kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৭ রবিউস সানি ১৪৪১     

আবু জায়েদের ৪ উইকেট

পেসারদের বঞ্চনার গল্প

১৬ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পেসারদের বঞ্চনার গল্প

সিলেটের ছেলে আবু জায়েদ চৌধুরীর ডাকনাম রাহি। হিন্দিতে যে শব্দের অর্থ হচ্ছে পথিক বা যাত্রী। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলেও আবু জায়েদের অবস্থাটা যাত্রীর মতোই, নেই কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা। অভিষেক টেস্ট দলে, নজর কাড়েন বিপিএলে, জায়গা পান বিশ্বকাপ দলে, কিন্তু খেলা হয় না কোনো ম্যাচেও। আবু জায়েদ যেন টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের পেসারদেরই প্রতীক। অধিনায়করা তাঁদের দলে চান না, দলে নিলেও আস্থা রাখেন না। একটা সময় ভারতীয় ক্রিকেট দলেও স্পিন-নির্ভরতার দিনে পেসারদের কাজ ছিল কোনো রকমে বলটাকে একটু পুরনো করে দেওয়া। বাকি কাজটা করতেন স্পিনাররা। সেই ভারত এখন টেস্ট ক্রিকেটের সেরা ফাস্ট বোলিং শক্তি নিয়ে গর্ব করে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আদৌ কোনো নির্দিষ্ট পেস আক্রমণ আছে কি না, সেটাই বোধগম্য নয়। প্রতিভার দোহাই দিয়ে একের পর এক সুযোগ মিলছে কোনো কোনো ব্যাটসম্যানের আর পেসারদের তো কখনো কখনো একাদশেই জায়গা হচ্ছে না!

আফগানিস্তানের বিপক্ষে যে টেস্টটি খেলেছিল বাংলাদেশ, তাতে ১১ জনের ভেতর একজনও ছিলেন না পেসার। একাদশে পেসার না রাখার যুক্তি হিসেবে সে সময়ের অধিনায়ক সাকিব দেখিয়েছিলেন, ‘জায়গাটার জন্য পেসারদের তো যোগ্য হতে হবে আগে, নাকি? পেসারদের পরিসংখ্যান দেখছিলাম, আমাদের পেসারদের ইকোনমি (ওভারপ্রতি গড় রান) ৪.৪১। ওরা যদি পুরো ৯০ ওভার বল করে তাহলে এক দিনেই প্রতিপক্ষের রান হবে ৪০০, এক দিনেই আমরা ম্যাচের বাইরে। বোলার যদি আমাদের কাজে না আসে, তাহলে নিয়ে লাভ কী?’ সাকিবের যুক্তিতে জোর আছে, সন্দেহ নেই। কিন্তু একই যুক্তি কিন্তু ব্যাটসম্যানদের বেলায় খাটছে না। বরং প্রতিভা, সম্ভাবনা ইত্যাদি নানা বিশেষণ কিংবা সুদূর অতীতের কোনো এক ইনিংসের সুখস্মৃতির জোরে খেলে যাচ্ছেন একাধিক ব্যাটসম্যান। ধরা যাক সৌম্য সরকারের কথাই। সুযোগ কম পেয়েছেন—এমন কথা ঘোরতর নিন্দুকও বলবে না। টেস্টে ইনিংসের গোড়াপত্তনে নেমে সব শেষ ১০ ইনিংসে একটিও পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস নেই, অথচ তাঁকে তো আফগানদের বিপক্ষে একাদশে নিয়ে ঠিকই সবার আগে ব্যাট করতে পাঠান সাকিব! ভারত সফরে তামিম ইকবাল ব্যক্তিগত কারণে না খেলায় দলে ফিরেছেন ইমরুল কায়েস। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ বছরের বেশি কাটিয়ে দিয়েও এখনো ‘কামব্যাক কিং’ হিসেবেই থেকে গেছেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। ব্যাগটা তাঁর গোছানোই থাকে, কেউ চোট-আঘাত পেয়ে দলের বাইরে গেলেই শুধু ইমরুলের ডাক পড়ে। এরপর নিয়মিত ক্রিকেটারটি ফিরে এলে তাঁকে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ঢাকায় ৭৮ রানের ইনিংস খেলার পর ২০টির বেশি ইনিংসে কোনো হাফসেঞ্চুরি নেই ইমরুলের, রানের গড় ২৫ এবং সেই সঙ্গে অত্যন্ত বাজে ফিল্ডিংয়ে নিয়মিতই ক্যাচ ফেলার মুদ্রাদোষ নিয়েও ইমরুল কিন্তু ঠিকই আছেন টেস্ট দলে।

পেসারদের প্রতি এই বিমাতাসুলভ আচরণ শুধু সাকিব একা করেছেন এমন নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বেশির ভাগ টেস্ট অধিনায়কই উপেক্ষা করে গেছেন পেসারদের। ধরা যাক সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত প্রথম টেস্টটাই, যেখানে বাংলাদেশকে ১৫১ রানে হারিয়ে ১৮ বছর পর ২০০১ সালের পর প্রথম টেস্ট জিতেছিল জিম্বাবুয়ে। সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি বানানো হয়েছে টিলা কেটে, খুব স্বাভাবিকভাবেই এখানকার মাটি অনেক শক্ত ও কঠিন। সেখানেও মাহমুদ উল্লাহ একাদশ সাজালেন দেড়জন পেসার নিয়ে! নিয়মিত পেসার আবু জায়েদের সঙ্গে বোলিং অলরাউন্ডার আরিফুল হক। উল্টোদিকে জিম্বাবুয়ে কাইল জার্ভিস ও টেন্ডাই চাতারা, দুই পেসারের সঙ্গে স্পিনার ও অলরাউন্ডারদের কাজে লাগিয়ে তুলে নিল বাংলাদেশের ২০ উইকেট। প্রথম ইনিংসে জার্ভিস ও চাতারা মিলে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের পাঁচ উইকেট তুলে নিয়েই এগিয়ে দেন জিম্বাবুয়েকে।

সিলেট বাদে দেশের বাকি ভেন্যুগুলোতে সাফল্য এসেছে স্পিনারদের হাত ধরেই। অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট জয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ—সব বড় সাফল্যই এনে দিয়েছেন স্পিনাররা, এটা নির্জলা সত্য। সব শেষ তিন বছরে, দেশের মাটিতে প্রতিপক্ষের ২০০ উইকেটের ১৮০টিই তুলে নিয়েছেন স্পিনারারা, পেসাররা পেয়েছেন মাত্র ১৫টি। কিন্তু দেশের বাইরে, টেস্ট জেতার পথে হাঁটতে হলেও তো স্পিনারদের পাশাপাশি পেসারদেরও সুযোগটা দেওয়া দরকার। বছর দুই আগে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাংলাদেশের শততম টেস্টেও মুস্তাফিজুর রহমানের একটি স্পেল বদলে দিয়েছিল ম্যাচের রং। এই সাফল্যের গল্প যেমন আছে, তেমনি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষেও তিন পেসার খেলিয়ে ব্যর্থতার গল্পটাও পুরনো নয়। হ্যামিল্টনে, নিউজিল্যান্ডের একমাত্র ইনিংসে খালেদ হোসেন, এবাদত হোসেন ও আবু জায়েদ মিলে ৮৭ ওভার বল করে ৩৫৯ রান দিয়ে নিয়েছিলেন মাত্র ১টি উইকেট! তবে পরের টেস্টেই আছে সাফল্যের গল্পও, মাত্র ৮ রানেই নিউজিল্যান্ডের দুই উদ্বোধনী ব্যাটসম্যানকে ড্রেসিংরুমে ফেরত পাঠিয়েছিলেন রাহি। এরপর কী করে তারা সাড়ে চার শর কাছাকাছি রান তুলেছে সেটা অন্য আলোচনা।

টেস্টে নতুন বল একটা সুবিধা। নতুন বলে বল করার জুটিটা ইনিংসের গোড়াপত্তনে নামা ব্যাটসম্যানের জুটির চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। রাহি যখন এক দিক থেকে দুর্দান্ত বোলিং করছেন, তখন অন্য প্রান্ত থেকে চলছে নির্বিষ বোলিং। ব্যাটসম্যানরা চাপটা সরিয়ে দিচ্ছেন অনায়াসে। পূর্বসূরিদের মতো পেসারহীন অথবা দেড় পেসারের বদলে টেস্ট অভিষেকে দুই পেসার খেলিয়েছেন মমিনুল হক, তবে রাখেননি মুস্তাফিজুর রহমানকে, যেটা বিস্মিত করেছে ভারতীয় সাংবাদিকদেরও। বিশেষ করে টেস্ট শুরুর আগের দিন বিরাট কোহলি যখন বলে যান, ‘আমাদের কাছে বাঁহাতি পেসারকে খেলা কঠিন কারণ নিয়মিত ওদের বিপক্ষে খেলার সুযোগ আসে না। মুস্তাফিজ হতে পারে বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ বোলার, ওকে আইপিএলে দেখেছি।’ এর পরও যখন পরদিন একাদশে মুস্তাফিজের জায়গা হয় না, বরং বিশের কোঠায় টেস্টের রানগড় এমন একজনকে নিয়ে অধিনায়ককে বলতে শোনা যায়, ‘এই উইকেটে তিন পেসার খেলানোর সাহস পাই না, ব্যাপারটা আসলে তেমন নয়। অতিরিক্ত একজন ব্যাটসম্যান খেলাব, সব সময় এ রকম একটা মানসিকতা ছিল, তাই তিন পেসার নিইনি।’ কাল কোচ রাসেল ডমিঙ্গোও বললেন, ব্যাপারটা আসলে উভয় সংকটের মতো, ‘ভারত বা অস্ট্রেলিয়ার মতো দলগুলোতে দেখুন, ওপরের পাঁচ-ছয়জন ব্যাটসম্যানের রানগড় চল্লিশ থেকে পঞ্চাশের কাছাকাছি। আমাদের সেটা নয়, বিশের ঘরের মাঝামাঝি। এই পার্থক্যটা দূর করার জন্য বাড়তি একজন ব্যাটসম্যান খেলাতে হচ্ছে। এটা অনেকটা উভয় সংকটের মতো। কখনো ১০০ জনের মধ্যে ৫০ জন বলবে বাড়তি ব্যাটসম্যান নিলে ভালো হতো, বাকি ৫০ জন বলবে বোলার নিলে ভালো হতো।’

অন্য প্রান্ত থেকে দেখেছেন নির্বিষ বোলিং, দেখেছেন সতীর্থ ফিল্ডারের ক্যাচ ছেড়ে দেওয়ার পরের নির্লিপ্ততা, দেখেছেন অধিনায়কের উপেক্ষাও। যোগ্য সতীর্থের অভাবে রাহি তাই যেন শেষ ট্রেন মিস করে অন্ধকার প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীর মতোই একা। খুব একা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা