kalerkantho

শনিবার । ০৭ ডিসেম্বর ২০১৯। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৯ রবিউস সানি ১৪৪১     

পরিতৃপ্তির সঙ্গে মিশে আছে আক্ষেপও

সবুজ ব্লেজার, নকশা করা টাই আর কালো প্যান্ট; অভিষেক টেস্টের দলে থাকা সদস্যদের গায়ে ২০ বছর পর এই ছিল সাদা জার্সির বদলে। কিন্তু উত্তেজনার খই ফুটেছে সেই প্রথম দিনের মতোই! চোটের কারণে খেলোয়াড়ি জীবনটা সংক্ষিপ্ত হয়ে যায় অভিষেক টেস্টে খেলা পেসার বিকাশ রঞ্জন দাসের, পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে মাহমুদুল হাসান নামেই যাঁর পরিচিতি। ইস্টার্ন ব্যাংকের সাত মসজিদ রোড শাখায় কর্মরত হাসানের জীবনটা করপোরেট একঘেয়েমিতেই বন্দি। কলকাতার তাজ বেঙ্গলে পরশু রাতে ১৯ বছর পর প্রাণখুলে হেসেছেন আর আড্ডা দিয়েছেন, ‘আমার ক্ষেত্রে বলা যায়, ১৯ বছর পর আবার সবাইকে একসঙ্গে পেলাম, এ রকম আড্ডা দিলাম।’

২৩ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পরিতৃপ্তির সঙ্গে মিশে আছে আক্ষেপও

কলকাতা থেকে প্রতিনিধি : স্টার স্পোর্টসের বাংলা ধারাভাষ্য কক্ষের সামনে দাঁড়িয়ে হাবিবুল বাশার স্মৃতিচারণ করছিলেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের। গণমাধ্যমে তাঁকে দলে নেওয়ার চাপ তৈরি না হলে হয়তো অভিষেক টেস্টে খেলাই হতো না এই ব্যাটসম্যানের। প্রেসবক্সের সিঁড়ির গোড়ায় মাহমুদুল হাসান (বিকাশ রঞ্জন দাস) পেয়ে গেলেন পরিচিত একজনকে। খালেদ মাসুদকে ঘিরে রেখেছেন জনাকয়েক ভারতীয় সাংবাদিক। সৌরভ গাঙ্গুলির আমন্ত্রণে কলকাতায় এসেছেন বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টের ১৪ সদস্য। ভারত ও বাংলাদেশের প্রথম দিন-রাতের টেস্ট দেখার আমন্ত্রণে কলকাতায় আসার অভিজ্ঞতাটা তাঁদের ফিরিয়ে নিয়েছিল সেই খেলোয়াড়ি জীবনে! একই রকম পোশাক, সময়মতো বাসে উঠার তাড়া, সবাই মিলে এক হোটেলে থেকে আড্ডার পর আড্ডা। শুধু কিটব্যাগে ব্যাট, প্যাড, গ্লাভসগুলো নেই।

সবুজ ব্লেজার, নকশা করা টাই আর কালো প্যান্ট; অভিষেক টেস্টের দলে থাকা সদস্যদের গায়ে ২০ বছর পর এই ছিল সাদা জার্সির বদলে। কিন্তু উত্তেজনার খই ফুটেছে সেই প্রথম দিনের মতোই! চোটের কারণে খেলোয়াড়ি জীবনটা সংক্ষিপ্ত হয়ে যায় অভিষেক টেস্টে খেলা পেসার বিকাশ রঞ্জন দাসের, পরবর্তী সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে মাহমুদুল হাসান নামেই যাঁর পরিচিতি। ইস্টার্ন ব্যাংকের সাত মসজিদ রোড শাখায় কর্মরত হাসানের জীবনটা করপোরেট একঘেয়েমিতেই বন্দি। কলকাতার তাজ বেঙ্গলে পরশু রাতে ১৯ বছর পর প্রাণখুলে হেসেছেন আর আড্ডা দিয়েছেন, ‘আমার ক্ষেত্রে বলা যায়, ১৯ বছর পর আবার সবাইকে একসঙ্গে পেলাম, এ রকম আড্ডা দিলাম।’ খালেদ মাসুদ বলছিলেন অভিষেক টেস্টে শচীন টেন্ডুলকারকে ‘স্লেজিং’ করার গল্প, “তখন টিভিতে একটি রঙের কম্পানির বিজ্ঞাপন দিত, যেখানে বলত ‘ক্যায়া সুনীল বাবু’। টেন্ডুলকার ব্যাট করতে এলেই আমি পেছন থেকে ওই সুর নকল করে কথাটা বলতাম। প্রথম প্রথম সে আমার কথার কোনো জবাবই দিত না। এরপর সেও মজা পেয়ে আমাকেও সুনীল বাবু বলত।” কাল ইডেনে খালেদ মাসুদ ও টেন্ডুলকার, দুজনেই ছিলেন আমন্ত্রিত। দেখা-সাক্ষাতে নিশ্চয়ই উঠে এসেছে পুরনো সেই  গল্পও। শুধু টেন্ডুলকারই নন, মাসুদ জানালেন ভারতীয় সাবেক ক্রিকেটার, যাঁরা এখন বিসিসিআইতে আছেন বা যাঁরা ধারাভাষ্য দিতে এসেছেন, এ রকম অনেকের সঙ্গেই চায়ের কাপ হাতে আড্ডা জমিয়ে দেখেছেন বাংলাদেশের হতশ্রী ব্যাটিং।

নির্বাচক বাশার খেলা ছেড়েও ক্রিকেটের সঙ্গেই আছেন। তাই দলের সঙ্গে ভ্রমণের বাড়তি কোনো রোমাঞ্চ নেই। তবে অভিষেক টেস্টের প্রসঙ্গ উঠলেই গণমাধ্যমের প্রতি তাঁর কৃতজ্ঞতাটা ফুটে ওঠে, ‘আসলে ওই সময় গণমাধ্যমে চাপটা তৈরি না হলে আমার হয়তো খেলাই হতো না। আমার ওপর দুটি চাপ ছিল। অভিষেক টেস্টে খেলা এবং রান করা। ওই দিন আমি নিজে নিজেকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, সেটাতে জয়ী হতে পেরেছি। ৫০টি টেস্ট ম্যাচ খেললাম, সেটা ওই প্রথম টেস্টের আত্মবিশ্বাসে ভর করেই। নিজের ওপর বিশ্বাস ছিল, টেস্ট ম্যাচে ব্যাটিংটা ভালোভাবেই পারব।’

অভিষেক টেস্টের দলে থাকা যাঁরা এসেছেন কলকাতায়, সবাই খুব উচ্চকণ্ঠ সৌরভ গাঙ্গুলির প্রশংসায়। মাসুদই বলছিলেন, “এই যে আয়োজন, আমাদের ডেকে আনা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো, গোলাপি বলে টেস্ট আয়োজন; সব কিছু খুব সৃষ্টিশীল মানসিকতার প্রকাশ বলে মনে হয়েছে। অন্য বোর্ডও এই ব্যাপারে ভেবে দেখতে পারে। সাধারণ একটা টেস্ট আয়োজন না করে এই যে দুই দেশের সম্মিলন, সাবেক ক্রিকেটারদের ডেকে আনার যে অভিনবত্ব, সব মিলিয়ে অসাধারণ।”

খেলার প্রথম বিরতির সময় হাসান, মাসুদদের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছে তখন বাংলাদেশের ৬০ রানে ৬ উইকেট নেই। হাসানই আফসোস করছিলেন, টেস্ট খেলার ২০ বছর পরও সামর্থ্যের এই দশা দেখে, যেখানে অভিষেক টেস্টেই বাংলাদেশ করেছিল ৪০০ রান। মাসুদ তো বলেই দিলেন, ‘সেবার দুই দলই কিন্তু প্রথম ইনিংসে ৪০০ রান করেছিল। দ্বিতীয় ইনিংসে আমরা ৯১ রানে অল আউট হয়ে যাই। ওরকম ব্যাটিংধস হয়েছিল অভিজ্ঞতার অভাবেই, তা না হলে কিন্তু ম্যাচটি আমরা ড্র করতেই পারতাম।’ সেখানে ২০ বছর পর, টেস্ট খেলার কমবেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন আত্মসমর্পণ তো তাঁদের ব্যথিত করবেই।

প্রাপ্তি, আক্ষেপের সঙ্গে আছে খানিকটা অপূর্ণতাও। আসেননি অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী আমিনুল ইসলাম। বাংলাদেশের অভিষেক টেস্টে শতরান করার এই কীর্তিমানের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডপ্রবাসী সাবেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান আল শাহরিয়ার। হাবিবুল জানালেন, তাঁদের সঙ্গে দেশে থাকার সময় যোগাযোগ হলেও এখানে এসে ব্যস্ত সূচির চাপে আর হয়ে ওঠেনি।

প্রায় দুই দশক পর, অভিষেক টেস্টের বেশির ভাগ ক্রিকেটার এক হয়ে ফিরে গিয়েছিলেন সোনালি সেই দিনে। তাঁদের রাতভর স্মৃতিচারণ আর আড্ডার পর মাঠে এসে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের ধ্বংসস্তূপ দেখে অনেকের মনেই আক্ষেপ, এমন দিন দেখার জন্যই কি আমরা ২০ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিলাম?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা