kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

বারবার মাবিয়া

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বারবার মাবিয়া

কাঠমাণ্ডু থেকে : কেউ কথা রাখেনি। প্রায় তিন বছর মাবিয়া আক্তারকে ভুলেই ছিলেন সবাই। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সুরম্য টাওয়ারের পেছনে এক ঘুপচি ঘরে মাবিয়াদের অনুশীলন দেখতে যাননি কেউ।  বিদেশে গিয়ে বা দেশেই বিদেশি কোচের অধীনে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ চাওয়া ছিল গুয়াহাটিতে গত এসএ গেমসে সোনা জিতেই। কি আশ্চর্য, কাল পোখারায় আবারও বাংলাদেশকে সোনার আলোয় ভাসিয়ে সেই একই আরজি সোনাজয়ী কন্যার কণ্ঠে, ‘আমরা চার মাসের অনুশীলনেই দেশকে সোনা এনে দিতে পারি। আমাদের আরেকটু উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দিলে, আরো বেশি সময়ের ক্যাম্পের সুযোগ দিলে বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা এই দক্ষিণ এশিয়ায় আরো ভালো করবে।’

মাবিয়ার এবারের চ্যালেঞ্জটা ছিল বরং বেশি। নিজেই বলছিলেন, ‘গতবার আমি ছিলাম নতুন মুখ। সেভাবে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল না কেউ। এবার জানি গোটা দেশ আমার কাছে কিছু আশা করছে। গতবারের সোনাজয়ী হিসেবে সেই চাপটা সঙ্গী করেই আজ আমাকে পারফরম করতে হয়েছে। সোনা ধরে রাখাটা এবার আমার দায়িত্বই ছিল।’ আহা! মাবিয়ার মতো করে সবাই যদি দায় পূরণের লড়াইয়ে নামতেন তাহলে অ্যাথলেটরাই এগিয়ে যেতে পারতেন আরো বেশি। এই তো গত মে মাসেই ফেডারেশনের সহায়তা নিয়ে মাবিয়া যখন নিজে নিজেই এই গেমসের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, তখনো বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন কোনো খেলায়ই ক্যাম্প শুরু করতে পারেনি। মাবিয়াদের ব্যক্তিগত প্রস্তুতি চলত এনএসসির পেছনে সেই অপরিসর জিমনেসিয়ামে। জুলাইয়ে গেমসের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি শুরু হলো, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের স্থান সংকুলান হয় না সেখানে। থাকার জায়গাও নেই। মিরপুরে ক্রীড়াপল্লী আছে, সেখানে আবার জিম সুবিধাই নেই। নেপাল আসার আগেও তাই মাবিয়াকে আক্ষেপ নিয়ে বলতে হয়েছে, ‘আজও একটা ভালো জিম পেলাম না আমরা।’ বিওএ থেকে এক চীনা কোচের আশ্বাস ছিল, ভারোত্তোলকরা সেই কোচের জন্য অপেক্ষায় থেকে থেকে অনিশ্চয়তায় ভোগেন। শেষ পর্যন্ত আর তা পাননিও তাঁরা। টানা দ্বিতীয় গেমসে সোনা জিতেও কাল মাবিয়াকে তাই আর আবেগাপ্লুত দেখায় না, বরং কঠিন মুখ নিয়ে তিনি বলে চলেন অ্যাথলেটদের চেয়েও না পাওয়ার বেদনার কথা।

গুয়াহাটিতে গতবার সোনার অপেক্ষায় থেকে থেকে যখন হতাশা ভর করেছিল বাংলাদেশ কন্টিনজেন্টে, তখনই মাবিয়া জ্বলে উঠে পথ দেখিয়েছিলেন। এবারের গেমসেও টানা তিন দিন সোনাহীন বাংলাদেশ। তিন দিন এই ঘরে কিছু যোগ না হওয়া মানে সাত দেশের র‌্যাংকিংয়ে কেবল পিছিয়ে পড়তে থাকা। কারণ ভারত, শ্রীলঙ্কা ছাড়াও নেপাল, পাকিস্তানও প্রতিদিন যোগ করছিল কিছু না কিছু। অবশেষে মাবিয়াই আবার সোনায় ফেরালেন লাল-সবুজকে। এরপর ভারোত্তোলনেই আবার পতাকা তুললেন জিয়ারুল, ওদিকে ফেন্সিংয়ে দেশকে গর্বিত করলেন ফাতেমা। মাবিয়া তাই বারবারই পথ দেখাচ্ছেন, পথ খুঁজে নিচ্ছেন নিজেই। কিন্তু এভাবে আর কতবার?

মাবিয়ার পর কাল যে জিয়ারুল দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হলেন, তাঁর প্রথম আন্তর্জাতিক আসরই এটি, প্রথমবারেই ফিরছেন সোনা নিয়ে। বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের প্রতিভা, সামর্থ্যের প্রতিচ্ছবি যেন জিয়ারুল। কিন্তু তিনিও জানেন কতটা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে আসতে হয়েছে তাঁকে, ‘আমরা যেখানে অনুশীলন করি সেটা একটা গুদাম ঘরের মতো। প্রশিক্ষণের ভালো সরঞ্জামাদিও নেই। আমাদের গরিব দেশ তাই আমি এটা মেনেও নিয়েছি। আজকের সোনা জয়ে আমার আনন্দের তাই শেষ নেই।’ জিয়ারুলের বাড়ি দিনাজপুর। জাতীয় ভারোত্তোলক এবং ২০১০ এসএ গেমসে রুপা জেতা মনোরঞ্জন রায়কে দেখেই ভারোত্তোলনে এসেছেন। কৃষক পরিবারের এই ভারোত্তোলক এরপর সেনাবাহিনীর একটি চাকরিকেই ভেবেছিলেন জীবনের মোক্ষ। সেটা পেয়েছেনও তিনি বছর তিনেক আগে। এরই মধ্যে জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন গত বছর। তাঁর কাছে এই দক্ষিণ এশিয়ার সোনা যে প্রত্যাশারও বেশি, ‘এই খেলার জন্য আমি প্রচুর কষ্ট করেছি। প্রতিদিন পাঁচ ঘণ্টা করে অনুশীলন করতাম। তবু জানতাম না আমাকে দিয়ে এই এসএ গেমসের সোনা সম্ভব হবে কি না।’ মাবিয়ার অনুপ্রেরণার কথাও বললেন, ‘আজকের খেলা নিয়ে বেশ নার্ভাস ছিলাম আমি। কিন্তু মাবিয়া যখন সোনা জিতে গেল। তখনই আত্মবিশ্বাস পেয়েছি। মনে হয়েছে আমিই পারব। ভালো একটা কিছুর জন্য তখন আসলে মুখিয়ে পড়েছিলাম আমি। সেই আত্মবিশ্বাসের ফলেই আজ এটা সম্ভব হলো।’ কিন্তু বছর দুয়েক বা তিনেক পর এই জিয়ারুল নিশ্চয় মাবিয়ার মতোই আক্ষেপ করতে চাইবেন না ভালো একটা জিমের জন্য।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা