kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

লোহিত সাগরতীরে রিয়ালের উৎসব

সনৎ বাবলা, জেদ্দা থেকে ফিরে   

১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



লোহিত সাগরতীরে রিয়ালের উৎসব

বার্নাব্যুতে নয়, লোহিত সাগরতীরে জন্ম হয়েছে নতুন রিয়াল মাদ্রিদের! সাগরের ঢেউয়ে যেন সব ব্যর্থতা ধুয়ে-মুছে কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্টস সিটিতে হয়েছে তাদের শিরোপার সঙ্গে গলাগলি।

রামোস-মডরিচদেরও সাগরে পা ভেজানোর শখ হয়েছিল। জেদ্দার হিলটন হোটেলের পাশেই লোহিত সাগর, তার টান অনুভব করলেও তীরে বসে খেলোয়াড়দের আপন মনে উদাস হওয়ার উপায় নেই। চারদিকে যে সমর্থককুলের মহা মিছিল, তাদের এড়িয়ে কারো দু-কদম ফেলার সুযোগ নেই। উপায় একটাই, হোটেল রুমে বসে উদাসী হয়ে সাগরের বিশালতার কাছে নিজেদের সঁপে দেওয়া। সেই বিশালত্বের ছোঁয়ায় রিয়াল মাদ্রিদ আবার যেন গৌরবের পথে ফেরে। ‘জিজু’র ম্যাজিকে ঢেকে যাবে সব দুর্বলতা। তারকা ফরোয়ার্ড ত্রয়ীর অনুপস্থিতিতেও রিয়াল ফিরবে রাজকীয় রূপে। ফিরেছেও। সুপারকোপার ফাইনালে মাঠে হয়তো ঠিক রাজত্ব করতে পারেনি, তবে টাইব্রেকারে কারভাহাল, রদ্রিগো, মডরিচ, রামোসদের নিখুঁত নিশানায় ৪-১ গোলে ভূপাতিত হয়েছে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ। গত মৌসুমের ব্যর্থতা ঝেড়ে সুপার কাপের শিরোপা জয়ে রিয়াল মাদ্রিদ শুরু করেছে নতুন মৌসুম।

শুরুটা হয়েছে জেদ্দার কিং আব্দুল্লাহ স্পোর্টস সিটি থেকে। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর কোনো অংশে কম নয়। বরং একটু বেশিই, শুরু থেকে সৌদি দর্শক-সমর্থকরা যেন প্রবল আত্মবিশ্বাসে হেলে আছে রিয়ালের দিকে। রামোসদের মাঠে ঢুকতে দেখেই তারা বাদ্য-বাজনা বাজিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়ে। আর অ্যাতলেতিকোর প্রবেশের সময় হালকা হাততালির সঙ্গে বাজে সিঁটি। কিন্তু সিমিওনের এই দল যে দুদিন আগে নাকানি-চুবানি খাইয়েছে মেসির বার্সেলোনাকে। সুতরাং অ্যাতলেতিকোকে হেলাফেলা করলেই চড়া মূল্য দিতে হয়। তবে এই ত্রয়ীর মধ্যে আছে এক দুর্বোধ্য রসায়ন। টুর্নামেন্টে যেমন বার্সার সামনে অ্যাতলেতিকো বাঘ হয়ে হাজির হয়, তেমনি রিয়ালের মুখোমুখি হলে সেই বাঘের চরিত্রে যেন বিড়াল ভর করে! পরশু মাঠের খেলায়ও তা-ই দেখা গেছে। বিরতির আগে পর্যন্ত ছিল রামোস-মডরিচ-ভালভার্দের দাপট। তবে বল পজেশনে এগিয়ে থাকলেও অ্যাটাকিং থার্ডে তারা নির্বিষ। হ্যাজার্ড-বেনজিমা-বেল নেই বলেই হয়তো ভোগান্তি। তাঁদের অনুপস্থিতিতে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ ছিল জোভিচের, কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নিচে সার্বিয়ান স্ট্রাইকারের পারফরম্যান্স। এই বিশ্বাসহীনতার কারণেই কিনা সতীর্থরা তাঁর পায়ে বলও খুব দেয় না! তবে ৫১ মিনিটে মডরিচের বাড়ানো বলে তাঁর বাঁ পায়ের কোনাকুনি শটটি পোস্ট ঘেঁষে বাইরে না গিয়ে জালে গেলে ম্যাচের চরিত্রও বদলে যেতে পারত। ৬৬ মিনিটে তাঁর পায়েই হতে পারত গোলের সূত্রপাত। জোভিচের সুন্দর ক্রসে ভালভার্দের হেড পোস্টে বাতাস লাগিয়ে যায় বাইরে।

‘জিজু’র ম্যাজিকে ঢেকে যাবে সব দুর্বলতা। তারকা ফরোয়ার্ড ত্রয়ীর অনুপস্থিতিতেও রিয়াল ফিরবে রাজকীয় রূপে। ফিরেছেও। সুপারকোপার ফাইনালে মাঠে হয়তো ঠিক রাজত্ব করতে পারেনি, তবে টাইব্রেকারে কারভাহাল, রদ্রিগো, মডরিচ, রামোসদের নিখুঁত নিশানায় ৪-১ গোলে ভূপাতিত হয়েছে অ্যাতলেতিকো মাদ্রিদ। গত মৌসুমের ব্যর্থতা ঝেড়ে সুপার কাপের শিরোপা জয়ে রিয়াল মাদ্রিদ শুরু করেছে নতুন মৌসুম।

তখন গোল করার চেয়ে রিয়াল গোলরক্ষককের গোল ঠেকানোই ছিল কঠিন পরীক্ষা। কারণ আলভারো মোরাতা খেপেছেন তাঁর পুরনো দলের বিরুদ্ধে। ৮০ মিনিটে ছোট বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া তাঁর শটটি থিবো কোর্তোয়া ফিরিয়েছেন অবিশ্বাস্যভাবে। এরপর থমাসের ফ্রি-কিকে তিনি সুরক্ষা দিয়েছেন রিয়ালকে। গোলশূন্য নির্ধারিত সময়ের পর অতিরিক্ত সময়ে লস ব্লাঙ্কোসরা বড় পরীক্ষা নিয়েছে অ্যাতলেতিকো গোলরক্ষকের। ১১১ মিনিটে একই মুভে ওবলাক দু-দুবার ফিরিয়েছেন, প্রথমে মডরিচের শট এরপর বদলি মারিয়ানোর ভলি ফিরিয়ে এই গোলরক্ষক ম্যাচে রাখেন অ্যাতলেতিকোকে। দুই মিনিট বাদেই তার সুফল প্রায় পেয়ে গিয়েছিল তারা। কাউন্টারে সবাইকে পেছনে ফেলে মোরাতার গোলমুখী দৌড়ে অ্যাতলেতিকোর শিরোপাস্বপ্ন উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সামনে শুধুই গোলরক্ষক কোর্তোয়া, তাঁকে ফাঁকি দিতে পারলেই বল পৌঁছে যাবে রিয়ালের জালে। সমূহ বিপদ দেখে পেছন থেকে ভালভার্দে পা চালিয়ে দিয়ে থামিয়ে দেন মোরাতাকে। একই সঙ্গে গোলের সেরা সুযোগটাও নস্যাৎ করে দেন! এ ছাড়া যে আর কোনো উপায় ছিল না উরুগুইয়ান মিডফিল্ডারের সামনে। লাল কার্ডের মার্চিং অর্ডার নিয়ে তিনি মাথা নিচু করে মাঠ ছেড়ে গিয়ে দলকে দিয়ে গেলেন নতুন জীবন। লাল কার্ডের ‘নায়ক’ মাঠ ছাড়ার সময় রিয়াল সমর্থকরা উঠে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানিয়েছে এই তরুণকে।

এই জীবন না পেলে খেলা টাইব্রেকারেও যায় না। রিয়ালেরও হয় না স্প্যানিশ কাপ জয়। তাই লাল কার্ড দেখা ভালভারদেই অনেকের কাছে ম্যাচ সেরা! এই ফাউল নিয়ে তার মনেও কোনো খেদ নেই, ‘আমি ক্ষমা চাইছি মোরাতার কাছে। আমি জানি, এটা ঠিক হয়নি তবে এ ছাড়া আমার করার কিছু ছিল না।’ এরপর টাইব্রেকারে টানা চারবার লক্ষ্যভেদ করে রিয়াল মাদ্রিদ, উল্টোদিকে অ্যাতলেতিকোর সাওল শুরু করেন পোস্টে শট মেরে, থমাসের দ্বিতীয় শট ঠেকিয়ে দেন কোর্তোয়া। এরপর কিয়েরান ট্রিপেয়ার লক্ষ্যভেদ করলেও কারভাহাল, রদ্রিগো, মডরিচ ও রামোসের টানা চার লক্ষ্যভেদে শিরোপা জয়ে শুরু হয় রিয়ালের নতুন বছর। অথচ তিন মাস আগেও কল্পনা করা যায়নি আজকের এ শিরোপা উৎসবের দিনটিকে। লিগে মায়োর্কার কাছে হারের পর কানাঘুষা শুরু হয়েছিল জিনেদিন জিদানের চাকরি নিয়েও। ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না লস ব্লাঙ্কোসরা। অমন টালমাটাল অবস্থা থেকে তিন মাসের ব্যবধানে জিদান আবার শিরোপার কারিগর! ক্লাব সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ যথার্থই বলেছেন, ‘জিদান আসলে স্বর্গের দান।’

রিয়াল মাদ্রিদে তাই এখন স্বর্গসুখ!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা