kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

কথায় আর কাজে গরমিল

নোমান মোহাম্মদ   

১১ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কথায় আর কাজে গরমিল

মোহাম্মদ নবি ঠিক ভড়কান না। তবে নিশ্চিতভাবেই চমকান। কণ্ঠে বিস্ময়ের রেশ মেখে তাই রংপুর রেঞ্জার্সের অধিনায়ক উত্তর দেন, ‘আমি এ নিয়ম সম্পর্কে জানতাম না। তবে নিয়ম থাকলে তো মানতেই হবে।’

নিয়ম নিয়ে নবির চমকানোর কারণ যথেষ্ট। বঙ্গবন্ধু বিপিএলে প্রতিটি দলের একাদশে লেগ স্পিনার ও ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির বোলার রাখতে হবে—এমনটাই জানিয়েছিল বিসিবি। কিন্তু আজ মাঠে গড়ানোর আগে সব দল কি সে অবস্থায় আছে? এ বিষয়ে দলগুলোর নানামুখী অবস্থান বরং আরো বেশি চমক ছড়ানোর মতো।

বিসিবি প্রেসিডেন্ট নাজমুল হাসান এ নিয়ে কথা বলেন প্রথম। সেটি সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে। ‘আমরা একটি নিয়ম করব যেখানে বিপিএলের প্রতিটি স্কোয়াডে লেগ স্পিনার রাখা বাধ্যতামূলক’—বলেছিলেন তিনি। ১০ অক্টোবর বিপিএল নিয়ে সভা শেষে বিসিবি পরিচালক মাহবুব আনাম তা খোলাসা করেন আরো, ‘সব দলে একজন লেগ স্পিনার খেলানো বাধ্যতামূলক। তাঁকে চার ওভার বোলিং করাতেই হবে। পাশাপাশি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটারের চেয়ে বেশি গতিতে বোলিং করতে পারা একজন ফাস্ট বোলারও রাখতে হবে।’ একই রকম নির্দেশনা ছিল জাতীয় ক্রিকেট লিগের দলগুলোর প্রতিও। সেখানে লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেন ও ফারদিন হাসানের কাউকে একাদশে না রাখার ‘অপরাধে’ রংপুরের কোচ মাসুদ পারভেজ এবং জুবায়ের হোসেনকে না নেওয়ায় ঢাকার কোচ জাহাঙ্গীর আলমকে বরখাস্ত করে বিসিবি। মাহবুব আনামের বক্তব্যের সপ্তাহখানেক পর এমন কড়া অবস্থানই জানান দেয়, বিপিএলে লেগ স্পিনার ও ফাস্ট বোলারের ব্যাপারে কত সিরিয়াস বোর্ড। কিন্তু সেই সিরিয়াসনেস শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারল কই!

সাকিব আল হাসান অবশ্য সে সময়ই এর সমালোচনা করেন। প্রশ্ন তোলেন সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়ে, ‘অনেক বছর ধরে আমরা জাতীয় দলে লেগ স্পিনার খেলাতে পারছি না। সেখানে এখন হঠাৎ করে বিপিএলের সাত দলে সাত লেগ স্পিনার নিতে হবে। এ সিদ্ধান্ত অবশ্যই অবাক করার মতো।’ কিন্তু বোর্ড থেকে বারবারই আশ্বস্ত করা হচ্ছিল এটি নিয়ে। সভাপতি নাজমুল পরে আবার বলেছেন, ‘স্কোয়াডে অবশ্যই একজন লেগ স্পিনার থাকতে হবে। যদি সে স্থানীয় হয়, তাহলে একাদশে খেলাতে হবে। ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির বোলারও রাখতে হবে। প্রতিটি দলের ব্যাটিং অর্ডারও হতে হবে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের ব্যাটিং অর্ডার অনুযায়ী।’ বিপিএল শুরুর সপ্তাহখানেক আগে বলা তাঁর কথায় অবশ্য ছিল কিছুটা ছাড় দেওয়ার সুর, ‘আমরা প্রতিটি দলকে যে গাইডলাইন দিয়েছি, সে অনুযায়ী দলে একজন লেগ স্পিনার ও ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির বোলার রাখতে বলেছি। টুর্নামেন্ট মাঠে গড়ালে তা বোঝা যাবে। আশা করছি, ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে দলগুলো এ নির্দেশনা মেনে চলবে।’

কিন্তু আজ যখন টুর্নামেন্ট মাঠে গড়াচ্ছে, তার আগেই এ নিয়মের কার্যকারিতা নিয়ে উঠে গেছে প্রশ্ন।

নবিকে প্রশ্ন করার সময় পাশেই বসে রংপুর রেঞ্জার্সের টিম ডিরেক্টর এনায়েত হোসেন সিরাজ। লেগ স্পিনার ও ফাস্ট বোলারের নিয়ম নিয়ে সন্দিহান তিনি, ‘১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করতে হলে তেমন উইকেট তো বানাতে হবে। সঙ্গে টিম কম্বিনেশনের ব্যাপার রয়েছে। তবে আমরা লেগ স্পিনার খেলানোর ব্যাপারটিকে অগ্রাধিকার দেব।’ কিন্তু বিসিবি তো অগ্রাধিকার না, এটিকে করেছে বাধ্যতামূলক। সেটি মানতে রাজি নন সিরাজ, ‘আমার মনে হয় না বাধ্যতামূলক। প্লেয়িং কন্ডিশনে এমন কিছু নেই।’ অন্যান্য দলের পক্ষ থেকেও একই রকম কথা। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের ডিরেক্টর জালাল ইউনুস যেমন বলেছেন, ‘লেগ স্পিনারকে চার ওভার বোলিং করাতে হবে, এটি তো অবাস্তব। এক ওভারে ২০ রান দেওয়ার পরও কি ওকে দিয়ে বোলিং করাতে হবে? তবে আমরা লেগ স্পিনার নিয়েছি। ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির বোলার এখনো পাইনি। বিদেশ থেকে অমন বোলার আনার চেষ্টা করছি।’

লেগ স্পিনার হিসেবে ঢাকা প্লাটুনে আছেন দুই পাকিস্তানি শহীদ আফ্রিদি ও শাদাব খান। এ ছাড়া চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সে রায়ান বার্ল, জুবায়ের হোসেন, খুলনা টাইগার্সে আমিনুল ইসলাম, রাজশাহী রয়্যালসে মিনহাজুল আবেদীন আফ্রিদি, অলক কাপালি, রংপুর রেঞ্জার্সে রিশাদ হোসেন এবং সিলেট থান্ডার্সে জীবন মেন্ডিস। কুমিল্লা ওয়ারিয়র্সে কেউ তেমন নেই। তাতেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটেনি বলে দাবি টিম ডিরেক্টর নাঈমুর রহমানের, ‘লেগ স্পিনারই রাখতে হবে, এমন কিছু বলা হয়নি। আমাদের বলা হয়েছে বিশ্বমানের স্পিনার বা লেগ স্পিনার রাখতে হবে। সে হিসেবে আমরা আফগানিস্তানের মুজিব উর রহমানকে নিয়েছি। ও নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের, তাই না?’

তাহলে লেগ স্পিনার ও ১৪০ কিলোমিটারের বেশি গতির বোলার রাখাটা কি এবারের বিপিএলের নিয়ম নাকি নির্দেশনা? ধন্ধটা কাটাতে পারতেন যিনি, সেই বিসিবি পরিচালক মাহবুব আনাম নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখলেন, ‘বিসিবির নির্দেশনা অনুসারে তখন কথাটি বলেছিলাম। এখন তো আর আমি বিপিএলের সঙ্গে সেভাবে নেই। তাই প্লেয়িং কন্ডিশন ও প্লেয়ার্স রুলে কী আছে, ঠিক বলতে পারব না।’ বিপিএল টেকনিক্যাল কমিটির চেয়ারম্যান রকিবুল হাসান এটিকে নিয়ম বলতে চান না, ‘আমি যতটুকু দেখেছি, এটি লিখিত আকারে নেই। দলগুলোকে গাইডলাইন হিসেবে তা বলা হয়েছিল।’

কিন্তু জাতীয় ক্রিকেট লিগেও তো লেগ স্পিনার খেলানোটা নিয়ম হিসেবে লিখিত আকারে ছিল না। তাহলে ‘অপরাধী’ সাজিয়ে দুজন কোচকে বরখাস্ত করা হয় কেন? বঙ্গবন্ধু বিপিএলেও কি তেমন কঠোর হবে বিসিবি? বাস্তবতা তা বলছে না। ঠিক যেমন হয়তো বাস্তবসম্মত না প্রতি দলে লেগ স্পিনার ও ১৪০ কিলোমিটার গতির বোলার রাখা; তাঁদের দিয়ে পূর্ণ চার ওভার করে বোলিং করানো।

তাহলে এক-দেড় মাস ধরে বিসিবির পক্ষ থেকে অমন অবাস্তব নিয়মের কথা বলে বেড়ানো হলো কেন?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা