেশেরও।

বিশ্বের সব নামকরা আর বড় বড় আবিষ্কারের অনেকগুলোই নাকি হয়ে গেছে ভাগ্যচক্রে। লন্ডনে হাসপাতালের গবেষণাগারে ভুল করে একটা জানালা খোলা রেখে যাওয়ার পরদিনই এসে পেনিসিলিন সম্পর্কে ধারণা পেরেছিলেন স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, রাডারসংক্রান্ত গবেষণাকাজের সময় পকেটে থাকা চকোলেট গলে যেতে দেখে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ধারণা পেয়েছিলেন পার্সি স্পেনসার। অনেকটা এভাবেই, হঠাৎ করেই আকবরের দলে আসা।

বছর তিনেক আগের ঘটনা। বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৯ দল তখন দেশে আফগানিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে সিরিজে বেশ বাজেভাবে হেরেছে। এর কিছুদিন পর বিকেএসপিতে কাজের ফাঁকে আলাপ করতে করতেই প্রতিষ্ঠানটির সেসময়কার প্রিন্সিপাল ইমরান রউফের কাছে একটি প্রস্তাব তোলেন ক্রিকেট দলের প্রধান কোচ হাসান। সেনাবাহিনীতে কর্মরত কর্নেল ইমরান বিকেএসপি থেকে এখন আবার ফিরে এসেছেন সামরিক দায়িত্বে, তবে সেই আলাপের কথা এখনো তাঁর স্মৃতিতে সতেজ, ‘হাসান ভাই আমাকে বললেন, অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে যদি আমরা এখানে ম্যাচ খেলার প্রস্তাব দিই তাহলে ওদের সঙ্গে খেললে আমাদের ছেলেদেরও খেলার উন্নতি হবে। আমাদেরও তো উনিশ বছরের কম বয়সী ক্রিকেটার আছে, তাদেরও একটা সুযোগ হবে।’ এরপর বিকেএসপিতে তিনটি ম্যাচের একটি সিরিজ হয়, যার দুটিতে খুব ভালো করেন আকবর। জায়গা হয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের স্কোয়াডে। সেখান থেকে মূল একাদশে, একটা সময় নেতৃত্বে। ইমরান মনে করেন, দারুণ প্রতিভা নিয়ে না জন্মালেও নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে সেই অনুযায়ী সামর্থ্যের সর্বোচ্চটা প্রয়োগের চেষ্টা আর ভাবনা-চিন্তার জগতে স্থিরতাই আকবরকে নিয়ে এসেছে আজকের অবস্থানে।

আকবরের মধ্যে খুব একস্ট্রা-অর্ডিনারি কোনো ব্যাপার ছিল না। শামীম হোসেনকে যেমন প্রথম দিন থেকে দেখেই মনে হয়েছিল যে সে বিশেষ প্রতিভা। আকবরকে আমার চোখে পড়ে আরো ১৫ দিন পরে।

ইমরান রউফ

সাবেক অধ্যক্ষ, বিকেএসপি

বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ককে নবম-দশম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে পেয়েছিলেন রউফ। তাঁর কাছেই জানা গেল, ‘আকবরের মধ্যে খুব একস্ট্রা-অর্ডিনারি কোনো ব্যাপার ছিল না। শামীম হোসেনকে  যেমন প্রথম দিন থেকে দেখেই মনে হয়েছিল যে সে বিশেষ প্রতিভা। আকবরকে আমার চোখে পড়ে আরো ১৫ দিন পরে।’ ক্রিকেট দক্ষতা নয়, আকবর সেসময়কার অধ্যক্ষের নজরে এসেছিলেন ভাবনা-চিন্তা করে কথা বলার পরিণিতিবোধের প্রমাণ দিয়ে। রউফের কাছ থেকেই জানা যায়, ‘আমি ওকে বলব নম্র, ভদ্র, মার্জিত। ওর কথা ওর বন্ধু-বান্ধবরা শুনত, কারণ ও অনেক ভাবনা-চিন্তা করে কথা বলত। সব শিক্ষকই আকবরকে পছন্দ করত।’ ২০১৮-র অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যে যুবদল তৈরি করছিল বিসিবি, তাতেও একটা পর্যায়ে এসেছিল আকবরের নাম। কিন্তু সেবার চূড়ান্ত দলে তাঁর জায়গা হয়নি। এবারের বিশ্বকাপের দলে তাঁর জায়গা পাওয়ার ব্যাপারটা নিয়ে স্মৃতিচারণা করে রউফ বললেন, ‘বিকেএসপিতে আসা জুনিয়র নির্বাচক এহেসানুল হক সেজানকে বোধহয় বলেছিলাম আকবরের কথা। এরপর তো মাঠের খেলায় সে নিজেকে প্রমাণই করল।’ আগের বিশ্বকাপের দলের জন্য বিবেচনায় থাকা আকবর পরবর্তী আসরের জন্য বেশি বয়সী হয়ে যাবেন, এ রকম একটা ধারণা থেকেই এবারের বিশ্বকাপের দল গঠনের সময় আকবরের কথা বিবেচনায় আসেনি। বিকেএসপিতে সেই দুটো ম্যাচের পর তাঁর বয়স নির্ধারণী পরীক্ষা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিসমানের সনদপত্রও পাঠানো হয় বিসিবিতে। তাতে দেখা যায়, এবারের বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা আছে আকবরের। এরপরই অনূর্ধ্ব-১৯ দলের স্কোয়াডে ঢুকে যান আকবর, পরের গল্পটা তো সবারই জানা। 

গত মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগ ক্রিকেটে খেলা বিকেএসপি দলেও শুরুতে অধিনায়ক ছিলেন আব্দুল কাইয়ুম, কয়েকটা ম্যাচ পরই নেতৃত্বে চলে আসেন আকবর। অনূর্ধ্ব-১৯ দলেও তা-ই। ২০১৮ সালের যুব বিশ্বকাপ দলের রাডারে আসার পরও নিউজিল্যান্ডের বিমানে চড়ার সুযোগ হয়নি। পরের বিশ্বকাপের দলেও ঢুকেছেন হঠাৎ করে, এরপর তৌহিদ হৃদয়ের কাছ থেকে নেতৃত্বের ব্যাটনটাও চলে আসে তাঁর হাতে। অতীতের সেই দিনগুলোর কথা এই সোনালি সময়েও ভুলে যাননি আকবর, ‘দেখুন, গতবার তো আমি ছিলাম না। এবারও আমি ছিলাম না। কিন্তু বিকেএসপিতে একটা প্রস্তুতি ম্যাচ হয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের সঙ্গে। বিকেএসপি থেকে খেলার সুযোগ পাই। সেখানে ভালো খেলি। সেখান থেকে নির্বাচক হান্নান স্যার এবং বাকিরা আমাকে সুযোগ দেন। এর পর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। যেখানে খেলেছি সেখানেই পারফরম করার চেষ্টা করেছি। সেখান থেকেই আস্তে আস্তে উঠে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ। পুরো যাত্রাটা ভালো ছিল।’

আফগানিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের তাই একটা ধন্যবাদ বোধহয় পাওনা। তারা যদি বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে দেশে এসে না হারিয়ে যেত, তাহলে হয়তো বিকেএসপিতে যাওয়া হতো না প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে। খেলা হতো না আকবরেরও আর ফাইনালে তাঁর ৪৩ রানের ইনিংসটা না থাকলে তো জেতা হয় না বিশ্বকাপও!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা