kalerkantho

বুধবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৩ রবিউস সানি     

কোহলির আলোয় বদলে গেল সব কিছু

১৪ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কোহলির আলোয় বদলে গেল সব কিছু

ইন্দোর থেকে প্রতিনিধি : সব কিছুই চলছিল স্বাভাবিক নিয়মে, চেনা ছন্দে। দিল্লি থেকে নাগপুর, নিয়ম করে ম্যাচের আগে-পরে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করতে গণমাধ্যমের সামনে এসেছেন রোহিত শর্মা। ব্যাট হাতে ২২ গজে বিধ্বংসী হলেও মাইক্রোফোনের সামনে রোহিত যেন খুব গত্বাঁধা, সাংবাদিকের ভাষায় তাঁর কথায় ‘বাইট’ নেই। হয়তো রোহিত নিজেও জানেন, যে দায়িত্বটা ঘাড়ে চেপেছে সেটা সাময়িক। সাদা বল আর নীল জার্সির ভুবন থেকে সাদা পোশাক আর লাল বলের দুনিয়াতে পা রাখতেই রোহিত ফিরে গেলেন পুরনো জায়গায়, সিংহাসনে বিরাট কোহলি। ঠিক যেন মৃগয়া শেষে রাজ্যে ফেরা কোনো নৃপতির! বিরাট মাঠে ফিরতেই ব্যস্ততা বেড়ে গেল আলোকচিত্রীদের, ভিড় বাড়ল সংবাদ সম্মেলন কক্ষে, লম্বা হতে লাগল কথোপকথন। শব্দচয়নে, উচ্চারণে, মনোভাব প্রকাশের ভঙ্গিতে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার আর্টটাও শিখে ফেলেছেন কিং কোহলি, ইদানীংকার ‘মি. ইন্ডিয়া’ বললেও অত্যুক্তি হবে না।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১০ বছরের বেশি হয়ে গেছে কোহলির, টেস্ট খেলা হয়ে গেছে ৮২টি আর রেকর্ড বইতে নিয়মিতই ছাড়িয়ে যাচ্ছেন পূর্বসূরিদের কীর্তিকে। তবু অনুশীলনে প্রথম দিন মাঠে নামা কোনো কিশোরের মতোই রোমাঞ্চিত ও ছটফটে কোহলি! নেটে ব্যাটিং করলেন, স্লিপ ফিল্ডারদের ক্যাচ অনুশীলনের জন্য বল ছুড়লেন, কোনো কিছুতেই কোনো ক্লান্তি নেই। সংবাদ সম্মেলনেও প্রশ্নের উত্তর দিলেন ব্যাটিংয়ের মতোই সাবলীল ঢঙে। মিনিট বিশেকের সংবাদ সম্মেলনে আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া টেস্ট ছাপিয়ে দিন-রাতের টেস্ট, ক্রিকেটারদের মানসিক স্বাস্থ্য, কৈশোরের স্মৃতি আর ভারতের টেস্ট ম্যাচ আয়োজনের জন্য পাঁচটি ভেন্যু নির্দিষ্ট করে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া—সব প্রসঙ্গেই সপ্রতিভ উত্তর কোহলির। ঠিক যেভাবে মাঠে খেলে দেন লেগ স্পিন, অফ স্পিন, ফাস্ট বোলিং, সব কিছুই!

সাদা বল আর নীল জার্সির ভুবন থেকে সাদা পোশাক আর লাল বলের দুনিয়াতে পা রাখতেই রোহিত ফিরে গেলেন পুরনো জায়গায়, সিংহাসনে বিরাট কোহলি। ঠিক যেন মৃগয়া শেষে রাজ্যে ফেরা কোনো নৃপতির! বিরাট মাঠে ফিরতেই ব্যস্ততা বেড়ে গেল আলোকচিত্রীদের, ভিড় বাড়ল সংবাদ সম্মেলন কক্ষে, লম্বা হতে লাগল কথোপকথন। শব্দচয়নে, উচ্চারণে, মনোভাব প্রকাশের ভঙ্গিতে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখার আর্টটাও শিখে ফেলেছেন কিং কোহলি, ইদানীংকার ‘মি. ইন্ডিয়া’ বললেও অত্যুক্তি হবে না।

কোহলির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসবক্সেও বেড়েছে ভিড়। এত দিন তিনটি টি-টোয়েন্টির ভেন্যুগুলোতে বাংলাদেশের সাংবাদিকরাই সংখ্যায় ছিল এগিয়ে। ভারতীয় সাংবাদিক বলতে আঞ্চলিক পত্রিকা আর কোনো সর্বভারতীয় গণমাধ্যমের স্থানীয় প্রতিনিধি। কিন্তু টেস্ট ম্যাচের আগে ইন্দোরে এসে পড়েছেন হিন্দি ও ইংরেজি ভাষার শীর্ষ গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও। এত দিন বিসিসিআইয়ের পরিচয়পত্রেই মাঠে ঢোকা গেছে। কিন্তু টেস্ট ম্যাচের আগে আলাদা করে মধ্য প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন থেকে ‘পাস’ নিতে হয়েছে। ভেন্যু মিডিয়া ম্যানেজার অনেককেই ফিরিয়ে দিচ্ছেন জায়গার অভাবে। এমন নয় যে বাংলাদেশ এমনই প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে উঠে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে! আকর্ষণটা আসলে টেস্টের এক নম্বর দলকে ঘিরেই, যার নেতৃত্বে কোহলি। শুধু গণমাধ্যমেই নয়, স্থানীয় দর্শকদের মধ্যেও ইন্দোর টেস্টকে ঘিরে উত্তেজনা কম নেই। মধ্য প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট অভিলাস খান্ডেকার জানিয়েছেন, ১৬ হাজার টিকিটের ভেতর সাড়ে আট হাজার টিকিট এরই মধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। তাদের বেশির ভাগই যে কোহলির ব্যাটিং দেখতে উন্মুখ, সেটা ভারতীয় দলের টিমবাস মাঠে ঢোকার সময় কোহলির নামের জয়ধ্বনিতেই স্পষ্ট!

ম্যাচের আগে বা পরে, সংবাদ সম্মেলনে এসে রোহিত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সব প্রশ্নেরই একই রকম জবাব দিতেন। কোহলি মাইক্রোফোনের সামনে চলে আসায় যেন নিরস সংবাদ সম্মেলনও হয়ে উঠল প্রাণবন্ত। কাল এক প্রশ্নের জবাবে জানালেন নিজের কৈশোরের অভিজ্ঞতাও, ‘আমরা যখন ছোট ছিলাম, তখন রঞ্জি ট্রফির কোনো ক্রিকেটারকে নেট করতে দেখাটাও ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। এখনকার প্রজন্ম ভাগ্যবান, ওরা কাছ থেকে অনেক কিছু দেখছে ও শিখছে। নেটে স্থানীয় বোলারদের খেলতে এখন খুব মজা লাগে। ওদের ভেতর একটা কিছু করে দেখানোর জেদ থাকে, বারবার আউট করার চেষ্টা করে। এমনকি আউট করে ফেললে উল্লাসও করে। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ব্যাপারটা সত্যিকারের ম্যাচের কাছাকাছি একটা অনুভূতি দেয়।’

কথা উঠল মানসিক চাপের কারণে গেন ম্যাক্সওয়েল এবং আরো এক ক্রিকেটারের খেলা থেকে সরে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গেও। কোহলি খোলামেলা জানিয়ে দেন নিজের একটি না বলা ঘটনাও, “একটা সময় আমিও খুব হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ২০১৪ সালের ইংল্যান্ড সফরের সময় মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শেষ বুঝি এখানেই। এবং সত্যি কথাটা হচ্ছে, ‘আমি মানসিকভাবে খেলার মতো অবস্থায় নেই’—এই কথাটা বলার সাহস আমার ছিল না। তাই আমার মনে হয় কোনো ক্রিকেটারকে যদি ভারতীয় দলের জন্য, ভারতের ক্রিকেটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয় তাহলে তার যত্নেরও দরকার আছে। এ রকমটা যেকোনো মানুষের জীবনের যেকোনো সময়ে হতে পারে।”

ইন্দোরের স্থানীয় এক সাংবাদিক হিন্দিতেই জিজ্ঞেস করলেন, কেন ইন্দোরকে টেস্ট ভেন্যুর তালিকা থেকে বাদ দিতে চান। বয়স্ক সেই সাংবাদিককে কোহলি খুব ধৈর্য নিয়ে বোঝালেন, ‘দেখুন, আমার কোনো নির্দিষ্ট রাজ্য বা ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতি ক্ষোভ বা বিদ্বেষ নেই। আমরা যখন বিদেশ সফরে যাই, ধরুন অস্ট্রেলিয়াতেই যদি যাই আমাদের জানা থাকে যে চারটি টেস্ট আমরা এমসিজি, সিডনি, অ্যাডিলেড আর ব্রিসবেনে খেলব। এ রকম টেস্টের জন্য পাঁচটি ভেন্যু নির্দিষ্ট করে দিলে আমাদের সুবিধা হয়, আমি এ রকম একটা প্রস্তাব দিয়েছি মাত্র। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি দেশজুড়ে যতগুলো জায়গায় করা সম্ভব, সব জায়গায় হোক। কিন্তু টেস্টের পাঁচটি কেন্দ্র নির্দিষ্ট থাক, এটা আমার মত।’

কোহলির রাজ্যপাটটা ২২ গজ আর বাউন্ডারি সীমানার বাইরেও বিস্তৃত। ভারতীয় ক্রিকেটের নিউক্লিয়াসকে ভাবতে হয় তরুণদের তুলে আনা, ফাস্ট বোলিংয়ের ধার বাড়ানো, টেস্টকে আকর্ষণীয় করাসহ আরো অনেক কিছু নিয়েই। এখানেই শচীন টেন্ডুলকারের সঙ্গে কোহলির ফারাক। টেন্ডুলকার ছিলেন ধ্যানমগ্ন ঋষি, নিজের ব্যাটিংয়ের বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখতে চাইতেন না। কোহলি যেন এক দিগ্বিজয়ী নৃপতি, যুদ্ধের ময়দান থেকে অন্দরমহল, অর্থনীতি থেকে কূটনীতি সব কিছুতেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ছাপ। বিসিসিআই ইতিহাসের সবচেয়ে হাইপ্রফাইল প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরদিন সৌরভ গাঙ্গুলিও বিরাটকে ‘ভারতীয় ক্রিকেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ বলেছেন, সেটা তো অকারণে নয়!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা