kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

ভবিষ্যতের রং তাহলে গোলাপি!

২২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ভবিষ্যতের রং তাহলে গোলাপি!

ঢাকার বাজারে পেঁয়াজ আর লবণ নিয়ে যতটা কাড়াকাড়ি, সীমান্তের এপারে গঙ্গাপারের কলকাতায় ঠিক ততটাই চাহিদা ইডেন টেস্টের ক্রিকেট নিয়ে। এমন নয় যে ইন্দোরে আত্মসমপর্ণ করা মমিনুল হকের দলের হয়ে ব্রায়ান লারা ও শচীন টেন্ডুলকার অবসর ভেঙে খেলতে নেমেছেন! সেই ইমরুল-সাদমানরাই তো খেলবেন। তাহলেও কেন এই উত্তুঙ্গ চাহিদা? উত্তর একটাই, গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট। সবাই ইতিহাসের সাক্ষী হতে চায়, ফেসবুকের টাইমলাইনে রেখে দিতে চায় হ্যাশট্যাগ পিংক; টেস্ট ক্রিকেটের সমঝদারদের সংখ্যা এখানে সামান্যই।

টেস্ট ম্যাচের প্রথম তিন দিনের কোনো টিকিট নেই, এ রকম ঘটনা স্মৃতির অতলে ডুব দিয়েও মনে করতে পারলেন না কলকাতার ক্রিকেট সাংবাদিকরা। ইডেনে, ১৯৯৯ সালে এশিয়ান টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের প্রথম ম্যাচ; শোয়েব আখতার, ওয়াসিম আকরামরা বল করবেন শচীন টেন্ডুলকার, আজহারউদ্দিন, সৌরভ গাঙ্গুলিদের। সেই ম্যাচেরও টিকিট পাওয়া গেছে। ইডেনেই অস্ট্রেলিয়ার জয়রথ থামিয়ে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের রূপকথা লিখেছেন ভি ভি এস লক্ষ্মণ ও রাহুল দ্রাবিড়। সেই ম্যাচেও গ্যালারি ভরেনি। একটি ম্যাচ নিয়ে এমন উত্তেজনার কথা মনে করতে পারলেন মারাঠি ক্রিকেট সাংবাদিক সুরন্দর লেলে। দীর্ঘদিন ধরে ক্রিকেট সাংবাদিকতা করে মাথার চুল পাকিয়ে ফেলেছেন, টেন্ডুলকারের ১০০টি শতরানের ভেতর ৮৫টি মাঠে বসে দেখেছেন। তিনিই মনে করতে পারলেন এমন একটি টেস্ট ম্যাচের কথা, যে ম্যাচের টিকিট হয়ে উঠেছিল সোনার হরিণ, ‘সেবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ এসেছিল ভারতে। টেন্ডুলকারের বিদায়ি সিরিজের আগের সফরটা। মুম্বাইতে ওয়াংখেড়েতে খেলা হচ্ছে। তখন ওর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টেস্ট-ওয়ানডে মিলিয়ে ৯৯টি শতরান হয়ে গেছে, এ রকম অবস্থায় টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে শচীন ৮০ বা তার কাছাকাছি রানে অপরাজিত (আসলে ৬৭)। তাই চতুর্থ দিনের খেলার টিকিট নিয়ে এ রকম কাড়াকাড়ি। সবাই ইতিহাসের সাক্ষী হতে চাইছিল, কেউ বাদ পড়তে চাইছিল না ঘরের মাঠে শচীনকে শততম শতরানের মাইলফলকে পৌঁছাতে দেখতে। কিন্তু দুঃখের বিষয় সেবার সে সেটা করতে পারেনি, কাছাকাছি গিয়ে আউট হয়ে যায় (৯৪ রানে)।

বাংলাদেশের সঙ্গে সিরিজের ঠিক আগে আগে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট সিরিজের তৃতীয় টেস্ট বিরাট কোহলির দল খেলেছে রাঁচিতে। প্রথম দুটি ম্যাচ জিতে সিরিজ পকেটে পুরেছেন কোহলি, দক্ষিণ আফ্রিকাও একদম প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারছে না; এমন অবস্থায় ‘ডেড রাবার’ ম্যাচে দর্শক মাঠে না আসাটাই স্বাভাবিক। তাও টেস্ট ম্যাচ দেখতে, দিনেরবেলায়। ফাঁকা গ্যালারি দেখে ম্যাচের পর বেশ কড়া কথাই বলেছিলেন কোহলি। জানিয়েছিলেন, ‘আমি জানি যে রাজ্য অ্যাসোসিয়েশন, আবর্তন পদ্ধতিতে সবাইকে ম্যাচ আয়োজনের সুযোগ দেওয়া সবই নিয়মের মধ্যে। তবে আমার কথাটা হচ্ছে টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ানডে সব জায়গায় হতে পারে, কিন্তু টেস্টের জন্য পাঁচটি ভেন্যু নির্ধারিত করে দেওয়া হোক। শেষ কথা।’ সৌরভ গাঙ্গুলিও বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর বলেছেন, টেস্ট ক্রিকেটকে পুনর্জীবন দেওয়ার কথা, ‘চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে মানুষকে মাঠে আনা। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘোষণা করা হোক, পরদিনই মাঠ ভরে যাবে। ভারতীয় ক্রিকেটের সেরারা ফাঁকা গ্যালারির সামনে ব্যাটিং করবে, এটা আসলে মেনে নেওয়া যায় না।’ বোর্ড প্রেসিডেন্ট এবং অধিনায়ক, দুজনের ভাবনার রেখাটা অভিন্ন; তাঁরা টেস্ট ক্রিকেটেও দেখতে চাইছেন ভরা গ্যালারি। তাইতো গাঙ্গুলি বিসিসিআই প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসার পর দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে আয়োজন করে ফেললেন গোলাপি বলের টেস্টের। রাজি হয়ে গেলেন বিরাট কোহলিও, অথচ এর আগে অস্ট্রেলিয়া তাদের দেশে তিন টেস্টের সিরিজের একটি ম্যাচ গোলাপি বলে আয়োজন করতে চেয়েছিল, তখন না খেলার পক্ষে বিরাট কাল এসব যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন, ‘আমরা অবশ্যই গোলাপি বলে খেলতে চাই, তবে সেটা কখনোই কোনো বড় সিরিজের আগে হঠাৎ করে সূচিতে দেখতে চাই না। যেখানে আমরা গোলাপি বলে কখনো অনুশীলন করিনি, প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলিনি। আমরা আগে নিজেদের মাঠে গোলাপি বলে খেলতে কেমন লাগে সেটা পরখ করে দেখতে চেয়েছিলাম।’ তবে বাস্তবতাটা খুব একটা বদলায়নি, অস্ট্রেলিয়া সফরের পর থেকে গোলাপি বলে ডজনখানেক প্রথম শ্রেণির ম্যাচও খেলা হয়নি ভারতীয় ক্রিকেটারদের। আসল ব্যাপারটা হচ্ছে চমক, সেই সঙ্গে বাণিজ্য। সৌরভ গাঙ্গুলি বিসিসিআই প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাঁর শহরে এটাই প্রথম টেস্ট। সেখানে যদি গ্যালারি খাঁ খাঁ করত, তাহলে ‘মহারাজ’ নিজেই হয়তো বিব্রত হতেন!

এখন পর্যন্ত গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট খেলা হয়েছে ১১টি। সবচেয়ে বেশি, গোলাপি বলে পাঁচটি টেস্ট খেলেছে অস্ট্রেলিয়া। জিতেছে সবকটিতেই। তিনটি করে ম্যাচ হয়েছে অ্যাডিলেডে, দুটি ব্রিসবেনে। দিন-রাতের টেস্ট বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মকালীন সূচির অংশই হয়ে গিয়েছে। ইংল্যান্ডে এজবাস্টনে হয়েছে দিন-রাতের টেস্ট, অ্যাশেজেও খেলা হয়েছে। বলা যায়, ‘তিন মোড়ল’-এর দুজনই খেলা শুরু করে দিয়েছে গোলাপি বলে। বাণিজ্যিক শক্তি ভারত এত দিন বাইরে থাকলেও আজ থেকে ঢুকে যাচ্ছে গোলাপি পর্বে। যার ফলে আগামীতে আরো বেশি বেশি দেখা যেতে পারে দিন-রাতের গোলাপি বলের টেস্ট ম্যাচ।

টেস্ট ম্যাচের ভবিষ্যত কি তাহলে গোলাপি? এমন প্রশ্নে কোহলি অবশ্য প্রাচীনপন্থী, ‘আমার মনে হয় না গোলাপি বলই টেস্ট ক্রিকেটের একমাত্র সংস্করণ হয়ে উঠা উচিত। এমনটা হলে সকালের সেশনের রোমাঞ্চ আর স্নায়ুর চাপই তো হারিয়ে যাবে। শুধু মনোরঞ্জনের জন্য টেস্ট ক্রিকেট আয়োজন করা ঠিক হবে না। তিন-চার দিনের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, লোকের উত্তেজনা বাড়ছে এটা যেমন ঠিক; তেমনি আমাদের পদ্ধতিটাও ঠিক করতে হবে। আমাদের একটা টেস্ট ক্যালেন্ডার তৈরি করতে হবে।’ মমিনুল হক অবশ্য মাঠে দর্শক বেশি দেখতেই আগ্রহী, ‘আমার কাছে সব সময় মাঠে দর্শক থাকলে ভালো লাগে। দর্শক মাঠে থাকলে খেলতে বেশি মজা লাগে।’

চটজলদিই যে গোলাপি বিপ্লব পুরো ক্রিকেট দুনিয়াটাকে কবজা করে নেবে, এমনটা নয়। তবে ভারতও গোলাপি বলের জগতে ঢুকে পড়ায় চৌহদ্দিটা বেড়ে যাবে অনেকখানি। এরপর পৃষ্ঠপোষক, সম্প্রচার সংস্থা মিলে হয়তো আরো বেশি বেশি দিন-রাতের ম্যাচের চাপ বাড়াবে। কারণ প্রাইম টাইমে ক্রিকেট মানেই যে লক্ষ্মীর আগমন!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা