kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

চেনা খেলার অচেনা রূপ

ধ্বংসস্তূপে শুধুই একটি রুপা ও ব্রোঞ্জ

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ধ্বংসস্তূপে শুধুই একটি রুপা ও ব্রোঞ্জ

কাঠমাণ্ডুতে এসএ গেমস চলাকালীন প্রায় প্রতিদিনই খবরের শিরোনাম হয়েছে ‘সোনাঝরা দিন’। অন্য যেকোনো আসরের চেয়ে এবার বেশিসংখ্যক সোনা জিতেছেন অ্যাথলেটরা। এর পরও পদক তালিকায় পঞ্চম স্থানে। আর এর সবগুলোই এসেছে স্বল্প পরিচিত খেলা থেকে। গেমস বলতে যে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ড ইভেন্ট বোঝায়, সেসব ইভেন্টে পাত্তাই পায়নি বাংলাদেশ। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানবের মতো আলোচিত পদকেরও অন্যতম দাবিদার ছিল বাংলাদেশ। এখন আর চেনা ডিসিপ্লিনে খোঁজ নেই বাংলাদেশের। কেন? সে প্রশ্নের উত্তরই ধারাবাহিক এ আয়োজনে খুঁজেছেন সনৎ বাবলা

তাঁদের পুরনো কথাগুলো মনে পড়লে এখন হাসি পায়। জাতীয় অ্যাথলেটিকসের বিভিন্ন ইভেন্টে প্রথম হয়েই শিরিন-হাসানরা নির্দ্বিধায় বলে দিতেন এসএ গেমসে লক্ষ্যের কথা। সেখানে দুর্দান্ত কিছু করার লক্ষ্য তাঁদের। এই গেমসে গিয়ে দেখা গেল লক্ষ্যের চেয়ে তাঁরা অনেক দূরে, ১০০ মিটারে পদক নিষ্পত্তি হয়ে গেলেও তাঁদের দৌড় শেষ হয় না। স্প্রিন্টের পুণ্যভূমিতে শাহ আলম, বিমল, মাহবুবদের পরম্পরা রক্ষা করার মতো আর পুণ্যাত্মা অ্যাথলেট নেই। মাঝে ২০০৬ সালে শ্রীলঙ্কা এসএ গেমসে মিঠু হার্ডলসে শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন অ্যাথলেটিকস অঙ্গন। হয়তো এখানে আশা-ভরসার কিছু দেখেননি। এবার অ্যাথলেটিকসের ধ্বংসস্তূপে গলায় রুপা ও ব্রোঞ্জ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাহফুজুর রহমান ও আল আমিন। এটিই হতে পারে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকসের জাদুঘরে ওঠার ঠিক আগের ছবি!

এসএ গেমস থেকে এই দুটি পদক অর্জনে কতটুকু ইতিবাচকতা থাকতে পারে? অ্যাথলেটরা ফোন ধরেন না লজ্জায়। কোচরা চলেন মুখ লুকিয়ে। অ্যাথলেটিকস ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক ফরিদ খান শুরুতেই স্বীকার করে নেন নিজেদের ব্যর্থতার কথা, ‘আমাদের আশা আরেকটু বেশি ছিল। জহিরকে নিয়ে আশা ছিল। ছেলে ও মেয়েদের রিলেতে পদক আশা করেছিলাম। কিন্তু অ্যাথলেটদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। আমরাই পারিনি তাদের তৈরি করতে। বাস্তবতা হলো, দুই-তিন মাসের ট্রেনিং নিয়ে এসএ গেমসে কিছু করা যাবে না। আমরা এক পা এগোলে প্রতিপক্ষ এগিয়ে যায় ছয় পা। বিশেষ করে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান খুব ভালোভাবে এগোচ্ছে। তাদের তুলনায় আমাদের কোনো উন্নয়ন কর্মকাণ্ডই নেই।’

১৫ বছর ধরে অ্যাথলেটিকসে ইতিবাচক কিছু দেখা যায় না। সংগঠকরা ফেডারেশনের পদে বসার জন্য লড়াই করেছেন আর খেলাটি ডুবেছে একটু একটু করে। অনিয়মিত হয়ে পড়েছিল বার্ষিক আয়োজনগুলোও। একই সঙ্গে ঝিমিয়ে গেছে জেলায় জেলায় অ্যাথলেটিকস চর্চাও। বছর দুয়েক ধরে হচ্ছে ফেডারেশনের বার্ষিক আয়োজনগুলো বলতে সিনিয়র, জুনিয়র মিট এবং সামার মিট। তাতে দেশে অ্যাথলেটিকস চলছে বলে হাওয়া তোলা গেলেও আন্তর্জাতিক সাফল্যের স্বপ্ন দেখা যায় না। যাদের স্বপ্ন দেখানোর কথা সেই বিকেএসপিও গত এক দশকে কোনো সোনাজয়ী অ্যাথলেট উপহার দিতে পারেনি।

এবার অ্যাথলেটিকসের ধ্বংসস্তূপে গলায় রুপা ও ব্রোঞ্জ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মাহফুজুর রহমান ও আল আমিন। এটিই হতে পারে বাংলাদেশ অ্যাথলেটিকসের জাদুঘরে ওঠার ঠিক আগের ছবি!

সাফের অ্যাথলেটিকস ইতিহাসে এক বিমল তরফদার ছাড়া আর কোনো সোনাজয়ীর গৌরব নেই বিকেএসপির। এত সুযোগ-সুবিধা দিয়ে গড়া এই প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত চ্যাম্পিয়ন অ্যাথলেট তৈরি করা। সবাই যার যার কাজ থেকে সরে গেছে বলেই এই দুর্দশা। রুপাজয়ী হাইজাম্পার মাহফুজুর রহমান মনে করেন, ‘আমরা যেভাবে ট্রেনিং করি, সেভাবে চললে ভালো করা যাবে না। টার্গেট সেট করে উন্নত ট্রেনিংয়ে যেতে হবে।’ দেশি কোচরা অ্যাথলেটদের একটা জায়গা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেন। আরেক ধাপ উন্নতির জন্য লাগে বিশেষজ্ঞ কোচ। এসএ গেমসের আগে ফেডারেশন বিদেশি কোচ আনার একটা হাওয়া তুললেও শেষ পর্যন্ত আনতে পারেনি কাউকে। তারা বলে আর্থিক অসচ্ছলতার কথা, তিন-চার মাসের জন্য কোনো কোচ আসতে চায়নি।

অ্যাথলেটিকস আসলে তিন-চার মাস ট্রেনিংয়ের খেলা নয়। ফেডারেশন যুগ্ম সম্পাদক ফরিদ খানও মনে করেন, ‘টানা দুই বছর বিশেষ প্রগ্রাম হাতে না নিলে অ্যাথলেটিকসের এই দুর্দশা থাকে মুক্তি মিলবে না। স্বল্পমেয়াদি ট্রেনিংয়ে কোনো উন্নতি হবে না। পরের এসএ গেমসের কথা চিন্তা করলে মাহফুজ ছাড়া এই দলের কারো সম্ভাবনা আমি দেখি না। শরীর-স্বাস্থ্য, সম্ভাবনা দেখে সারা দেশ থেকে অ্যাথলেট খুঁজে বের করতে হবে। এরপর ভালো প্রগ্রাম করে কোচ রেখে তাদের তৈরি করতে হবে। কিন্তু আমাদের বড় সমস্যা হলো অর্থ। এত টাকা কে দেবে আমাদের?’

অর্থ বড় সমস্যা। আরেকটি সমস্যা হলো অতীতের সেই ধারাও নেই। বিজেএমসি, বিটিএমসি, পুলিশ, রেলওয়ে, কাস্টমস, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংকের দল থাকত অ্যাতলেটিকসে। অ্যাথলেটরা ওখানে চাকরি করতেন আর খেলতেন। কেবল বিজেএমসি এখনো অ্যাথলেটিকসমুখো থাকলেও সেই আকর্ষণ নেই। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বাকি দলগুলো। জেলা পর্যায়ের অ্যাথলেটিকসেও আশার ছায়াও নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অ্যাথলেটিকস বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে। সাবেক অ্যাথলেট ফরিদ খানের উপলব্ধি, ‘এসএ গেমসে কিছু করতে না পারলে আমাদের মতো সাবেক অ্যাথলেটদের ফেডারেশনে থেকেই বা লাভ কী! ফেডারেশন সম্পাদক মন্টুকেও বলেছি আমি। এই গেমসে তিন-চারটি সোনা, সাত-আটটি রুপা না হলে আমাদের অ্যাথলেটিকসের মূল্য কী?’

আসলেই কোনো মূল্য নেই। কর্তারা কি যেকোনো গেমসের সবচেয়ে আকর্ষক এ খেলাটিকে ‘মৃত্যুমুখ’ থেকে ফিরিয়ে আনতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেবেন? নাকি কথামালাতেই আবার আড়াল করা হবে ব্যর্থতার কাঁটা?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা