kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৩ জানুয়ারি ২০২০। ৯ মাঘ ১৪২৬। ২৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১          

চেনা খেলার অচেনা রূপ

সাঁতারে নেপালও টপকে গেছে বাংলাদেশকে

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



সাঁতারে নেপালও টপকে গেছে বাংলাদেশকে

কাঠমাণ্ডুতে এসএ গেমস চলাকালীন প্রায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হয়েছে ‘সোনাঝরা দিন’। অন্য যেকোনো আসরের চেয়ে এবার বেশিসংখ্যক সোনা জিতেছেন অ্যাথলেটরা। এর পরও পদক তালিকায় পঞ্চম স্থানে। আর এর সবগুলোই এসেছে স্বল্প পরিচিত খেলা থেকে। গেমস বলতে যে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্ট বোঝায়, সেসব ইভেন্টে পাত্তাই পায়নি বাংলাদেশ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানবের মতো আলোচিত পদকেরও অন্যতম দাবিদার ছিল বাংলাদেশ। এখন আর চেনা ডিসিপ্লিনে খোঁজ নেই বাংলাদেশের। কেন? সে প্রশ্নের উত্তরই ধারাবাহিক এ আয়োজনে খুঁজেছেন সনৎ বাবলা

সোনার সাঁতারু মোশররফ হোসেনের দেশের সাঁতারের মান নামতে নামতে এখন নেপালেরও পেছনে! এই নদীমাতৃক দেশে নেই কোনো সোনার সাঁতারু। তিনটি রুপাতেই তাদের সন্তুষ্টি। নেপালগামী সাঁতার দলের ম্যানেজার গোলাম মোস্তফার স্বস্তি, ‘আগেভাগে নেপাল যাওয়ায় তিনটি রুপা আর আটটি ব্রোঞ্জ জিতেছি। পরে গেলে এগুলোও জেতা যেতো না।’

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৪০০ মিটার উঁচুতে গিয়ে সাঁতার কাটতে সমস্যা হবে। তাই আগেভাগে গিয়ে নেপালের হাওয়া-বাতাসে মানিয়ে নিয়েও বাংলাদেশের কোনো সাঁতারুরা ৩৮টি ইভেন্টের একটিতেও পারেনি নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। আগেরবার দুটি সোনায় দেশের সাঁতারকে রাঙিয়েছিলেন মাহফুজা আক্তার শিলা। এবার আরিফুল ইসলাম সোনার কাছাকাছি গিয়ে ছিটকে গেছেন মাইক্রো সেকেন্ডের ব্যবধানে। ফ্রান্সে আট-নয় মাস ট্রেনিং করে ফেরা এই সাঁতারু ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্টোকে ভারতের লিখিত প্রেমার (২৮.০৬ সে.) কাছে হেরে ২৮.৩৬ সেকেন্ডে রুপা জেতেন। তার আরেকটি রুপা ৪০০ মিটার মিডলে রিলেতে। ২১ বছর বয়সী এই তরুণের আক্ষেপ, ‘১০০ ও ৫০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে আমার লক্ষ্য থাকলেও আমি পারিনি। আমরা এই প্রথম বোধহয় নেপালের পেছনে চলে গেলাম। ওদের গৌরিকা সিং-ই চারটি সোনা জিতেছে। শ্রীলঙ্কার এ রকম এক অভিবাসী একাই সাতটি সোনা জিতেছে। তারাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। যেভাবেই দেখি, এই গেমসে আমরা কেউ সোনা জিততে পারিনি। এভাবে চললে খেলাটির প্রতি কারো আকর্ষণ আর থাকবে না।’ আন্তর্জাতিক সাঁতারে কম প্রতিদ্বন্দ্বিতার জায়গা এই আঞ্চলিক গেমস, এখানেই সোনা দূর কল্পনার বস্তু হলেও খেলাটিরই বা গৌরব কী থাকে!

আরিফুল ইসলাম সামনের কথা ভেবে শঙ্কিত, ‘আগামী সেপ্টেম্বরে আমার আইওসির বৃত্তি শেষ হয়ে যাবে। এরপর ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরে এলে আমার কী হবে! সম্পাদক স্যারকে বলেছি, বৃত্তি শেষ হলে বাইরে কোথাও ব্যবস্থা করতে।’

নেপাল কখনো সাঁতারুদের দেশ ছিল না। ইংল্যান্ডে বেড়ে ওঠা নেপালি মেয়ে গৌরিকা সিং প্রথমবারের মতো নেপালি সাঁতারকে সোনায় মুড়িয়ে দিয়েছেন। লঙ্কান সাঁতারু ম্যাথু আবেসিংহের বর্তমান আবাস অস্ট্রেলিয়ায়, তাঁর সাত সোনার উপহারে রাঙিয়েছে শ্রীলঙ্কা। সে রকম বাংলাদেশও নিয়ে গিয়েছিল ইংল্যান্ডপ্রবাসী জুনাইনা আহমেদকে। দেশের সুইমিং পুলে সোনার ঝড় তোলা এই সাঁতারু সাকল্যে পেয়েছেন তিনটি ব্রোঞ্জ। বাংলাদেশ দলের কোচ-কাম ম্যানেজার গোলাম মোস্তফার উপলব্ধি, ‘দেশে একেকজন চার-পাঁচটি সোনা জিতে শোরগোল ফেলে দেয়, পত্র-পত্রিকায় বড় ছবি ছাপা হয়। আমরা সংগঠকরাও আনন্দে মেতে উঠি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ভারত ও শ্রীলঙ্কার চেয়ে আমরা অনেক অনেক পেছনে। তাঁদের পাশে দাঁড়ালে আমাদের সাঁতারুদের চোখেও লাগে না।’ তাদের যেমন চোখে লাগে না, তেমনি টেকনিকেও থাকে পিছিয়ে। ভালো টেকনিকের জন্য বিদেশি কোচ আনলেও ফেডারেশন শুরু করে নানা টালবাহানা। কোনো বিদেশিই তাঁদের নিয়ে সুনাম করে যান না। এসএ গেমসের আগে আগে জাপানি কোচ ইনোকি চাকরি ছেড়ে গেছেন তাঁদের কাজ-কারবার দেখে। আবার অল্প টাকায় ভালো সাঁতার কোচও পাওয়া যায় না, তাঁরা স্বল্প সময়ের চুক্তিতে এখানে আসতে চান না।

এ জন্য হয়তো আরিফুল ইসলাম সামনের কথা ভেবে শঙ্কিত, ‘আগামী সেপ্টেম্বরে আমার আইওসির বৃত্তি শেষ হয়ে যাবে। এরপর ফ্রান্স থেকে দেশে ফিরে এলে আমার কী হবে! সম্পাদক স্যারকে বলেছি, বৃত্তি শেষ হলে বাইরে কোথাও ব্যবস্থা করতে।’ ২১ বছর বয়সী এই তরুণ চাইছেন আগামী এসএ গেমস পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মানের কোনো সেন্টারে ট্রেনিং করতে। আসলে দেশের সাঁতার ট্রেনিং ব্যবস্থার ওপর কারো ভরসা নেই। এখানে কোনো লক্ষ্য নেই, দূরদর্শিতা নেই। ‘সেরা সাঁতারুর খোঁজে’ এক প্রতিভা অন্বেষণ প্রগ্রাম করে কয়েক বছর চলেছে। সে নিয়ে এমন হৈচৈ যেন দেশের সাঁতারের চেহারা বদলে গেছে। নেপালে দেখা গেছে সেখানকার ছয় সাঁতারু ফিরেছে শূন্য হাতে। সাঁতার ফেডারেশনের আসলে বড় লক্ষ্যে কোনো আধুনিক পরিকল্পনা নেই। অনেকের অভিযোগ, আধুনিক উপায়ে সাঁতারকে এগিয়ে নেওয়ার মাথাও নেই ফেডারেশনে। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার সুবাদে গোলাম মোস্তফা মনে করছেন, ‘সাধারণ সম্পাদককে বলেছি, লম্বা সাঁতারু বাছাই করতে। আমাদের বর্তমান মেয়ে সাঁতার দলের কাছ থেকে কিছুই আশা করা যাবে না। আর ওই তিন-চার মাসের ট্রেনিং দিয়ে কিছু হবে না। নতুন সাঁতারু বাছাই করে চার-পাঁচ বছরের পরিকল্পনা হাতে না নিলে ভবিষ্যৎ আরো খারাপ হবে।’

বাংলাদেশ সাঁতার এখন নেপালের পেছনে! ভবিষ্যতের ডাক না শুনলে অবস্থা আরো ভয়াবহ হবে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা