kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

ডাউন দ্য উইকেট

আমাদের সাফল্য-ক্ষুধা

সাইদুজ্জামান

৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আমাদের সাফল্য-ক্ষুধা

বাংলাদেশ-মালদ্বীপ ফুটবল ম্যাচ চলছে তখন কাঠমাণ্ডুতে। প্রায় সমশক্তির দলের লড়াইয়ে একটা চোখ সবার। এর মধ্যে এক সহকর্মীর প্রশ্ন, ‘কাল কি মালদ্বীপের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ বাংলাদেশের?’

পাশ থেকে একজন শুধরে দিলেন, ‘আরে নাহ্, বাংলাদেশ-মালদ্বীপ ম্যাচ তো এখন চলছে!’ এরপর তাঁকেই উল্টো শুধরে দিলেন আরেকজন, ‘ক্রিকেট দলের কথা হচ্ছে।’

প্রত্যুত্তরে বিস্ময় গোপন করে তাঁর স্বগতোক্তি, ‘হুম, মালদ্বীপও ক্রিকেট খেলে!’

নিউজরুমের এ কথপোকথনের ব্যাকগ্রাউন্ডে আমাদের সীমাহীন সাফল্য-ক্ষুধা। তার পরিধি এসএ গেমসের মতো লো-প্রফাইল আসর থেকে বিশ্বকাপ পর্যন্ত। জয়ের জন্য মরিয়া ভাব দেখে বোঝার উপায় নেই কোন টুর্নামেন্টের তাৎপর্য কতটুকু। যেমন বোঝার উপায় নেই টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ দল ভারত নাকি জিম্বাবুয়েকে হারিয়েছে! আবার টানা হারের পর একটি জয়েই ক্রিকেটের ট্র্যাকে উঠা নিয়ে যতটা আশাবাদ ব্যক্ত করি, ঠিক ততটাই সমালোচনামুখর হয়ে উঠি সাফল্যের মোটামুটি ধারাবাহিকতায় একটি হারের ছেদে। 

বকলমে সাফল্যের জন্য মরিয়া ভাবটা জীবনের যেকোনো ক্ষেত্রেই প্রশংসনীয়। তবে আমরা কি সত্যিকার অর্থে সাফল্যের মানে জানি? হাব-ভাব দেখে কেন যেন মনে হচ্ছে সাফ গেমসের সোনা জিতলেই আমরা জোর হাততালি দেব। অন্তত যে মানের দল নেপালে পাঠানো হয়েছে, তাতে ক্রিকেট বোর্ডের মতিগতি সেরকমই মনে হচ্ছে। যদিও এই অকারণ ‘সাফল্য-ক্ষুধা’র দায় এককভাবে বোর্ডের ওপর চাপিয়ে দিলে দাবিটা একপেশেই হবে।

সে প্রসঙ্গে পরে আসছি। তার আগে ইডেন টেস্ট চলাকালে জাতীয় নির্বাচক হাবিবুল বাশারের সঙ্গে কয়েক মিনিটের আড্ডার খানিকটা উল্লেখ করতে চাই। তাঁর খেলোয়াড়ি বয়স এবং আমার সাংবাদিকতা অভিজ্ঞতার সামান্য তারতম্য থাকতে পারে, তবে বয়সে পার্থক্য নেই। সেই সুবাদে ঘনিষ্ঠতাও আছে। তো, তিনি ইডেনে গিয়েছিলেন ভারতীয় বোর্ড সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলির অতিথি হয়ে। আমি গিয়েছিলাম নিছকই দর্শক হিসেবে। ইডেনের ক্লাব হাউসে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতে তাই আড্ডা জমে উঠতে সময় লাগেনি। এর মাঝে নিছক কৌতুকবশতই জানতে চেয়েছিলাম, ‘ইমার্জিং কাপে ঘুরে ফিরে সেই একই ক্রিকেটারদের খেলানো কি দরকার ছিল খুব? ভারত তো একদম আনকোরা দল পাঠিয়েছে।’ বাশারের অভিব্যক্তির পরিবর্তন দেখেই বুঝে ফেললাম এই ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ তাঁর মোটেও পছন্দ হয়নি, ‘কেন, কি অসুবিধা? তিনজন সিনিয়র ক্রিকেটার খেলানোর নিয়ম আছে। সেটা মেনেই দল গড়েছি। আর জিততে চাইব না কেন?’

তাঁকে বোঝাতে গেলাম যে জয়ের চেষ্টা অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু সেটা করতে গিয়ে ভবিষ্যতের সঞ্চয়ের কথা ভুলে গেলে কি চলে? এ ধরনের টুর্নামেন্টে যত নতুন ক্রিকেটার খেলানো হবে, ততই সংখ্যায় অধিক ভবিষ্যতের ক্রিকেটাররা ‘এক্সপোজার’ পাবেন। কিন্তু সেসব কানেই নিলেন না বাশার। ২০০০ সালে বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের স্মৃতি রোমন্থনের যতিও পড়েছিল তখনই!

সিঁড়ি বেয়ে অপসৃয়মাণ হাবিবুল বাশারকে অবশ্য এ জন্য বিঁধে লাভ নেই। তিনি কিংবা তাঁরা, যাঁরা যেকোনো আসরে সেরা দল পাঠানোর নামে একজন সৌম্য সরকারকে লন্ডন থেকে দিল্লি ঘুরিয়ে কীর্তিপুরও (সাফ ক্রিকেটের শহর) পাঠান। সাফল্যের জন্য এতটাই মরিয়া তাঁরা। অবশ্য নির্বাচক কিংবা বোর্ড কর্মকর্তাদের এহেন মানসিকতার পেছনে আমাদের যথেষ্ট প্রভাব-প্রতিপত্তি রয়েছে।

রয়েছে বলেই কোর্টনি ওয়ালশ দীর্ঘ সময় বাংলাদেশের পেস বোলিং কোচ পদ অলংকৃত করে গেছেন। এখন স্পিন বোলিং নিয়ে কাজ করছেন ড্যানিয়েল ভেট্টোরি। সাবেক কিউই অধিনায়ককে ভারতে দেখে আমার এক সহকর্মীর প্রশ্ন, ‘আচ্ছা, উনি স্পিন বোলিং নাকি ফিল্ডিং কোচ?’ কারণ, সিরিজ চলাকালে একজন স্পেশালিস্ট কোচের আসলে নতুন কিছু করার সুযোগ থাকে না। ধরুন, ভারতে টেস্ট সিরিজ চলাকালে তাইজুল ইসলামকে নতুন কিছু করার পরামর্শ দিলেন ভেট্টোরি। প্রশ্ন হলো, কারোর পক্ষে কি সম্ভব সেই নতুন কিছু ম্যাচে চেষ্টা করা? বরং ভেট্টোরিকে যদি ক্যাম্পে পাওয়া যেত, তবে উপকৃত হতেন তাইজুল এবং এমন আরো অনেকে।

সেদিন জাতীয় দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার খুব কার্যকর একটা পন্থার কথা বলছিলেন। ভেট্টোরি স্পিন অনুপযোগী নিউজিল্যান্ড-ইংল্যান্ডেও দারুণ সফল স্পিনার ছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের স্পিনাররা ওরকম কন্ডিশনে বল ফেলার জায়গা খুঁজে পান না। এ অসহায়ত্বের শিকার খোদ সাকিব আল হাসানও। তো, ভেট্টোরির কাছে বাংলাদেশের স্পিনারদের প্রধান জিজ্ঞাস্য হওয়ার কথা পেস সহায়ক কন্ডিশনে স্পিন বোলিংয়ের রহস্যটা কী? কিন্তু নতুন স্পিন বোলিং কোচকে তাইজুল প্রশ্নটা করবেন কখন? ভারত কিংবা পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ চলার মাঝখানে, যে সিরিজগুলো অনুষ্ঠিতই হয় কিংবা হবে উপমহাদেশীয় কন্ডিশনে!

এটা নিয়ে কেউ কি খুব ভেবেছেন? মনে হয় না। যা শুনছি, তাতে মনে হচ্ছে বছরে ১০০ দিনের রুটিনটা ভেট্টোরি মনের মতো করেই সাজাবেন। বাংলাদেশ দলের সঙ্গে থাকবেন সিরিজ বাই সিরিজ। তাতে স্পিনারদের বদলে ফিল্ডারদের নিয়েই হয়তো সময় কাটবে তাঁর। আর চুক্তির মেয়াদ শেষে সাড়ে তিন লাখ ডলার পকেটে যাবে ভেট্টোরির। তবে এই যে ওয়ালশ কিংবা ভেট্টোরিরা নিয়োগ পান বাংলাদেশে, তার অন্যতম কারণ চমক। আর আমজনতাও খুশি এমন চমকে, যাক একটা কোচ এনেছে বটে! এই যে এবারের বিপিএলে বিদেশি কোচ আসছেন, কি জন্য? প্রতিটি দলের কয়জন ক্রিকেটারকে তাঁরা চেনেন? একাদশে স্থানীয় ক্রিকেটার থাকবে সাতজন। স্কোয়াডে আছে অন্যূন ১৩ জন। এঁদের কয়জন সম্পর্কে জানেন কিংবা কয়েক দিনে জানতে পারবেন হার্শেল গিবস কিংবা ওটিস গিবসন? একটু অবাকই লেগেছে যে, এবারের আসরটি যেহেতু পুরোপুরি বিসিবির, তাতে স্থানীয় কোচদের ‘এক্সপোজার’ দেওয়ার মোক্ষম একটা সুযোগ ছিল। কিন্তু সে আর হলো কই। তবে বিভিন্ন দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালকদের হাবেভাবে মনে হচ্ছে এখানেও সেই চমক, যার মূলে আমাদের আমজনতার সেন্টিমেন্ট। নামি বিদেশি কোচ মানেই নামি ব্র্যান্ড, ব্যস। পাবলিক খুশি!

পেশাদারিত্বের সঙ্গে অবশ্য সাধারণের এ গা-জোয়ারি যায় না। কিন্তু মাঝেমধ্যে ভাবি, ওই লোকগুলোরই বা কী করার আছে। ২০১৯ বিশ্বকাপের আগেও তারা আকাশে উড়ছিলেন। কিন্তু বিশ্বকাপে প্রত্যাশিত ফল না মেলার পর থেকে তাদের মুণ্ডপাত হচ্ছে। পরিস্থিতি এখন এতটাই নাজুক যে, সেদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একজনের স্ট্যাটাস, ‘বিপিএলের লোগোটা ভালো লাগেনি।’ সে কারোর ভালো না লাগতেই পারে। তবে বিস্মিত হয়ে দেখি তার এক বন্ধু মন্তব্য করেছেন, ‘পাপনের পদত্যাগ চাই।’ কোনো একটি আসরের লোগো মনঃপূত না হওয়ায় বোর্ডপ্রধানের পদত্যাগ দাবি করা প্রথম দেশ সম্ভবত বাংলাদেশ!

ঘটনাটা উল্লেখ করলাম এ কারণে যে, এ জাতীয় বালখিল্যতা মূল বিষয় থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে নেয় সবার। তাই একজন পেশাদারও ঘুম থেকে উঠে প্রথমেই ফেসবুকে চোখ বোলান ‘পাবলিক পালস’ বুঝতে। এখন তিনি যদি দেখেন যে, লোগোর কারণে পদত্যাগ দাবি করা হচ্ছে, তিনি তো হেসে তা উড়িয়ে দেবেন। আর যদি দেখেন ভেট্টোরিকে চুক্তিতে আবদ্ধ করাতেই জনতার ভালোবাসা উথলে উঠছে, তাহলে তিনি তো ভেট্টোরির পর আরো বড় কোনো নাম ভবিষ্যতের জন্য ঠিক করে রাখবেনই!

দিনশেষে আমরা সবাই মিলে আবারও সাফল্যের পেছনে হন্যে হয়ে ছুটব। ভারত-পাকিস্তান যেখানে দলই পাঠায়নি, সেসব টুর্নামেন্টেও হাই প্রফাইল দল নিয়ে ঝাঁপাব। সোনা জিতলে কাঁপব, না জিতলে কাঁপাব!

ভাবছি কাঠমাণ্ডু থেকে দল নিয়ে ফিরলে হাবিবুল বাশারকে আরেকটু রাগাব। দেখা হলে প্রশ্ন করব, ‘জনাব, কি লাভ হলো?’ জানি, আবারও চোখে-মুখে বিরক্তি ছড়িয়ে এড়িয়ে যাবেন তিনি। তবে বাশারকে যতটুকু চিনি তাতে নির্দ্বিধায় বলে দিতে পারি তাঁর এই বিরক্তি গণদাবির জের।

লেখার শেষভাগে এসে সামির শাকিরের কথা খুব মনে পড়ছে। এই ইরাকি বিশ্বকাপার বাংলাদেশের গোটা দুই সফলতম ফুটবল কোচের একজন। তাঁর হাত ধরেই সাফ গেমসের প্রথম পদক জিতেছিল বাংলাদেশ। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে নেপালে ওই আসরের মহড়া হয়েছিল একই বছরের এপ্রিলে, ভারতের গোয়ায়। সাফ ফুটবলে মালদ্বীপের সঙ্গে ড্রয়ের পর প্রবল সমালোচিত তিনি দুই ম্যাচ পরই বাংলাদেশে বীরের মর্যাদা পেয়ে যান। ওই আসরের ফাইনালের আগে তাঁর হোটেল রুমে বসে একটা অমরবাণী শুনেছিলাম সামির শাকিরের, ‘তোমরা যত দিন শর্ট টার্ম ভাবনা থেকে বেরোতে না পারবে, তত দিন কিচ্ছু হবে না। যেকোনো কোচই তোমাদের এক-দুটি ম্যাচ জিতিয়ে নিতে পারবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে উন্নতি হবে না।’ হয়ওনি।

ক্রিকেটেও একই দশা। সাফল্যের শর্টকাট রোডম্যাপ ধরেছেন সংগঠকরা। তাঁদের কি আমরা বাধ্যও করিনি?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা