kalerkantho

সোমবার । ২০ জানুয়ারি ২০২০। ৬ মাঘ ১৪২৬। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

আর্চারি ইতিকে দিয়েছে নতুন জীবন

৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আর্চারি ইতিকে দিয়েছে নতুন জীবন

পোখারা থেকে প্রতিনিধি : এখনো কিশোরীর চপলতা তাঁর হাসিতে। সাংবাদিকদের প্রশ্ন শুনে উত্তর দেওয়ার বদলে মুখ টিপে হাসছেন। কে বলবে এই ইতি খাতুন একটু আগেই দক্ষিণ এশিয়ার সেরা আর্চারের মুকুট পরেছেন, কে বলবে আগের দিনই হারিয়েছেন অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করা তাঁর দ্বিগুণ বয়সী আরেক আর্চারকে। ইতির জয়ের গল্প কিন্তু এখানেই শেষ নয়!

 

সেটা শুরু আরো তিন বছর আগে নিজের ঘর থেকেই! দরিদ্র বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন ১১ বছর বয়সেই। বিয়ের দিন-ক্ষণ পাকা হবে, বাড়িতে পাত্রপক্ষ এসে গিয়েছে। কিন্তু বেঁকে বসল ওই ছোট্ট মেয়ে। তখন চুয়াডাঙ্গায় আর্চারির প্রতিভা অন্বেষণ চলছে। স্কুলের অন্য মেয়েদের সঙ্গে ইতিও মজেছেন সেই আর্চারিতে। বিয়ে রুখতে এই মেয়ে তখন ঘর পালিয়ে সেই আর্চারি ক্যাম্পেই নিজের আশ্রয় খোঁজে। কে জানত, তিন বছরের ব্যবধানেই সেই ইতির ভাগ্য এভাবে বদলে যাবে! পোখারায় কাল আর্চারদের জয়জয়কারের মাঝেও রোমানের সঙ্গে আলাদা আর যে একজন তিনিই এই ইতি। কাল রোমানের মতোই দলীয় আর মিশ্র দ্বৈতে জোড়া সোনার পদক ঝুলিয়েছেন গলায়। আজ এককের ফাইনাল। রোমানের মতোই তাঁরও মাথায় ত্রিমুকুট উঠল বলে। এই এককেই আগের দিন ভুটানের ২৯ বছর বয়সী আর্চার কারমাকে হারিয়ে শোরগোল ফেলে দেন তিনি। কারমা ভুটানের সেরা আর্চারই শুধু নন, তাদের ক্রীড়া ইতিহাসে একমাত্র ক্রীড়াবিদ হিসেবে অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতাও অর্জন করেছেন। ইতির এমন পারফরম্যান্সের পরই আসলে আর্চারির সব ইভেন্টেই সোনা জিতে নেওয়া আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে যায়। কিন্তু ইতি নিজেই কি ভাবতে পেরেছিলেন এতটা হবে পোখারায়, ‘সত্যি বলতে এভাবে আমরা একের পর এক সোনা জিতব, আমি ভাবতে পারিনি। আমি ভেবেছি একটা ভালো কিছু হবে, পদক জিতব। কিন্তু সবগুলো ইভেন্টেই সোনা আসবে ভাবতে পারিনি।’ এককের সেমিফাইনালে যে ভুটানের কারমাকে হারালেন, এমন নামি আর্চারের বিরুদ্ধে একটুও চাপ অনুভব করেননি বা ছন্দ হারাননি! সাংবাদিকদের এমন বিস্ময়ের মুখে আবার সেই চপল ইতিরই দেখা মিলল, ‘আমি তো জানতামই না উনি এত বড় আর্চার। আমার সঙ্গে তো বেশ খারাপই মেরেছেন।’ ১৪ বছরের ইতি সেখানে নিজের স্বাভাবিক পারফরম্যান্সটা দিয়েই উঠে গেছেন এককের সোনার লড়াইয়ে।

আজ তা জিতলে এক আসরে তিন সোনা জয়ের অনন্য অর্জনই হয়ে যাবে তাঁর এতটুকু বয়সে। সেদিন ওভাবে বিয়ের পিঁড়ি থেকে উঠে না এলে আজ কোথায় থাকতেন এই ইতি। বাল্যবিবাহের অভিশাপ নিয়ে ধুঁকে ধুঁকে জীবন পার করা আর দশটা মেয়ের মতোই হয়তো ছন্নছাড়া হয়ে যেত তাঁর জীবন। কিন্তু আর্চারি তাঁকে দিয়েছে নতুন জীবন। কাল ফেডারেশন সম্পাদক রাজিব উদ্দিন আহমেদ চপল বলছিলেন, ‘ছোটবেলায় ওর বো ধরা দেখেই আমাদের কোচ বলছিল, ওকে নিয়ে অনেক দূর যাওয়া সম্ভব। এরপর ইতির বাবা-মায়ের সঙ্গে আমাদের অনেকবার দেখা হয়েছে। উনারা এখন আর্চারির প্রতি বরং কৃতজ্ঞই, নিজেদের ভুল বুঝতে পেরেছেন।’ এর পরও এই আসরে ইতি বিস্ময়ের পর বিস্ময় জন্ম দিচ্ছেন। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপেই যে এখনো সোনা জেতা হয়নি তাঁর। প্রতিভা ছিল, সম্ভাবনা ছিল সে কারণেই তিনি দলে। আর কি দারুণ মঞ্চেই সবটা প্রকাশ পেল তাঁর। নিজের সেই বিয়ে ভাঙার গল্প কাল মনে করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলো। ইতি নিজেও জানেন কী অসম্ভব সম্ভব করেছেন তিনি। কিন্তু আজ তৃতীয় সোনার লড়াইয়ের আগে আর পিছু ফিরতে চাননি, ‘সেই গল্প বলব কিন্তু আজ না, আমার এককের ফাইনালের পর।’ যেভাবে সব বাধা পেরিয়েছেন আজ এই শেষ বাধাটাও নিশ্চয় থামাতে পারবে না তাঁকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা