kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

রঙিন বলে বিবর্ণ পেসার

১৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



রঙিন বলে বিবর্ণ পেসার

কাল শেষ বিকেলে, বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে এবাদত হোসেনকে স্থানীয় নেট বোলারদের থেকে আলাদা করা যাচ্ছিল শুধু জার্সির রং দিয়ে। আরামদায়ক গতি আর লেন্থে, মাঠের মাঝামাঝি টাঙানো নেটে একের পর এক বল করে গেছেন লিটন দাস, মমিনুল হকের মতো ব্যাটসম্যানদের। বল মাঝব্যাটে লাগার শব্দগুলো স্পষ্ট শোনা গেছে গ্যালারি থেকে। নেটে সতীর্থদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য এসব বল উপকারী, তবে সমস্যাটা হচ্ছে এবাদত ম্যাচেও এ রকমই বল করেন!

একটি মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের পেসার হান্ট কর্মসূচির জয়ী বোলার এবাদত হারিয়ে ফেলেছেন সেই গতির তেজ। ছিলেন বিমানবাহিনীর ভলিবল খেলোয়াড়, পেশাদার ক্রিকেটে খুব বেশিদিনের খেলার অভিজ্ঞতাও হয়নি। তাই ম্যাচ পরিস্থিতিতে কী করে বল করতে হয়, বিশেষ করে টেস্ট ম্যাচে; সেই ধার এখনো লাগেনি এবাদতের বলে। টেস্ট ম্যাচে তিনটি ইনিংসে বোলিং করার সুযোগ হয়েছে এবাদতের, দুবারই তিনি সেঞ্চুরিয়ান! অর্থাৎ ১০০-র বেশি রান দিয়েছেন (১০৭/১, ১১৫/১), যে একবার তিন অঙ্কে যাননি সেবারও কাছাকাছি (১৬ ওভারে বিনা উইকেটে ৮৪)। গোলাপি বলে প্রথম টেস্ট খেলার আগে ভারতের ব্যাটসম্যানরা যখন বলের উজ্জ্বলতা নিয়ে বড্ড চিন্তিত, তখন বাংলাদেশ আসলে চিন্তিত বিবর্ণ পেস বোলিং নিয়ে।

ইডেনে খেলা শুরুর আগে থেকেই আলোচনায় গোলাপি বলের ল্যাটালার মুভমেন্ট, সিম, সুইং আর শেষবেলায় শিশিরের প্রভাব। প্রশ্ন হচ্ছে, বাংলাদেশ দলে বলের এই সুবিধাগুলো কাজে লাগাবার মানুষটা কে? আবু জায়েদ রাহি প্রথম টেস্টে ভালো বোলিং করেছেন, সুইংটাই তাঁর শক্তি। ইডেনে তাই নিশ্চিতভাবেই থাকছেন রাহি। কিন্তু এবাদত? তাঁর ভাগ্য খুব সম্ভবত নেটে বোলিং করাই। কারণ কাল সন্ধ্যায়, ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠার পর বোলিং কোচ শার্ল ল্যাঙ্গেভেল্টকে লম্বা সময় কাজ করতে দেখা গেছে মুস্তাফিজুর রহমান ও আল-আমিন হোসেনের সঙ্গে।

টি-টোয়েন্টি সিরিজটা বিবর্ণ কাটানোর পর ইন্দোরে একাদশে অনুপস্থিত মুস্তাফিজকে ইডেন টেস্টে দেখতে পাওয়া যাবে কি না, সেটা জানতে ভারতীয় সাংবাদিকদের প্রবল আগ্রহ। ভারতের বিপক্ষে অভিষেক ওয়ানডে সিরিজের পারফরম্যান্স হোক, অথবা আইপিএল; মুস্তাফিজ একটা ‘এক্স-ফ্যাক্টর’ এবং সেটা  ভারতীয় অধিনায়ক বিরাট কোহলিও মেনে নিয়েছেন, ‘মুস্তাফিজ বেশ ভালো বোলার, ওর বিপক্ষে অনেকবারই খেলা হয়েছে। যেকোনো বাঁহাতি বোলারই একটু ব্যতিক্রমধর্মী বোলার, কারণ এ রকম বোলার দলে খুব বেশি থাকে না। সে একটা বিপদ হতে পারে, সে বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ বোলার হয়ে উঠতে পারে। সে অনেক দিন ধরে খেলছে, ভারতীয় ব্যাটসম্যানদেরও জানে আইপিএল খেলার সুবাদে। তার ওপর আমাদের মনোযোগ থাকবে।’ আজ কলকাতার উদ্দেশে বিমানে উঠার আগে, ইন্দোরের শেষ অনুশীলনে গোধূলি বেলায় বেশ অনেকটা সময়ই নেটে বোলিং করেছেন মুস্তাফিজ। তাঁর বল খেলতে খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা, যেটা পারছিলেন এবাদতের বলে।

আবু জায়েদ রাহি প্রথম টেস্টে ভালো বোলিং করেছেন, সুইংটাই তাঁর শক্তি। ইডেনে তাই নিশ্চিতভাবেই থাকছেন রাহি। কিন্তু এবাদত? তাঁর ভাগ্য খুব সম্ভবত নেটে বোলিং করাই। কারণ কাল সন্ধ্যায়, ফ্লাডলাইট জ্বলে উঠার পর বোলিং কোচ শার্ল ল্যাঙ্গেভেল্টকে লম্বা সময় কাজ করতে দেখা গেছে মুস্তাফিজুর রহমান ও আল-আমিন হোসেনের সঙ্গে।

টেস্ট দলে আরেকজন পেসার আল-আমিন হোসেন। সব শেষ টেস্ট খেলেছেন পাঁচ বছর আগে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। ৬ টেস্টের ক্যারিয়ারে ৯ ইনিংস বল করে উইকেট মাত্র ৬টি, যার ভেতর এক ম্যাচেই আছে ৩ উইকেট! স্ট্রাইকরেট প্রায় ১৪৫, যার মানে দাঁড়াচ্ছে প্রতি ২৪ ওভার বল করে একটা উইকেট নিয়েছেন আল-আমিন, অপেক্ষাটা অত্যন্ত দীর্ঘ। তবে এসবই অবশ্য বছর পাঁচেকের পুরনো পরিসংখ্যান, টি-টোয়েন্টি সিরিজে ভারতের ব্যাটসম্যানদের বেশ ভুগিয়েছেন আল-আমিন। টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহও বেশ প্রশংসা করেছেন আল-আমিনের। কাল নেটে তাঁকেও দেখা গেছে ব্যস্ত সময় কাটাতে। ব্যাটিং অনুশীলন শেষে মেহেদী হাসান মিরাজ জানিয়েছেন গোলাপি বলে খেলার অভিজ্ঞতার কথাও, ‘আজ (কাল) আমি ব্যাটিং করার সময় বল একটু মুভ করছিল। আমার কাছে মনে হয়েছে বলটা ভারী, ব্যাটে লাগলে দ্রুত যায়। গোলাপি বলে সুইং থাকতে পারে একটু বেশি, বল কাটও করতে পারে, মাঝে মাঝে দেখলাম কাটও করছে। তবে ম্যাচে গেলে কেমন হয় সেই অভিজ্ঞতা নাই।’

গোলাপি বলে খেলা নিয়ে ভারতীয় ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকেও যতটা শোনা গেছে, বেশির ভাগটা জুড়েই ছিল ল্যাটারেল মুভমেন্ট ও সুইং। মোহাম্মদ সামি ইন্দোরের উইকেটে যেভাবে সুইং পেয়েছেন, তাতে ইডেনে তাঁর আরো ধারালো হয়ে উঠার আশঙ্কা আছে মমিনুল হকেরও, টেস্ট শেষে বলেছিলেন ‘এখানেই এমন সুইং হয়েছে যা জীবনেও দেখিনি, এর চেয়ে বেশি সুইং আর কী হবে!’ দিনের আলোয় লাল বল চোখে দেখতেই খাবি খাওয়া বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা গোলাপি বলে চোখ সইয়ে নিতে দুটি দিন তো নেটে প্রচুর খেললেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের মনে কাঁপন ধরানোর মতো বোলার কোথায়? বিনা পেসারে, এক কিংবা দেড় পেসার নিয়ে দল গঠনে অভ্যস্ত বাংলাদেশ দিন-রাতের টেস্টে চমকে দিতে তিন পেসার নিয়ে একাদশ গড়ার চিন্তাও আছে বাংলাদেশ দলে। রাতের ইডেনে শিশির আর ভেজা বলে স্পিনারদের বল করতে অসুবিধাই হওয়ার কথা। তাই একজন স্পিনার কমিয়ে আরেকজন পেসার একাদশে ঢোকানোর ভাবনা খেলছে দলের নীতিনির্ধারকদের মাথায়। সে ক্ষেত্রে কোপটা পড়তে পারে ২৮ ওভারে বিনা উইকেটে ১২০ রান দেওয়া তাইজুল ইসলামের ওপর, যাঁর বল শিশুপাঠ্যের মতোই গড়গড়িয়ে পড়েছেন ভারতের ব্যাটসম্যানরা।

চলতি বছরের গোড়ার দিকে, নিউজিল্যান্ড সফরে অবশ্য পেস সহায়ক উইকেট ভেবে তিন পেসার খেলিয়েছিল বাংলাদেশ। রান দেওয়ার বেলায় তিনজনই করেছিলেন ‘সেঞ্চুরি’, তিনজনে মিলে ৩৬৯ রান দিয়ে নিয়েছিলেন মোটে ১ উইকেট। তাই সেই ভাবনাটাও আসছে ঘুরেফিরে, তারপরও খেলাটা গোলাপি বলে দিন-রাতের টেস্ট বলেই একটা সাহসী চিন্তা কাজ করছে কর্তাব্যক্তিদের মাথায়। শুধু একটাই প্রশ্নের উত্তরের খোঁজ চলছে। নতুন গোলাপি বল অনেকটা সময় ধরেই চকচক করবে, বাংলাদেশের পেসাররা চমকাবেন কবে?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা