kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

কাঁটার মুকুটে অভিষেক মমিনুলের

১৫ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাঁটার মুকুটে অভিষেক মমিনুলের

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হওয়ার সুখ-দুঃখ দুই-ই আছে। মাশরাফি বিন মর্তুজা যেমন অধিনায়কের পরিধিটাকে ক্রিকেট দলের বাইরে বিস্তৃত করে দিয়েছেন জাতীয় রূপ। অভিমানী মুশফিকুর রহিম কখনো হতাশায় ক্ষোভে আচমকা নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণাই দিয়ে ফেলেছিলেন। শ্রীলঙ্কা সফরে ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক তামিম ইকবাল দায়িত্বের চাপে ভুলেছেন ব্যাটিং। নিষিদ্ধ হওয়ার আগে, আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে ব্যাটিং অর্ডারে ওলটপালট করায় কম সমালোচিত হননি সাকিব আল হাসানও। নেতৃত্ব যেন কাঁটার মুকুট; বাড়তি ভাতা, হোটেলে স্যুইট রুমের সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে এসে গণমাধ্যমের প্রশ্নবাণ সামলানোর যন্ত্রণাও আছে। এত দিন দলের একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে যেটা বুঝতে পারেননি মমিনুল হক। কাল টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকের প্রথম দিনে মাঠে এবং মাঠের বাইরে অধিনায়কের জীবনটা কেমন, তার একটা আভাস পেয়ে গেছেন মমিনুল।

দুই দিন ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে লেখালেখি চলছে, কেমন হবে ইন্দোরের উইকেট। লাল মাটির উইকেট, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকায় যাওয়ার আগে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে গ্রিনটপ উইকেট বানিয়ে খেলে গেছে ভারতীয় দল; কদিন আগেই যারা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো পেস বোলিং-নির্ভর দলের বিপক্ষে দেশের মাটিতে টেস্ট সিরিজ জিতেছে পেস বোলিংয়ের দাপট দেখিয়ে, তাদের বিপক্ষে মহামূল্যবান টস জেতার পর কেন ব্যাটিং বেছে নিলেন মমিনুল হক? যে সিদ্ধান্তটা অবাক করেছে ভারতীয় দলকেও, বললেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন, ‘ওদেরকে ব্যাটিং করতে দেখে আমরাও একটু অবাক হয়েছি। ভেবেছিলাম ওরা বোলিং করতে চাইবে।’ একই প্রসঙ্গে মমিনুলের ব্যাখ্যা, ‘আসলে যখন কোনো একটা সিদ্ধান্ত নিই, এরপর ফলটা ভালো না হলে সিদ্ধান্তটাই যে ভুল হয়ে যায় এমনটা নয়। আমরা আজকে (কাল) বাজে ব্যাটিং করেছি। যদি ব্যাটিংটা ভালো হতো, তাহলে হয়তো এই সিদ্ধান্তটাও ভুল হতো না।’

ম্যাচের আগের দিন তাঁর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল একাদশে সম্ভাব্য পেস বোলার ও স্পিন বোলারের সমন্বয়টা, সোজা কথায় বোলিং আক্রমণের চেহারাটা। মমিনুল কূটনৈতিক উত্তরে বলেছিলেন সিদ্ধান্তটা নেবে টিম ম্যানেজমেন্ট। টস জিতে ব্যাটিং নেওয়া, একাদশ বাছাই—সব কিছুতেই ক্রিকেটের মতো ‘ক্যাপ্টেন’স গেম’-এ কথিত ‘টিম ম্যানেজমেন্ট’-এর পরিচয় জানতে চাওয়া হলে মমিনুলের উত্তর, ‘টিম ম্যানেজমেন্ট হিসেবে আমিই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখানে আমিই টিম ম্যানেজমেন্ট, আমিই ভুল করেছি টসে জিতে ব্যাটিং নিয়ে।’

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হওয়াটা অভাবের সংসারের কর্তা হওয়ার মতোই। ২০০ টাকা কেজি পিঁয়াজের বাজারের যার নুন আনতে পান্তা ফুরোয়! দিনের শুরুতে মমিনুল দেখেছেন ভারতীয় পেসারদের আধিপত্যটা, একই দিনের শেষ বেলায় দেখছেন নিজের দলের এক পেসারের অসহায়ত্বও। নবীনতম টেস্ট অধিনায়ক মনে করেন, বিকল্পের অভাবটাই প্রকট, ‘সত্যি কথা বলতে কি, চার দিনের ম্যাচে খেলাবার মতো খুব বেশি বোলার আমাদের হাতে নেই। যে দুজন পেসার (একাদশে) খেলছে, তারা কিন্তু নিয়মিত চার দিনের ম্যাচ খেলে। হুট করে এভাবে খেলতে নামা আসলে কঠিন। আর আমরা আসলে ব্যাটিংয়ের দিকেই একটু বেশি মনোযোগ দিই।’

মাঠে ভারতীয় বোলারদের বোলিংটা ভালোই সামলাচ্ছিলেন মমিনুল। হঠাৎ একটা ছোট্ট ভুলে, রবিচন্দ্রন অশ্বিনের সোজা আসা একটা বলে বোল্ড হয়ে গেলেন। মমিনুল বলছেন, নিজের ভুলেই বিদায় নিয়ে দলের বিপদটা বাড়িয়েছেন, ‘আমি টেকনিক্যালি ছোট্ট একটা ভুল করেছিলাম, একটু দেরি করে ফেলেছিলাম, যে কারণে আউট হয়ে গেছি।’ বড় ইনিংস খেলতে পারার জন্যই ‘টেস্ট স্পেশালিস্ট’ তকমাটা লেগে আছে মমিনুলের সঙ্গে। তাহলে কি নেতৃত্বের দায়ভারই তাঁর ভাবনার জগত্টাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল, যেখান থেকে এই ছোট্ট ভুল?

শুধু মাঠে বোলারদের বাউন্সার সামলানোই নয়, সংবাদ সম্মেলনে অনেক প্রশ্নের গুগলিও সামাল দিতে হয় অধিনায়ককে। মমিনুল এখানেও প্রথম ইনিংসে ব্যর্থ, ‘একটা কথা বলি, আপনাদের কাছে হয়তো শুনতে হাস্যকর লাগবে। যেকোনো সিরিজ শুরুর আগে, এমনকি আফগানিস্তানের সঙ্গে সিরিজ শুরুর আগেও আপনারা নানা প্রশ্ন করেন যেন আমরা সিরিয়াস নই। বিষয়টি আমরা চিন্তা করতে না চাইলেও আপনাতেই মাথায় ঢুকবে, যেমন আপনারা রশিদ খানকে নিয়ে অনেক প্রশ্ন করেছিলেন। জিনিসটাকে যদি আপনারা এভাবে ভাবেন, তাহলে আমাদের জন্যও কঠিন হয়ে যায়। কথাটি হয়তো আমার বিরুদ্ধেও যেতে পারে। মানসিকভাবে আরো শক্ত না হলে এই পর্যায়ে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করাটা কঠিন।’

দেশ ছেড়ে ভারতে আসার আগে, ভারতীয় একটি গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপে অনেক গুছিয়েই কথা বলেছেন মমিনুল। অথচ টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দুটি সংবাদ সম্মেলনেই তাঁর ভেতর অস্থিরতার ছাপ। বিশেষ করে টেস্ট ম্যাচের প্রথম দিন দলের অধিনায়কের সংবাদ সম্মেলনে চলে আসাটাও বেশ অপ্রত্যাশিত। সব মিলিয়ে যে ছবিটা দাঁড়াচ্ছে, তাতে নতুন দায়িত্বের প্রথম দিনটা খুব একটা উপভোগ্য ছিল না মমিনুলের কাছে। মাঠে নিজের ছোট্ট একটা ভুলে আউট হওয়া, প্রথম দিনেই দলের প্রবল ব্যর্থতার পর সংবাদ সম্মেলনে এসে নানা রকম প্রশ্নবাণের সামনে পড়ে মমিনুল বুঝে গেছেন, অধিনায়ক হওয়ার যন্ত্রণাটাও কম নয়!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা