kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

কলকাতার পথে

গোলাপি বলের গোলকধাঁধা

২০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গোলাপি বলের গোলকধাঁধা

ক্রীড়া প্রতিবেদক : তিন রকমের ফরম্যাট দেখা হয়ে গেছে ক্রিকেট দর্শকদের। টেস্ট, ওয়ানডের পর ক্রিকেটের ভবিষ্যৎই মনে হচ্ছে টি-টোয়েন্টি। সেই ধারাবাহিকতায় কি লাল, সাদার পর গোলাপি বলই টানবে ভবিষ্যতের দর্শককে? অনিশ্চয়তার খেলা ক্রিকেটে শেষ কথা বলে কিছু নেই। টেস্টের নাভিশ্বাস যখন তুলে দিতে পেরেছে টি-টোয়েন্টি, তবে গোলাপি বলের ‘আগ্রাসন’ও অস্বাভাবিক নয়। তা প্রারম্ভিককালে বলটার ‘আচরণ’ নিয়ে যতই ধোঁয়াশা থাকুক না খেলোয়াড়দের মনে।

২২ নভেম্বর শুরু হতে যাওয়া ইডেন টেস্টের মূল আকর্ষণ কিন্তু গোলাপি বল। ভারতের মাটিতে এই প্রথম দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে। কাকতালীয়ভাবে ভারতের গোলাপি বলে টেস্ট অভিষেকে একই সুতোয় গাঁথা পড়ছে বাংলাদেশও। ইতিহাস গড়া ম্যাচে দুই দলের কারোরই নতুন রঙের এ বলে অভ্যস্ততা নেই। অবশ্য দুই দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটের কিছু ম্যাচ পরীক্ষামূলকভাবে গোলাপি বলে হয়েছে। কিন্তু নিয়মিত নয়। আবার সেসব ম্যাচে নতুন এ বলের ‘রিভিউ’ও খুব আশাপ্রদ নয়।

এদিকে ইডেন টেস্টে যে গোলাপি বলে টেস্ট অনুষ্ঠিত হবে, সেটিতে অভ্যস্ত নন ম্যাচের ২২ ক্রিকেটারের কেউই। বাংলাদেশ কিংবা ভারতের ঘরোয়া ক্রিকেটে যে কয়েকটা দিবা-রাত্রির প্রথম শ্রেণির ম্যাচ হয়েছে, সেগুলো খেলা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ার কুকাবুরা কম্পানির তৈরি গোলাপি বলে। আর ইডেনে খেলা হবে ভারতে তৈরি এসজি বলে। দুটির প্রস্তুতি পদ্ধতির ভিন্নতার কারণে বলের আচরণেও ভিন্নতা রয়েছে। কুকাবুরা বলের সিম নিচু, যা অপেক্ষাকৃত বেশি সময় পেসারদের সুবিধা দেয়। কিন্তু ৪০-৫০ ওভার পর সিম হারিয়ে যাওয়ায় স্পিনারদের জন্য বল গ্রিপ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে এসজি বলে অপেক্ষাকৃত কম সময় সুইং করে। আর উঁচু সিম টিকে থাকায় শেষ পর্যন্ত স্পিনাররা গ্রিপ করতে পারেন এবং বলটা ঠিকঠাক ঘষামাজা করতে পারলে রিভার্স সুইং মেলে ৪০ ওভারের পর থেকেই। উপমহাদেশীয় কন্ডিশনের সঙ্গে শতভাগ মানানসই বল আর কি!

তাহলে ইডেনে কেন কুকাবুরায় খেলা হচ্ছে না? উত্তরটা প্রথম দিনই দিয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি, ‘এক সিরিজে ভিন্ন বল ব্যবহারে অনুমতি নেই। তাই এসজিতেই খেলা হবে।’ এটা নিশ্চিত হওয়ার পর ঝটিতি ছয় ডজন করে বল দুটি দলকে সরবরাহ করেছে ভারতের মিরাটে অবস্থিত সান্সপারিল গ্রিনল্যান্ডস (এসজি)। ইন্দোর টেস্টের আগে এই গোলাপি বল দিয়ে অনুশীলনও করেছেন বিরাট কোহলিরা।

কুকাবুরা বলের সিম নিচু, যা অপেক্ষাকৃত বেশি সময় পেসারদের সুবিধা দেয়। কিন্তু ৪০-৫০ ওভার পর সিম হারিয়ে যাওয়ায় স্পিনারদের জন্য বল গ্রিপ করাই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। সেখানে এসজি বলে অপেক্ষাকৃত কম সময় সুইং করে। আর উঁচু সিম টিকে থাকায় শেষ পর্যন্ত স্পিনাররা গ্রিপ করতে পারেন এবং বলটা ঠিকঠাক ঘষামাজা করতে পারলে রিভার্স সুইং মেলে ৪০ ওভারের পর থেকেই।

অনুশীলনের ‘রিভিউ’র ওপর খুব বেশি আস্থা রাখার কারণ নেই। ম্যাচ পরিস্থিতি ভিন্ন। এসজির সঙ্গে জীবনের ৪৫টি বছর কাটিয়ে দেওয়া ৭৩ বছর বয়সী ওয়াসিউল্লাহ খান যেমন বলছেন, ‘এসজি গোলাপি বল বোলারদের বাড়তি ১০-১৫ ভাগ বেশি সুবিধা দেবে।’ তিনটি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলা মধ্য প্রদেশের এই ভদ্রলোক এসজির প্রডাকশন ডিরেক্টর, ব্যাট ও বল তৈরি নিয়েই কাজ করেন। ইডেনে ব্যবহৃত গোলাপি বল প্রস্তুতের সর্বসময় ক্ষমতা ওয়াসিউল্লাহর। তাতে তাঁর পূর্বাভাসে আস্থা রাখা যায়।

কিন্তু বোলারদের বাড়তি সুবিধা পাওয়া মানেই তো মমিনুল হকদের বিপদ! কুকাবুরা কিংবা ডিউকের মতো এসজির লাল বলেও মোম পলিশ করা থাকে। তেমনি মোমে ময়লা বেশি ধরে বিধায় গোলাপি বলের ঔজ্জ্বল্য দীর্ঘক্ষণ বজায় রাখতে ভিন্ন কেমিক্যালের প্রলেপ ব্যবহার করা হয়। সেটির কারণে উপমহাদেশের উইকেটেও গোলাপি বল থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় সুইং আদায় করতে পারেন দক্ষ সিমার। ‘১৫ ওভার তো বল সুইং করবেই’, ওয়াসিউল্লাহর মন্তব্যে সামি-ইশান্তদের চোখে খুশির ঝলক খেলতে পারে। ‘আবার সিমটা উঁচু হওয়ায় স্পিনাররাও গ্রিপ পাবে’, এসজির প্রধান বল নির্মাতার কথায় রবিচন্দ্রন অশ্বিনের জন্যও আশ্বাসবাণী আছে।

নেই শুধু ব্যাটসম্যানদের জন্য কোনো সুসংবাদ। বরং একের পর এক দুঃসংবাদ রয়েছে। প্রথমত বেশি সময় বল সুইং করবে, যা শুরুর ব্যাটসম্যানদের জন্য মোটেও স্বস্তিদায়ক খবর নয়। আবার শেষ দিকে স্পিনের হ্যাপাও সামলাতে হবে ব্যাটসম্যানদের। তাতে ইডেন টেস্ট যেন ব্যাটসম্যানশিপের অগ্নিপরীক্ষাই নিতে যাচ্ছে।

কিন্তু বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাটসম্যান-বোলারদের চেয়ে কঠিনতম পরীক্ষায় আসলে এসজির গোলাপি বল। সুইং কিংবা দীর্ঘক্ষণ সিম দৃশ্যমান থাকা নিয়ে যতই আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলুক না কেন, গোলাপি বলের ধূসর হয়ে রাতের আলোয় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কিন্তু রয়েছে। ওয়াসিউল্লাহ খান চিন্তিত এই একটি ব্যাপার নিয়েই, ‘আউটফিল্ডটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। নরম ঘাস বেশি থাকলে বলের গায়ে ময়লা কম ধরবে। আরেকটা ব্যাপার হলো, মাঠকে শিশিরমুক্ত রাখা। গোলাপি বল ভিজে গেলে ধূসর রঙের হয়ে যেতে পারে।’

অবশ্য ইডেনের আউটফিল্ড ন্যাড়া নয়। আর শিশিরের কথা ভেবে ম্যাচ শুরুর পূর্বনির্ধারিত সময়ও এগিয়ে আনা হয়েছে। তাতে বড়জোর একটা সেশন খেলা হবে কৃত্রিম আলোয়। তার ওপর শিশির ‘উড়িয়ে’ দেওয়ার জন্য কি একটা কেমিক্যালও ব্যবহার করেন ইডেনের মাঠকর্মীরা। ব্যাকআপ হিসেবে বলেই ভিন্ন পন্থাও অনুসরণ করেছেন ওয়াসিউল্লাহ, ‘লাল বলের সিম তৈরি হয় সিনথেটিক সুতা দিয়ে। গোলাপি বলে সিনথেটিকের সঙ্গে লিনেনও ব্যবহার করা হয়েছে। যেন শিশির শুষে নিতে পারে।’

তবু গোলাপি বল নিয়ে সংশয় কিন্তু রয়েই গেছে। অনভ্যস্ততা তো আর বিশেষ কোনো পলিশ কিংবা লিনেনে আড়াল করার উপায় নেই!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা