kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

কালের কণ্ঠ সেরা টেস্ট একাদশ

হাবিবুল থাকবেন অধিনায়ক হিসেবেও

২১ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



হাবিবুল থাকবেন অধিনায়ক হিসেবেও

গত ১০ নভেম্বর টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের দুই দশকে পা রাখা উপলক্ষে আমরা খুঁজে নিতে চেষ্টা করেছিলাম ইতিহাসের সেরা একাদশ। নিজেদের দেখা থেকে কালের কণ্ঠ’র অনুরোধে সাড়া দিয়ে সেরা একাদশ গড়েও দিয়েছেন ১০ জন সাবেক ক্রিকেটার। এঁদের মধ্যে ৯ জনই আবার ছিলেন অধিনায়ক। সবার একাদশ ছাপা হওয়ার পর এবার নির্বাচকের ভূমিকায় কালের কণ্ঠ’র ক্রীড়া বিভাগও। আমাদের বিবেচনায় বাংলাদেশের সেরা টেস্ট একাদশ ছাপা হলো আজ। মাসুদ পারভেজের করা ১২ পর্বের ধারাবাহিকের শেষ দিনে আগামীকাল থাকছে ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটারদের নিয়ে বিশেষ এক আয়োজনও

ওয়ান ডাউনে কে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কালের কণ্ঠ’র অনুরোধে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা টেস্ট একাদশ গড়তে বসা ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারের প্রত্যেকেই গলদঘর্ম হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। এঁদের মধ্যে গাজী আশরাফ হোসেনের একাদশে হাবিবুল বাশার ও মমিনুল হকের কেউই জায়গা পাননি। আবার মিনহাজুল আবেদীন, ফারুক আহমেদ ও আকরাম খানরা নিজ নিজ একাদশে রেখেছেন দুজনকেই। হাবিবুল আবার নিজেকে বাদ দিয়ে একাদশ গড়ায় তাঁর জায়গা হয়েছে মাত্র চারজনের দলে। ওদিকে মমিনুল আছেন তাঁর টেস্ট সেঞ্চুরির সমানুপাতিক আটজনের একাদশেই।

দুজন দুই সময়ের সেরা ব্যাটসম্যান হলেও বেশির ভাগই সেঞ্চুরি সংখ্যায় এগিয়ে রেখেছেন মমিনুলকে। তাতে হাবিবুল বাদ পড়ায় সমালোচনাও হয়েছে। সমালোচনার ঝড় বয়ে গেছে টেকনিকের খুঁত ধরে এই সাবেক অধিনায়ককে কেউ বাদ দেওয়াতেও। ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারের পর নিজেদের সেরা একাদশ গড়তে বসে কালের কণ্ঠ’র ক্রীড়া বিভাগও এই দুই নামে আটকে থেকেছে অনেকক্ষণ। তবে নানা যুক্তি-তর্ক এবং বিবেচনার শেষে এসে এঁদের মধ্য থেকে বেছে নেওয়া নামটি হাবিবুলেরই।

ব্যাখ্যার শুরু টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থেকেই। দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করে ইতিহাসে অমরত্ব পেয়ে যাওয়া আমিনুল ইসলামও নানা সময়ে তাঁর ওরকম কীর্তির পেছনে হাবিবুলের অবদানের কথা স্বীকার করেছেন। এর আগে ব্যাট হাতে বাজে সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে থাকা এই সাবেক অধিনায়ক যে উইকেটে গিয়েই অন্য প্রান্তে হাবিবুলের সাবলীল ব্যাটিংয়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর ভারতের বিপক্ষে ১১২ বলে ১০ বাউন্ডারিতে ৭১ রানের ইনিংসে সবাইকে টেস্ট ব্যাটিংয়ের সুরই যেন ধরিয়ে দিয়েছিলেন দুঃসময়েও বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেরা পারফরমার।

অন্যরা পরে সেই সুরে তেমন থাকতে না পারলেও হাবিবুল ঠিকই সুললিত ছিলেন। টেস্টে তিন হাজার রান করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরি করেছেন দেশে এবং দেশের বাইরেও। ২৪টি ফিফটিও করেছেন পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র। অন্যদিকে দেশের মাটিতে মমিনুলের রেকর্ড ঈর্ষণীয় হলেও বাইরে খুবই বিবর্ণ। তা ছাড়া এই তরুণ বাঁহাতি ব্যাটসম্যান আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখতে রাখতে বাংলাদেশ দলও আরো কয়েকজন পারফরমার পেয়ে গিয়েছিল। নিজের সময়ে দলের ধারাবাহিক বাজে পারফরম্যান্সের মধ্যেও ব্যাট হাতে উজ্জ্বল ব্যতিক্রম হয়ে থাকা হাবিবুল খেলেছেনও ইতিহাসের অন্যতম সেরা সব বোলারদের।

অন্তত পাঁচজন ক্রিকেটার আছেন, একাদশে যাঁদের অন্তর্ভুক্তি বাড়তি কোনো ব্যাখ্যার দাবি রাখে না। ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারের প্রত্যেকেই রেখেছেন এই পাঁচজনকে—তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং মোহাম্মদ রফিককে। পারফরম্যান্স বিবেচনায় এঁদের বাইরে রেখে সব সময়ের সেরা একাদশ গড়ার উপায় ছিল না কালের কণ্ঠ’র ক্রীড়া বিভাগেরও।

ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, গ্লেন ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন, মুত্তিয়া মুরালিধরন থেকে শুরু করে সেই সময়ের সেরা বোলারদের নিয়ে গড়া কোন দলের বিপক্ষে ফিফটি নেই হাবিবুলের? তাই তিন নম্বরে দুজনের মধ্যে একজনকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন এলে তিনিই অবধারিতভাবে এসে যান। ‘মিস্টার ফিফটি’ নাম পেয়ে যাওয়া এই ব্যাটসম্যান ছাড়াও অন্তত পাঁচজন ক্রিকেটার আছেন, একাদশে যাঁদের অন্তর্ভুক্তি বাড়তি কোনো ব্যাখ্যার দাবি রাখে না। ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারের প্রত্যেকেই রেখেছেন এই পাঁচজনকে—তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, মুশফিকুর রহিম, মাশরাফি বিন মর্তুজা এবং মোহাম্মদ রফিককে। পারফরম্যান্স বিবেচনায় এঁদের বাইরে রেখে সব সময়ের সেরা একাদশ গড়ার উপায় ছিল না কালের কণ্ঠ’র ক্রীড়া বিভাগেরও।

অবশ্য একাধিক নাম থেকে খুঁজতে হয়েছে ওপেনিংয়ে তামিম ইকবালের যোগ্য সঙ্গী। ২০০৬ সালে ফতুল্লায় অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৩৮ রানের অবিশ্বাস্য ইনিংসে বিবেচনায় ছিলেন শাহরিয়ার নাফীস। নানা সময়ে পারফরম করা ইমরুল কায়েসও লড়াইয়ে ছিলেন। তবে এই দুজনের কেউই সেভাবে এই ফরম্যাটে থিতু হতে পারেননি। তবে নিজের টেস্ট অভিষেকেই আদ্যন্ত ব্যাটিংয়ের রেকর্ড গড়া জাভেদ ওমর দীর্ঘ ৪০ টেস্টের অভিজ্ঞতা, উইকেটে টিকে থাকার মানসিকতায় ওপেনার হিসেবে জায়গা করে নিয়েছেন আমাদের একাদশে।

আমাদের বিবেচনায় ব্যাটিংয়ের চার নম্বর জায়গাটি প্রাপ্য টেস্ট ক্রিকেটের সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান মোহাম্মদ আশরাফুলের। ১৭ বছর বয়সে মুত্তিয়া মুরালিধরন ও চামিন্দা ভাসের মতো বোলারদের ঠেঙিয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন অভিষেকেই। হাবিবুলের মতোই ইতিহাসের সেরা বোলারদের খেলা এই ব্যাটসম্যান অনৈতিক কাণ্ডে জড়িয়ে না পড়লে তাঁর ক্যারিয়ার আরো ডানা মেলত কি না, সেটি তর্কসাপেক্ষ। তবে ৬ সেঞ্চুরি ও ৮ ফিফটিতে ২,৭৩৭ রান করা বাংলাদেশ ক্রিকেটের প্রথম মহাতারকার জায়গা সেরা একাদশে নিশ্চিত বলেই মনে করি আমরা।

টেস্ট ক্রিকেটে বিশেষজ্ঞতার ব্যাপারটিকেই প্রাধান্য দিয়েছি আমরা। তাই মুশফিকুর রহিম শুধুই ব্যাটসম্যান, খেলবেন পাঁচ নম্বরে। আর সাকিব আল হাসানের পর সাতে নামবেন দেশের ইতিহাসের সেরা উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ। যাঁর ব্যাটিংও ফেলে দেওয়ার মতো নয়। একটি টেস্ট সেঞ্চুরিও তো আছে তাঁর কিন্তু সেসব নয়, আমাদের বিবেচনায় টেস্টের উইকেটরক্ষককে আগে হতে হবে সেরা উইকেটকিপার। তাই খালেদ মাসুদ। দেশের মাটিতে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট সাফল্যের অন্যতম রূপকার অফ স্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজকেও একাদশে না রেখে উপায় নেই।

সেটি নানা বিবেচনায়ই। সাকিব ও রফিকের মতো বাঁহাতি স্পিনারের সঙ্গে তাঁর বোলিং স্পিন আক্রমণে বৈচিত্র্যও বাড়াবে। আবার এখনকার বেশির ভাগ প্রতিপক্ষেই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ছড়াছড়ি। মিরাজের বোলিং একই সঙ্গে তাঁদের মধ্যে ছড়াবে অস্বস্তিও। নতুন বলে মাশরাফির সঙ্গী হিসেবে শাহাদাত হোসেনকে বেছে নেওয়াতেও আশ্চর্যের কিছু নেই। মাঠের বাইরে নানা ঘটনায় বিতর্কিত হলেও এই ফাস্ট বোলার পারফরম করেছেন দেশে এবং দেশের বাইরে। আগ্রাসী মনোভাব ও আক্রমণাত্মক বোলিংয়ে তিনি এখনো মাশরাফির পর টেস্টে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি পেসার।

সব শেষে এই দলটির অধিনায়ক বেছে নেওয়ার পালা। ১০ সাবেক ক্রিকেটারের ৯ জনই মাশরাফিকে অধিনায়ক করলেও আমাদের বিবেচনায় টেস্ট নেতৃত্বে তিনি পরীক্ষিত নন। অধিনায়ক হিসেবে প্রথম টেস্টেই চোটে ছিটকে পড়ার পর আর টেস্টই খেলেননি। তবে যাঁর অধিনায়কত্বে বাংলাদেশ টেস্টে প্রথম লড়াই করতে শুরু করেছিল, সেই খালেদ মাহমুদের দলে জায়গা হয় না বলে বিবেচনায় ঢুকতেই পারেননি। ১০ জন সাবেক ক্রিকেটারের মধ্যে একজনেরই অধিনায়ক সাকিবের নেতৃত্ব গিয়েছিল ২০১১ সালে জিম্বাবুয়ে সফরের টেস্ট ব্যর্থতায়। কাজেই তিনি হিসাবে না এলেও এসেছিলেন মুশফিকুর রহিম। যাঁর নেতৃত্বেই দেশে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ঐতিহাসিক টেস্ট জয়। কিন্তু অতি রক্ষণাত্মক মানসিকতার জন্য অধিনায়ক হিসেবে তাঁর সুনামও তেমন শোনা যায় না। আর তাই দুঃসময়েও দারুণ পারফরম করে দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া হাবিবুলকে আমরা এই দলের অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিয়েছি। কাছ থেকে সবাইকে দেখার অভিজ্ঞতায় এটাও মনে হয়েছে টেস্টবোধ এবং টেস্ট ম্যাচের চরিত্রকে ধারণ করার ক্ষেত্রেও তিনি সবার চেয়ে এগিয়ে। আর তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পেয়েছিল নিজেদের ইতিহাসের প্রথম টেস্ট জয়ও।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা