kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

টাচলাইন থেকে

দ্বিধা-ধাঁধা

মোস্তফা মামুন

১২ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



দ্বিধা-ধাঁধা

‘ক্রিকেট ম্যাচে প্রথম ইনিংস দেখতে হয় না।’

বললেন এক সাংবাদিক বন্ধু, যিনি মাঠে নিয়মিত দেরি করে আসায় প্রথম ইনিংস প্রায় সময়ই মিস হয়ে যেত। এই নিয়ে কৌতুক-বিদ্রুপে বিদ্ধ হতে হতে একদিন তুলে ধরলেন ক্রিকেট দর্শনের নতুন দর্শন। বিস্মিত হয়ে সবাই পাল্টা প্রশ্ন করে, ‘কেন? কেন?’

‘ধরো প্রথম ইনিংসে কেউ করল বিরাট রান। খুশিতে হাততালি দিলে। পরে দেখা গেল বিপক্ষ সেই রান টপকে গেছে। তখন নিজেকে হাস্যকর মনে হবে না!’

কথা সত্য। কত ম্যাচে এ রকম হয়েছে। মধ্যবিরতিতে তালি দিয়ে শেষ বেলাতে মুখ লুকিয়েছি।

‘আবার দেখো। এমনও হয়, প্রথম ইনিংসের পর মনে হলো সব গেল। অথচ পরে দেখা গেল সেই অল্প রানেই...’

তা-ও ঠিক। কাজেই উপসংহারটা কী দাঁড়ায়! ক্রিকেটের প্রথম ইনিংসের সেরকম মূল্যই নেই অথবা ক্রিকেটে মাঝামাঝি সময়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছ কী বিপাকে পড়েছ!

এতকাল জানতাম ক্রিকেটের প্রথম ইনিংস বা ফুটবলের হাফটাইমের স্কোর বিভ্রান্তি তৈরি করে। এবার জানলাম সে রকম বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে এমনকি একটা গোটা গেমসও। বাংলাদেশ ইতিহাসে সর্বোচ্চ সোনার পদক পেয়েছে, দেশের বাইরে এমন পারফরম্যান্স ঈর্ষণীয়। সেদিক দিয়ে দেখলে অতুলনীয় সাফল্য। কিন্তু গেমস শেষে যখন পুরো পদক তালিকায় চোখ পড়ছে তখন এই দেখে অবাক লাগছে যে বাংলাদেশ সেখানে সাত দেশের মধ্যে পঞ্চম। ভুটান আর মালদ্বীপ পেছনে, স্বল্প জনসংখ্যার যে দুই দেশে সেই অর্থে ক্রীড়ার কাঠামো তৈরির সুযোগই নেই। এ যেন চার গোল দিয়ে পাঁচ গোল খেয়ে যাওয়ার মতো ব্যাপার। তাই বাংলাদেশ ভালো করল না খারাপ করল তাই নিয়ে চূড়ান্ত দ্বিধা। একটা জটিল ধাঁধা।

সত্যি বললে, এবারের এসএ গেমসে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স সত্যিই এক ধাঁধা। শ্যুটিং বা সাঁতারের মতো যে দুটি ডিসিপ্লিন বাংলাদেশের সব সময়ের স্বর্ণপ্রসবা, সেই দুটিতে বাংলাদেশ ব্যর্থ। আবার, আর্চারি-তায়কোয়ান্দো-কারাতে-ফেন্সিংয়ের মতো অপরিচিত খেলাগুলোতে সাফল্য। এর মধ্য দিয়ে কী প্রমাণিত হয়? যে খেলাগুলোতে সাধারণত সাফল্য পেত সেই খেলাগুলো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসজনিত কারণে সঠিক চ্যালেঞ্জের জন্য নিজেদের তৈরি করেনি। যা হয়, বাংলাদেশে সাফল্য অর্জনের জন্য সবাই মরিয়া আর ঐক্যবদ্ধ থাকে। সফল হয়ে গেলে শুরু হয় মালিকানার লড়াই। সেই লড়াই থেকে কর্মকর্তা পর্যায়ে বিভক্তি-হানাহানি। ফল, পতনের পথে ধেয়ে চলা। কেউ কেউ অবশ্য এই হাইপোথিসিস শুনে হাসতে শুরু করবেন এ জন্য যে, শ্যুটিং-সাঁতারে সোনা না পাওয়ার একটা বড় কারণ ভারতের উপস্থিতি। ওরা থাকাতে অনেকগুলো রুপা বা ব্রোঞ্জ সোনা হয়নি, যা হয়েছে আর্চারি বা অন্য কোথাও কোথাও। ঠিক যে ভারত-পাকিস্তানের অনুপস্থিতিতে অনেকগুলো খেলার ভারসাম্যে সমস্যা তৈরি হয়েছে এবং তাতে একই পাল্লায় সাফল্য-ব্যর্থতাতে বিচার করা যাচ্ছে না, তবু যদি শুধু সাঁতার আর শ্যুটিংয়ে থাকি তাহলে ভারতের উপস্থিতিতেই তো বাংলাদেশ আগের গেমসগুলোতে সোনা জিতেছে। বাকী-শাকিল বা এরও আগে আসিফ-আতিক-সাবরিনা-রিংকিরা তো ভারতীয় বা এর চেয়েও কঠিন প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলেছেন সময়ে সময়ে। এবার পারলেন না কেন? একই কথা সাঁতারেও। মনে আছে, ১৯৮৯ ইসলামাবাদ গেমসে একটাই মাত্র সোনা জিতেছিল বাংলাদেশ। সাঁতারু মোখলেস মান রক্ষা করেছিলেন পুরো কন্টিনজেন্টের। এর আগে ঢাকায় সাঁতারু মোশাররফ হোসেন সব প্রতিপক্ষের প্রবল উপস্থিতিকে অগ্রাহ্য করে পেয়েছিলেন পাঁচটি সোনা। এর বাইরে কারার মিজান, শিলারাও সাঁতারের পুল উত্তাল করেছেন। ভারত থাকলেই সোনা জেতা যাবে না এবং সেটাকে ঢাল বানানোর কোনো সুযোগ তাই শ্যুটিং বা সাঁতারের নেই। এটা ব্যর্থতা। গভীর আত্মবিশ্লেষণ জরুরি। জরুরি দায়ীদের জবাবদিহি।

অতীত সাফল্যের আয়না দিয়ে দেখলে সাঁতার আর শ্যুটিং এক রকম। সেটা সরিয়ে অন্য আয়নায় দেখলে সাঁতার আর অ্যাথলেটিকস এক কাতারে পড়ে। যত খেলাই হোক শেষ পর্যন্ত গেমসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অ্যাথলেটিকস। তাতে কোথায় যে হারালাম আমরা! গেমসের খোঁজখবর যাঁরা গভীরভাবে রাখেন তাঁরা জানবেন এই গেমসের ইতিহাসে বাংলাদেশের প্রথম সোনাটি ছিল অ্যাথলেটিকসে। নেপালের কাঠমাণ্ডুতেই হয়েছিল প্রথম সাফ গেমস, তাতে মজিবুর রহমান মল্লিক ট্রিপল জাম্পে বাংলাদেশকে এনে দিয়েছিলেন প্রথম সোনা। এরপর সেবার আরেকটি সোনা জেতে বাংলাদেশ, এবং এখন গল্পের মতো শোনাবে, সেটাও এনেছিলেন অ্যাথলেটরা। খুবই মর্যাদাপূর্ণ ইভেন্ট, ৪ গুণিতক ১০০ মিটার রিলেতে সোনা জিতেছিল বাংলাদেশ। পরের দুই সাফ গেমসে তো অ্যাথলেটিকসে আমরাই মধ্যমণি। ১৯৮৫ আর ১৯৮৭ দুইবারই দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুততম মানবের মুকুট পরে শাহ আলম উদ্ভাসিত হয়ে থাকলেন। ১৯৯৩তে বিমল চন্দ্র তরফদারের মধ্য দিয়ে আবার গতির রাজত্ব ফিরল বাংলাদেশে। এরপর আর দ্রুততম মানবের শিরোপা না পেলেও মাহবুব ২০০ মিটারে দুটি গেমসে দাপট দেখিয়েছেন। সেই আমাদের অ্যাথলেটরা এখন ১০০ মিটারে সেরা তিনেও থাকতে পারেন না। অ্যাথলেটিকস হচ্ছে গেমসের ‘কুইন’, তাতে সাফল্য না থাকলে সোনাগুলোকে আর যথেষ্ট সোনালি দেখায় না। একটা সাফল্যভিত্তিক তত্ত্ব ক্রীড়াঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে, যেসব ইভেন্টে সাফল্য মেলে সেগুলোকে আলাদা করে পরিচর্যা করে আরো সোনার বন্দোবস্ত করা। সেই হিসাব করলে অ্যাথলেটিকস হয়তো বাদ পড়ে যাবে। কিন্তু মনে হয় না সে রকম ভুল বোধে পরিচালিত হওয়ার মানে আছে। অ্যাথলেটিকস গেমসের মূল আকর্ষণ, এটাকে বাদ নয়, বরং অধোগতির কারণ শনাক্ত করে ফেরানো দরকার সঠিক পথে। কেন, আমরা সে রকম অ্যাথলেট তৈরি করতে পারছি না। একটা খুবই জনপ্রিয় যুক্তি, শারীরিক গঠনে আমরা যথেষ্ট এগিয়ে নেই বলে অ্যাথলেটিকসে পারা যায় না। শাহ আলম-বিমলরা তো মঙ্গল গ্রহ থেকে আসেননি, সেই আশির দশকে শারীরিক গঠন ঠিক থাকলে এখন পিছিয়ে পড়া কেন? যদি পিছিয়েও পড়ি, এর পেছনেও তো কারণ নিশ্চয়ই আছে। সমাজবাস্তবতা বা অন্য কিছু। কোনো গবেষণা আছে আমাদের! গভীর এবং দীর্ঘমেয়াদি অনুশীলনের কথাও খুব বলা হয়। এটাও আমার মনে হয় এক ধরনের গত্বাঁধা চিন্তা। লম্বা সময় আর বিদেশে অনুশীলন করলেই হয় না। অনুশীলন হতে হয় বিজ্ঞানসম্মত। ক্রীড়াবিজ্ঞান এখন খুবই বিকশিত একটা জিনিস, কোন পর্যায়ের অ্যাথলেটের জন্য কী করণীয়—এসব নিয়ে কাজ হচ্ছে নিরন্তর। কেন, আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো লং রানে ভালো কিংবা কিউবানরা কেন কুস্তিতে—এসব কিছু বের করতে গবেষণা হয়েছে। সেসব গবেষণালব্ধ ফল অন্যরা কাজে লাগাচ্ছে নিজেদের উন্নতিতে। আমাদের এখানে সবার মুখে শুনি দীর্ঘ মেয়াদ আর বিদেশ। বিদেশ হলে সবার ভালো। দীর্ঘমেয়াদি হলেও মন্দ না। লম্বা সময় অনুশীলন চালালে অনেকের আয়-রোজগারের একটা পথও তৈরি হয়। এবার তো বিদেশে দীর্ঘ মেয়াদে অনুশীলন করাদের কেউ কেউও ব্যর্থ হয়েছেন। আর তাই মনে হয় সামগ্রিক ক্রীড়াচিন্তারই পুনর্বিন্যাস দরকার।

যেমন এই চিন্তারও বিন্যাস দরকার যে শুধু সাফল্য নিয়েই মেতে থাকব। ধরা যাক, উশু বা ফেন্সিংয়ে আমরা খুব সফল হয়ে গেলাম। তাতে অনেক সোনা আসবে, দেশের মান বাড়বে—সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে করে তো আর দেশের তরুণ-কিশোররা সেই খেলায় মত্ত হয়ে যাবে না। যাওয়ার সুযোগই নেই। তবু সবাই ব্যস্ত থাকবে দৌড়ে। সাঁতারে। এ জন্যই যে এগুলোর জন্য কোনো সরঞ্জাম লাগে না। মানুষের প্রকৃতিগত শারীরিক উন্মাদনার সঙ্গে এর সম্পর্ক। বাংলাদেশ নদীমাতৃক বলে, গ্রামীণ সমাজনির্ভর দেশ বলে এই দুটি প্রাকৃতিকভাবেই সচল। এগুলোতে সফল হলে তাই এর প্রভাব থাকত বৃহত্তর সামাজিক জীবনে। পারি না এটা যেমন দুঃখের বিষয়, তেমনি পারার প্রক্রিয়া বের করাও জরুরি।

আর পারলাম যেগুলোতে সেগুলোকে যথাযথ পুরস্কার আর উৎসাহ দিয়ে অক্ষুণ্ন রাখার পথটা আরো মসৃণ করা উচিত। আর্চারিকে দেখুন। দূরদর্শী নেতৃত্ব, আন্তরিক স্পন্সর, সঠিক পরিকল্পনায় সারা বছর লেগে থাকা, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের সঙ্গে সঠিক যোগাযোগ মিলিয়ে ঠিক পথে যে খেলাটা আছে সেটা আমরা গেমসের আগে থেকেই জানতাম। গেমসে জানলাম, এসব ঠিক থাকলে সবগুলো সোনাও জিতে ফেলা সম্ভব। এবং আরো জানলাম, আজও বাংলাদেশে সেই রকম মেয়ে আছে, বাল্যবিবাহ এড়িয়ে জীবনের কঠিন লড়াইয়ে নেমে বিদেশে গিয়ে পতাকা উঁচিয়ে ধরতে পারে।

সোনার হিসাব বাদ দিন। দ্বিধা আর ধাঁধা ভুলে যান। ইতিদের মনে রাখুন। তখন দেখবেন অন্য আলোয় উদ্ভাসিত হবে আমাদের এসএ গেমসের মিশন।

নারীর অর্জনের অবমূল্যায়নের এই সমাজে নারী ক্ষমতায়ন ফাঁকা আওয়াজের মতো শোনায়। কিন্তু এসএ গেমসে বিদেশের মাঠে মাবিয়া-ইতিদের কীর্তিতে আওয়াজটা সুর আর শক্তিতে মিলিত হয়। আর এখানেই দ্বিধা-ধাঁধা-অঙ্ক দূর হয়ে এসএ গেমস সত্যিই সোনালি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা