kalerkantho

রবিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০২০। ৫ মাঘ ১৪২৬। ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

দমেননি ফ্রেডরিক আর্চাররাও না

১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দমেননি ফ্রেডরিক আর্চাররাও না

পোখারা থেকে প্রতিনিধি : ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানের সেই হত্যাযজ্ঞ অনেকভাবেই বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল। ক্রীড়াঙ্গনও এর বাইরে ছিল না। আর্চারি ফেডারেশন পরের অলিম্পিক পরিকল্পনায় হাই প্র্রফাইল একজন কোচের সন্ধানে ছিল, ফ্রান্সের একজনের সঙ্গে সব দিক মিলে গেলেও তাঁকে বাংলাদেশে আনা যায়নি। কারণ ছিল ওই একটাই, সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশকে আর নিরাপদ ভাবছিলেন না তিনি। এশিয়ান আর্চারি অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শে এরপর জার্মান মার্টিন ফ্রেডরিকের দ্বারস্থ হয় বাংলাদেশ। তিনি রাজি হওয়ার আগে ঢাকায় এসে এক সপ্তাহ রোমানদের পর্যবেক্ষণ করেন, নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেনইনি।

কাল তাঁর হাত ধরেই যখন দক্ষিণ এশীয় গেমসে ইতিহাস গড়ল আর্চারি, সেই প্রসঙ্গ ওঠাতেই দৃঢ় হলো ফ্রেডরিকের চোয়াল, ‘এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা সব কিছু থামিয়ে দিতে চায়। আমি কেন তাদের উদ্দেশ্য সফল করব। আমি থামার মানুষ নই, আমি চলতে চাই।’ বাংলাদেশে ওই সপ্তাহখানেকের সফরটা তাই শুধু আর্চারদের মান, উন্নতির সম্ভাবনা, সংগঠকদের পরিকল্পনা—এসব কিছু খুঁটিয়ে দেখতেই তিনি পার করেছেন। বাংলাদেশ আর্চারির সাধারণ সম্পাদক রাজিবউদ্দিন আহমেদের মতে তিনি এই মুহূর্তে বিশ্বের সেরা ১০ আর্চারি কোচের একজন। আর্টিসান তো গেলই, রোমানদের মধ্যে তিনি যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন, তাতেও ফ্রেডরিক বাংলাদেশকে ‘না’ করে দেওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাননি। অথচ তাঁর কাছে তখন প্রস্তাব ছিল সিঙ্গাপুর, সৌদি আরব, কলম্বিয়াসহ আরো বেশ কিছু দেশের। জার্মান কোচ কাজ শুরু করলেন রোমানদের নিয়ে। রোমান সেসময় অলিম্পিক বৃত্তি নিয়ে সুইজারল্যান্ডে, কিন্তু ফ্রেডরিকের টানে সেই বৃত্তিকেও ‘না’ করে দিয়ে তিনি দেশে ফিরে এলেন। তা নিয়ে যে বিতর্ক হয়েছিল তা চিরতরে বন্ধ করে দিলেন এই আর্চার বছর ঘুরতেই সেই অলিম্পিক স্বপ্নের প্রথম বড় ধাপ কোটা অর্জন করে। আগের অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে গলফার সিদ্দিকুর রহমান করেছিলেন যা, রোমান তাঁর পর ইতিহাসের দ্বিতীয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে অর্জন করলেন তা ওই ফ্রেডরিকের হাত ধরে। এই জার্মানকে সঙ্গী করেই এরপর নেদারল্যান্ডসের ওই বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেই বাংলাদেশের প্রথম আর্চার হিসেবে জেতেন ব্রোঞ্জ। এই রোমান-ফ্রেডরিক জুটি এরপর এশিয়া কাপ আর্চারিতেও সোনা জিতিয়েছেন বাংলাদেশকে। কিন্তু এই জার্মান কোচ যে শুধু রোমানকেই নয়, তুলে আনছিলেন অন্য জুনিয়র আর্চারদেরও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ও এশিয়া কাপে স্কোরে তাঁর ছাপ ছিল। দক্ষিণ এশীয় গেমসে সেই তাঁরাও জ্বলে উঠলেন সর্বাগ্রে, রোমান এখানে রেকর্ড স্কোর করলেন কিন্তু পাশাপাশি ইতিও হারালেন অলিম্পিক কোটা পাওয়া এক আর্চারকে। ভারতীয়রা না থাকায় বাংলাদেশ এবার বেশ কিছু সোনা জিতবে আর্চারিতে—এই প্রত্যাশা ছিলই। কিন্তু এভাবে দশে দশ হবে তা সেই প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গেছে। বাংলাদেশের আর সবার মতো ওই বন্ধুসুলভ, সদাহাস্য ফ্রেডরিকেরও তাই গর্বের শেষ নেই। কাল অবশ্য আর্চারি সম্পাদক যখন অভিনন্দন জানাতে এলেন তাঁকে, ফ্রেডরিক এই কীর্তির পুরোটাই দিতে চাইলেন আর্চারদের নিজেকে আড়াল করে, ‘না, না, আমি কিছু না। এ কীর্তির পুরোটাই ওদের। ওরাই এটা সম্ভব করেছে। আর অবশ্যই ফেডারেশন অভিনন্দন পাবে। কারণ তারাই এই পথটা তৈরি করেছে।’ আর্চারদের কাছে অবশ্যই এই ফ্রেডরিকই। শুধু আর্চার কেন, স্থানীয় আরো যাঁরা কোচ আছেন, তাঁদের কাছেও ফ্রেডরিকই এই সাফল্যের উৎস। কোচ জিয়াউর রহমান যেমন বলছিলেন, ‘ফ্রেডরিক আসার আগে আমাদের আর্চারির সংসারটা যেন ছিল বাবাহীন। বাবা যেমন আর সব কিছুর পরও ভরসার জায়গা। ফ্রেডরিক আসার পর আমাদের সেই ভরসার জায়গাটাই নিলেন। আমরা জানলাম আমাদের নির্দেশনা দেওয়ার মানুষ আছে। আর্চাররা জানল তাঁর পেছনে সেরা একজন যিনি তাঁকে বিশ্বসেরা করে দিতে পারেন। এই বিশ্বাসটাই রোমানদের এগিয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।’ রোমান নিজেও বলেন, ‘ফ্রেডরিক না এলে হয়তো কিছুই সম্ভব হতো না।’ মাথা নত করতে না শেখা একজন, তাঁর কাছ থেকে আর্চাররাই বা থামতে শিখবেন কেন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা