kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

হুমায়রার পাঞ্চ

সাফল্যের পেছনের গল্পটাও হৃদয়ছোঁয়া

৪ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সাফল্যের পেছনের গল্পটাও হৃদয়ছোঁয়া

খেলা শেষ করে মারজান আক্তার যখন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছেন তখনো তাঁর নাকের কোনায় রক্ত জমে আছে, কানের কাছটায় কালশিটে। ছেলেবেলায় ব্রুস লি আর জ্যাকি চ্যানের ছবি দেখতে দেখতে মার্শাল আর্টের প্রেমে পড়া এই মেয়ে কাল কারাতেতে হলেন দক্ষিণ এশিয়ার সেরা। কিন্তু রুপালি পর্দার সেই আর্ট আর সত্যিকার লড়াই যে এক নয়, এত দিনে তাঁর জানা হয়ে গেছে খুব ভালোভাবেই, জানেন এই সোনার পদকটির পেছনের গল্প আরো হৃদয়ছোঁয়া। কাল সেই পদক ছুঁয়েই বলছিলেন, ‘রুপালি পর্দায় যা দেখি তা তো শুধু শো। ওখানে ইনজুরি থাকে না, প্র্যাকটিস থাকে না, ঘাম থাকে না, থাকে না দিনের পর দিন শ্রম সাধনা।’

এই কারাতেকা হতে গিয়েই কি কম বাধা পার হতে হয়েছে মারজানকে, ‘অন্য কোনো খেলা হলে কথা ছিল। এই মারামারির খেলা মা-বাবা মেনে নেয় কী করে। আমাদের পরিবারের কেউই খেলাধুলার মধ্যে নেই। আমাকে কী করে তারা সাপোর্ট করে! এই এসএ গেমসের ক্যাম্পে আসার আগেও বাধা পেয়েছি। কিছুতেই তারা আমাকে আসতে দেবে না। অনেক বকুনি খেয়েছি। তাতে আমার আরো জেদ বেড়েছে। জেদ এটাই করেছি যে আমি কিছু একটা করে দেখাব। সেই দিনটাই ছিল আজ। কাল রাতেও বাবার সঙ্গে কথা হয়েছে। বলেছি দেখো, তোমাদের এই লজ্জাটাকেই আমি গর্বে পরিণত করব। আজ সেই স্বপ্নটাই আমার সত্যি হয়েছে। আজ আমার চেয়ে সুখী মানুষ আর কেউ নেই।’

হুমায়রাও তাঁর পৃথিবীতে এখন আনন্দের ভেলায় ভাসছেন। তিনিও কি কম ছাড় দিয়েছেন! এইচএসসি পরীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, এ সময়ই বেজেছে এই দক্ষিণ এশীয় গেমসের ঢোল। জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্তটাই নিতে হয়েছে তখন তাঁকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরীক্ষার প্রস্তুতি নাকি দেশকে সোনা এনে দেওয়ার লড়াইয়ে নামা—হুমায়রা দ্বিতীয়টিই বেছে নিয়েছেন। কাল তাঁর জন্যই যখন জাতীয় পতাকা আবার বিদেশের আকাশে উড়েছে, আর সবাইকে ছাপিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রীড়াযজ্ঞে আবার বেজেছে ‘আমার সোনার বাংলা’ তখন হুমায়রার সিদ্ধান্তকে ভুল বলার লোক আসলে কেউ নেই। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর পরও একটা সময় ভবিষ্যৎ ভাবনাই হয়তো বড় বেশি ভোগাবে তাঁকে। একটা সময় ক্রীড়াবিদরা নিজেদের কোটায় ঢুকতে পারতেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েই ক্রীড়াবিদদের মূল্যায়ন করার সেই প্রথা উঠে গেছে। তা না হোক, ক্রীড়াবিদরা নিজেদের খেলাতেই যে ভবিষ্যৎ গড়বে—সে পরিবেশটাও নেই। কাল সোনা জিতে নীতিনির্ধারকদের কাছে তাই হুমায়রার আবেদন, ‘আমি আমার ভবিষ্যতের কথা না ভেবে দেশের জন্য সময় দিয়েছি। আমার বিশ্বাস দেশ আরো বড় কিছু অর্জনে আমাদের এগিয়ে নেবে। দেশে এখনো আমাদের কারাতের একটি নির্দিষ্ট জায়গা নেই। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে অনুশীলন করি আমরা। নিজেদের একটা কমপ্লেক্স হলে প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট আয়োজন করে আমরা আরো অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারব।’

আল আমিনের কারাতে ক্যারিয়ার শুরু ২০১১-তে। তার আগের বছরই ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় গেমসে কারাতেকাদের একের এক সাফল্যে সবার আলোচনায় ছিলেন তাঁরা। সেই তাঁদের মতো হতে চাওয়ারই লড়াই শুরু এরপর আল আমিনের। দক্ষিণ এশীয় গেমসে নামার অপেক্ষা ফুরাতে তাঁকে অবশ্য অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ আটটি বছর। গতবার গুয়াহাটিতে কারাতে তো ছিল না। এবার সেই অপেক্ষা ফুরাতে আল আমিন প্রথম সুযোগে সোনা জয়ের স্বপ্নটাও পূরণ করে নিয়েছেন। আগের দিন সতীর্থদের হতাশা উল্টো উদ্দীপ্ত আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করেছিল তাঁকে। রাতের বেলা অনুশীলনের সূচি না থাকলেও ঠাণ্ডার মধ্যে একা একাই নাকি অনুশীলন করেছেন অনেক্ষণ। কাল সেই পরিশ্রমের প্রতিদান পেয়ে আল আমিনের মুখে উছলে ওঠা উচ্ছ্বাস, ‘এই দক্ষিণ এশীয় গেমসের সোনার স্বপ্নেই এত দিন নিজেকে একটু একটু করে তৈরি করেছি। বিদেশের মাটিতে দেশের পতাকা সবার ওপরে উঠানোর যে সুখ, তার তুলনা নেই। গতকাল আমরা পারিনি। তায়কোয়ান্দোতে সোনা জেতা নিয়ে সবার উচ্ছ্বাস আমাকেও ছুঁয়ে গেছে। তাই আজ সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা, আমাকে হতাশ হতে হয়নি।’ মারজান বলছিলেন, ‘আল আমিন ভাইয়ার সাফল্য আমাদেরও আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল।’ আল আমিন প্রেরণা নিয়েছিলেন দিপু চাকমার কাছ থেকে। এই গেমসে প্রত্যেক খেলোয়াড়ই ত্যাগ, সাধনা, পরিশ্রমে এভাবে এক সুতোয় বাঁধা। তাঁদের প্রতিটি সাফল্যের পেছনের গল্পটাও এমন হৃদয়ছোঁয়া।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা