kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

আবার শ্রেষ্ঠত্ব

ব্যালন ডি’অরের নতুন ইতিহাস

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ব্যালন ডি’অরের নতুন ইতিহাস

ফুটবলার হিসেবে খুব অসাধারণ কিছু ছিলেন না গ্যাব্রিয়েল অ্যানো। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ফরাসি জাতীয় দলের হয়ে কয়েকটা ম্যাচ খেলেছিলেন, এরপর এক বিমান দুর্ঘটনায় আহত হয়ে খেলা ছেড়ে শুরু করেন সাংবাদিকতা। ফুটবলের চেয়ে কলম হাতেই বেশি সফল অ্যানো। তাঁর মাথা থেকেই এসেছে ইউরোপিয়ান কাপের ধারণা। সেরা ফুটবলারকে পুরস্কৃত করার চিন্তাটাও প্রথম আসে অ্যানোর মাথা থেকেই। ১৯৫৬ সাল থেকে ব্যালন ডি’অর দেওয়া শুরু। এরপর নিয়ম-কানুনে এসেছে অনেক পরিবর্তন। তবে লিওনেল মেসি সেই সব কিছু পাল্টে ব্যালন ডি’অরটা নিজের করে নেওয়াটাই যেন নিয়মে পরিণত করেছেন! গতবার লুকা মডরিচের পুরস্কার পাওয়াটা যে ব্যতিক্রম, সেটা প্রমাণ করল নিয়মকেই। ষষ্ঠবারের মতো ফ্রান্স ফুটবলের বেছে নেওয়া সেরা ফুটবলারের পুরস্কারটা পেলেন মেসি। একজন ফুটবলারের এতবার ব্যালন ডি’অর জয়ের আর কোনো নজির নেই।

২০০৪ সালে বার্সেলোনার হয়ে অভিষেক, ২০০৭ সালের ব্যালন ডি’অর মঞ্চেই জায়গা করে নেন খুদে মেসি। সেবার ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও কাকার সঙ্গে মিলে ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিলেও সোনার বলটা হাতে পাননি। প্রথম ব্যালন ডি’অর জয় ২০০৯ সালে। এবার পুরস্কার পাওয়ার পর সেই স্মৃতিই ভেসে উঠেছিল মেসির মনে, ‘১০ বছর আগে প্যারিসেই আমি প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলাম। মনে আছে, আমরা তিন ভাই মিলে এসেছিলাম, আমার বয়স তখন মাত্র ২২। আমার জন্য ব্যাপারটা একেবারে ভাবনার বাইরে ছিল, একটা ঘোরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছিলাম।’ ২০১৯ সালে সেই প্যারিসেই নিজের ৬ নম্বর ব্যালন ডি’অর হাতে পেয়ে মঞ্চে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণা করে মেসি বলেন, ‘১০ বছরে এটা আমার ষষ্ঠ ব্যালন ডি’অর, খুব ব্যতিক্রমী একটা সময়ে, আমার জীবনের একটা বিশেষ মুহূর্তে যখন আমার স্ত্রী আর তিন সন্তান আমার পাশে।’

এবারের ব্যালন ডি’অরের শীর্ষ তিনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় মেসির সঙ্গে নাম ছিল ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো ও ভার্জিল ফন ডাইকের। ৬৮৬ ভোট পেয়ে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন মেসি, তাঁর চেয়ে মাত্র সাত ভোট কম পেয়ে দ্বিতীয় লিভারপুলের ডাচ ডিফেন্ডার ফন ডাইক। প্রায় ২০০ ভোট পেছনে থেকে ৪৭৬ ভোট পেয়ে তৃতীয় রোনালদো। জুভেন্টাসের পর্তুগিজ তারকা অবশ্য আসেনইনি পুরস্কার বিতরণের অনুষ্ঠানে। ফন ডাইক উপস্থিত ছিলেন, হাসিমুখেই মেসির শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে জানিয়েছেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমার সময়ে এমন এক-দুজন ফুটবলার আছে, যারা আসলে অতিপ্রাকৃত। ছয়বারের ব্যালন ডি’অর জয়ী, এই মহান ফুটবলারকে শ্রদ্ধা না জানানোর কোনো কারণ নেই।’

প্রতিটি সফল পুরুষের পেছনেই নাকি থাকে নারীর অবদান! ইতিহাস গড়ার মঞ্চে মেসি কৃতজ্ঞতা জানালেন স্ত্রী আন্তোনেলার প্রতি, ‘আমার স্ত্রী সব সময় বলে, আমি যেন স্বপ্ন দেখাটা না থামিয়ে দিই। সেই সঙ্গে যেন পরিশ্রম করাটাও না থামাই আর খেলাটা উপভোগ করি। আমি খুবই ভাগ্যবান, আমি আশীর্বাদপুষ্ট। আমি অনেক অনেক দিন খেলা চালিয়ে যেতে চাই। জানি একদিন বিদায়ঘণ্টা বাজবেই। তবে তার আগে অনেকগুলো সুন্দর বছর অপেক্ষা করছে সামনে। আমি ফুটবল আর পরিবার, দুই-ই উপভোগ করতে চাই।’

মেসির প্রশংসা করতে করতে বর্তমান ও সাবেক ফুটবলারদের বোধ হয় ক্লান্তিও ভর করছে না, কারণ মেসি প্রতিনিয়তই অবাক করে চলেছেন। ষষ্ঠ ব্যালন ডি’অর জেতার পরও ফুটবলবিশ্বে অনেকেই অবাক হননি। জিয়ানলুইগি বুফন জানিয়েছেন, ‘মেসি যতগুলো ব্যালন ডি’অর পেয়েছে, আর কেউ এই কৃতিত্ব পুনরাবৃত্তি করতে পারবে বলে মনে হয় না।’ পাওলো মালদিনি বলেছেন, ‘মেসিকে যখনই খেলতে দেখি, তখনই মনে হয় ওর প্রতিবছর ব্যালন ডি’অর পাওয়া উচিত।’ পরপারে পাড়ি জমানোর আগে ইয়োহান ক্রুইফ বলেছিলেন, ‘মেসিই হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি ব্যালন ডি’অর জয়ী ফুটবলার। সে পাঁচটা, ছয়টা, সাতটা জিততে পারে। সে অতুলনীয়।’ স্বর্গ বলে কোনো কিছু থেকে থাকলে, সেখান থেকে হয়তো মিটিমিটি হাসছেন ক্রুইফ। তাঁর দেশ নেদারল্যান্ডসের তিন ফুটবলার মিলে জিতেছেন সাতটি ব্যালন ডি’অর; ক্রুইফ ও মার্কো ফন বাস্তেন তিনটি করে আর একটি রুদ খুলিত। মেসি একাই জিতেছেন ছয়টি এবং সংখ্যাটা আরো বাড়ারই সম্ভাবনা।

২০১৯ সালে ৫৪ ম্যাচে ৪৬ গোল করেছেন মেসি, বার্সেলোনার হয়ে গত মৌসুমে ৩৪ ম্যাচে করেছেন ৩৬ গোল, যা কাতালানদের জিতিয়েছে শিরোপা। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নস লিগেও ১২ গোল করে মেসি হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা।

এবার দ্বিতীয়বারের মতো দেওয়া হলো সেরা নারী ফুটবলারের পুরস্কারও। মেয়েদের ব্যালন ডি’অর পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেগার র‌্যাপিনো। ২১ বছরের কম বয়সী সেরা ফুটবলার হিসেবে রেমন্ড কোপার নামানুসারে ‘কোপা’ পুরস্কার পেয়েছেন জুভেন্টাসের ডাচ ফুটবলার ম্যাতিয়াস ডি লিখট। সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার লেভ ইয়াশিন ট্রফি পেয়েছেন লিভারপুলের ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক আলিসন। বিবিসি, এএফপি

যে কারণে মেসি

►  সেপ্টেম্বরেই ফিফার ‘দ্য বেস্ট’ পুরস্কার জিতেছেন মেসি। সেখানেও ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে মেসির যে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, সেই ভার্জিল ফন ডাইক ও ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো।

►  মেসির নৈপুণ্যেই গত মৌসুমে লা লিগার শিরোপা জিতেছে বার্সেলোনা। এ ছাড়া কোপা দেল রে’র ফাইনাল ও চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে বার্সেলোনাকে তোলার পেছনে মূল ভূমিকাটাও তাঁর। লা লিগা জয়ের মাধ্যমে ক্যারিয়ারের ৩৪তম শিরোপা জিতেছেন মেসি, হয়েছেন বার্সেলোনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ট্রফিজয়ী ফুটবলার।

►  ষষ্ঠবারের মতো পিচিচি পুরস্কার বা লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার জিতেছেন মেসি। লিগে ৩৬ গোল করেছেন ৩৪ ম্যাচে। তেলমো জারার সঙ্গে রেকর্ড সর্বোচ্চ ছয়বার পিচিচি জেতার রেকর্ড মেসির।

►  ষষ্ঠবারের মতো ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু জিতেছেন মেসি, লা লিগায় ৩৪ ম্যাচে ৩৬ গোল থেকে ৭২ পয়েন্ট পেয়ে।

►  চ্যাম্পিয়নস লিগে ১০ ম্যাচে ১২ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা, লিভারপুলের বিপক্ষে ফ্রি কিকের গোলটি আসরের সেরা গোল।

►  সর্বোচ্চ গোলের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি, ১৩ অ্যাসিস্টও মেসির।

►  ২০১৯ সালে মেসির ৪৪ ম্যাচে ৪১ গোল, ১৫ অ্যাসিস্ট, তিনটি হ্যাটট্রিক আর সাতবার জোড়া গোল।

►  ফ্রি কিকে ৫০ গোল, বার্সার হয়ে ৬০০ গোল।

►  বার্সার হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ড, লা লিগায় সবচেয়ে বেশি জয়, সবচেয়ে বেশি হ্যাটট্রিক।

►  ৩৪ প্রতিপক্ষের বিপক্ষে গোল। বার্সেলোনার হয়ে ৭০০তম ম্যাচে মাঠে নামার দিনে, উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে ৩৪তম প্রতিপক্ষের বিপক্ষে গোল করেছেন লিওনেল মেসি। ছাড়িয়ে গেছেন রাউল গোনসালেস ও রোনালদোকে। উয়েফার কোনো প্রতিযোগিতায়, এর চেয়ে বেশি প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠানোর কৃতিত্ব আর কারো নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা