kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

দুই দশকে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট

নিজেকে বাদ দিয়ে গড়া একাদশে আমিনুল-আকরাম

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নিজেকে বাদ দিয়ে গড়া একাদশে আমিনুল-আকরাম

১০ নভেম্বর দুই দশকে পা রেখেছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট। এ উপলক্ষেই পেছন ফিরে ইতিহাসের সেরা একাদশ বাছাই করার চেষ্টা। কালের কণ্ঠ’র অনুরোধে সাড়া দিয়ে ১০ সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার নিজেদের সেরা একাদশ গড়েও দিয়েছেন। ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে তা। মাসুদ পারভেজের করা এই ধারাবাহিকের শেষ দিনে থাকছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার নিয়ে বিশেষ এক আয়োজনও। আজ থাকছে সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের সেরা একাদশ

এক এক করে তিনজন সাবেক ক্রিকেটারের সর্বকালের সেরা টেস্ট একাদশ ছাপা হয়ে গেল কালের কণ্ঠে। কিন্তু কারো দলেই তাঁর জায়গা না পাওয়ার দুঃখ যে পোড়াচ্ছিল, সেটি বোঝা গেল চতুর্থ দিন। যেদিন সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক ফারুক আহমেদের সেরা একাদশ ছাপা হলো। নিজের ফেসবুক পেজে সেটি শেয়ার দিয়ে লিখলেন, ‘অবশেষে আমি দলে জায়গা পেয়েছি।’

অন্য সবার ক্ষেত্রে ব্যাটিংয়ের তিন নম্বর পজিশনে বিবেচনা সীমিত ছিল মমিনুল হক আর তাঁর মধ্যেই। কিন্তু নিজে বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা টেস্ট একাদশ গড়তে বসে ভাবলেন শুধু মমিনুলের কথাই, ‘মমিনুলকে বাছতে কষ্ট হয়নি। আর যাঁকে বাছতে পারতাম, তিনি নিজেই এই একাদশ বানাচ্ছেন। আমি নিজেই নিজেকে রাখি কী করে?’ নিজেকে হিসাবের বাইরে রাখায় সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের একাদশে তিন নম্বর পজিশনে মমিনুলের তাই কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই ছিল না।

নিঃসংশয়ে তিনি এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানকে রাখার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন এভাবে, ‘রান করার দক্ষতা অনেক। ব্যাকফুটে শক্তিশালী। অফ স্পিনে একটু দুর্বলতা আছে যদিও। তবে ওপেনার দ্রুত আউট হয়ে গেলে নিজের ব্যাটিং দিয়ে স্থিরতা আনতে পারে। আর বড় ইনিংসও খেলতে জানে।’ এর আগে হাবিবুলের একাদশে ওপেনিংয়ে তামিম ইকবালের জায়গা তো আর সবার মতো অবধারিতই, ‘সেরা পারফরমার নিঃসন্দেহে। লর্ডসে সেঞ্চুরি করেছে। দেশ এবং দেশের বাইরে, পারফরম করেছে সব জায়গাতেই। পেস ও স্পিন সমান ভালো খেলে। সবচেয়ে বড় কথা ওর ব্যাটিং অন্য ব্যাটসম্যানদেরও আত্মবিশ্বাস দেয়। ওকে এক নম্বরে রাখতে তাই একদমই সময় লাগেনি।’

তবে যথেষ্ট সময় লেগেছে তামিমের ওপেনিং সঙ্গী বাছতে গিয়ে, ‘এমন একজনকে নিতে চেয়েছিলাম যে কিনা টেস্ট বেশি খেলেনি। কিন্তু দারুণ টেকনিক ছিল। এত নিখুঁত ব্যাটসম্যান আমি কম দেখেছি। ফ্রন্ট ও ব্যাকফুট, পেস-স্পিন এবং আক্রমণ-রক্ষণ, সব মিলিয়ে দারুণ এক প্যাকেজ। বলছি মেহরাব হোসেনের কথা।’ তাঁকে রাখতে চাইলেও হাবিবুল শেষ পর্যন্ত নিয়েছেন জাভেদ ওমরকে, ‘৪০টি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা এবং টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হাবুডুবু খাওয়ার সময়ে উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাকার মানসিকতা মিলিয়ে জাভেদের দিকেই যেতে হলো আমাকে। তা ছাড়া এতগুলো টেস্ট পারফরম না করে কিন্তু খেলেনি।’

৪০টি টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা এবং টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের হাবুডুবু খাওয়ার সময়ে উইকেট আঁকড়ে পড়ে থাকার মানসিকতা মিলিয়ে জাভেদের দিকেই যেতে হলো আমাকে। তা ছাড়া এতগুলো টেস্ট পারফরম না করে কিন্তু খেলেনি।

চার এবং পাঁচে রেখেছেন এমন দুজনকে, যাঁদের বাংলাদেশের ক্রিকেটকে আরো অনেক কিছুই দেওয়ার ছিল বলে মনে করেন হাবিবুল। সেই দুজন হলেন বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান আমিনুল ইসলাম ও ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিজয়ী অধিনায়ক আকরাম খান। টেস্টের জগতে পা রাখতে না রাখতেই যাঁরা হারিয়েছিলেন নিশ্চিন্তে খেলার পরিবেশও। দল থেকে ক্রমাগত বাদ পড়ার ঝুঁকির মধ্যে থাকা তখনকার এই দুই সিনিয়র ক্রিকেটারকে নিয়ে হাবিবুলকে তাই বলতেই হলো, ‘ওনাদের সেরাটা আমরা মিস করেছি।’

মাত্র ১৩ টেস্টের ক্যারিয়ারেও আমিনুল সর্বকালের সেরা একাদশে থাকার মতো ঝলক দেখিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস এখনকার নির্বাচকের, ‘সবাই অভিষেক টেস্টে তাঁর ১৪৫ রানের ইনিংসটির কথা বলেন। তবে পরের টেস্টেই জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তাঁর ৮৪ রানের ইনিংসটির কথাও বলতে হবে। যা ওনার টেস্ট সামর্থ্য প্রমাণ করে। চার নম্বরের জন্য এ রকম ব্যাটসম্যানই তো দরকার। আমার বিবেচনায় তিনি এগিয়ে গেছেন ওই দুটো ইনিংস দিয়েই।’

আমিনুলের মতো বড় কিছু করা হয়নি আকরামের। তবু তাঁর সামর্থ্যে হাবিবুলের দারুণ আস্থাশীলতাই আকরামকে একাদশে ঢুকিয়ে নিয়েছে, ‘যেকোনো বোলিং আক্রমণকে ছিঁড়ে-খুঁড়ে ফেলার ক্ষমতা ছিল ওনার। পেস ও স্পিন খেলার সামর্থ্যের দিক থেকে অত্যন্ত উঁচু দরের ব্যাটসম্যান।’ এরপর ব্যাটিংয়ের ছয় এবং সাত নিয়েও একদমই ভাবতে হয়নি এই নির্বাচককে, ‘ভাবনার ছিল না কিছুই। আমাদের ইতিহাসেরই সেরা দুই ব্যাটসম্যানকে নিয়েছি। যারা বিশ্বের যেকোনো দলেই ঢুকে যাবে।’

সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমই সেই দুজন, ‘ওদের দুজনকেই আমি অলরাউন্ডার ধরেছি। যেজন্য দলে একজন করে বাড়তি ব্যাটসম্যান (আকরাম) ও বোলার নিতে পারলাম।’ মুশফিক অলরাউন্ডার কারণ তিনি উইকেটের পেছনেও দাঁড়াবেন, ‘বিশেষজ্ঞ উইকেটরক্ষক হিসেবে খালেদ মাসুদ অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু মুশফিককে দিয়ে এই কাজ করালে বাড়তি একজন ব্যাটসম্যান খেলাতে পারার চিন্তায়ই আস্থা রাখলাম।’ লম্বা সময় উইকেট সামলানোর ক্লান্তি কাটিয়ে উঠার জন্য তাঁকে সাতেই নামাতে চান হাবিবুল। যদিও কখনো কখনো সাকিবকে একটু পিছিয়ে মুশফিকের ছয়ে নামার সুযোগও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।

নিজের সেরা একাদশে কোনো বিশেষজ্ঞ অফ স্পিনারও রাখেননি হাবিবুল। কারণ একাধিক, ‘দেশের মাটিতে আমি এমন উইকেটে খেলতে চাই, যেখানে পেস বোলারদের জন্যও কিছু থাকবে। তাই একাদশে তিন পেসার রেখেছি। তা ছাড়া সাকিবের সঙ্গে মোহাম্মদ রফিক থাকলে আমার আর অফ স্পিনারেরও প্রয়োজন নেই। কারণ আমি সেরাদেরই তো নিচ্ছি।’ বিশেষ করে রফিককে নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত শুনিয়েছে হাবিবুলের কণ্ঠ, ‘আমার দলে সব সময়ই থাকবে। আমি অধিনায়ক থাকাকালে যে আমাকে খুব কমই বঞ্চিত করেছে। রান আটকানোর পাশাপাশি উইকেট তুলে নেওয়া, ওর চেয়ে ভালো আর কেউ নয়। সাকিব আর ওকে নিয়েই আমার সেরা কম্বিনেশন।’

এই একাদশের নেতৃত্ব নির্দ্বিধায় মাশরাফি বিন মর্তুজার হাতে তুলে দেওয়া হাবিবুলের মনে আছে দুর্ধর্ষ সেই মাশরাফির কথাও, ‘২০০১ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত মাশরাফির কথা বলছি। আমি স্লিপে দাঁড়াতাম। এত জোরে বল করতে আমি দেশের খুব কম বোলারকেই দেখেছি। সুইংও ছিল। অত্যন্ত বুদ্ধিমান বোলার। ওর বোলিংয়ে ২০০৩ সালে আমি নাসের হুসেইনের মতো ব্যাটসম্যানকেও ভয় পেতে দেখেছি।’ ভীতিকর পেসার হিসেবে হাবিবুল মাশরাফির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন শাহাদাত হোসেনকেও। কেন? ব্যাখ্যাটিও শুনুন, ‘টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়ক যে রকম আক্রমণাত্মক বোলার চায়, রাজীব (শাহাদাতের ডাকনাম) সে রকমই একজন। সত্যিকারের টেস্ট বোলার।’ মাশরাফির পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৭২ টেস্ট উইকেটও শাহাদাতের পক্ষেই কথা বলছে। 

এঁদের সঙ্গে দেশের মাঠে কিছুটা উপযোগী উইকেটে হাবিবুল খেলার সুযোগ করে দিচ্ছেন মুস্তাফিজুর রহমানকেও, ‘টেস্ট ক্যারিয়ারে যদিও এখনো বলার মতো কিছু করেনি। যদিও যেকোনো উইকেটে ওয়ান চেঞ্জে সে উইকেট নেওয়ার মতো বোলারই।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা