kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১২ রবিউস সানি     

দুই দশকে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট

তামিমের সঙ্গী নাফীস, হাবিবুল-মমিনুলের কেউ নেই

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



তামিমের সঙ্গী নাফীস, হাবিবুল-মমিনুলের কেউ নেই

১০ নভেম্বর দুই দশকে পা রেখেছে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট। এ উপলক্ষেই পেছন ফিরে ইতিহাসের সেরা একাদশ বাছাই করার চেষ্টা। কালের কণ্ঠ’র অনুরোধে সাড়া দিয়ে ১০ সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার নিজেদের সেরা একাদশ গড়েও দিয়েছেন। ধারাবাহিকভাবে ছাপা হচ্ছে তা। মাসুদ পারভেজের করা ১১ পর্বের এই ধারাবাহিকের শেষ দিনে থাকছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সেরা ক্রিকেটার নিয়ে বিশেষ এক আয়োজনও। আজ থাকছে সাবেক অধিনায়ক গাজী আশরাফ হোসেনের সেরা একাদশ

একের পর এক ‘ক্লোজড কল’! কাকে রাখতে গিয়ে কাকে বাদ দেবেন? এ নিয়ে দোটানার মধ্যে বারবার পড়লেও শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটীয় যুক্তি-বিশ্লেষণ দিয়েই উপসংহারে পৌঁছেছেন গাজী আশরাফ হোসেন। টেস্ট ক্রিকেটে দুই দশকে পা দেওয়া বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা একাদশ গড়তে গিয়ে কখনো কখনো তাঁকে যেতে হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন সময়ের তুলনায়ও।

তুলনামূলক সেই বিশ্লেষণ থেকেও কেউ কেউ জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে অধিনায়কের একাদশে। এই যেমন তামিম ইকবালের ওপেনিং পার্টনার খুঁজতে গিয়েই অনেক নামের ভিড়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। তাঁদের কাউকে ছেঁটেছেন ক্রিকেটীয় বিচার-বুদ্ধি দিয়ে। কাউকে বাদ দিয়েছেন সময়ের তুলনায় গিয়ে। গাজী আশরাফের ভাবনায় উঁকি দিলেও এ কারণে বাদ পড়ে যান জাভেদ ওমর, ‘এখনকার দিনে উইকেটে পড়ে থাকলেই শুধু হয় না। পাল্টা আক্রমণও করতে হয়। সেটি না জানলে শুধু রক্ষণ দিয়ে আপনি টিকতে পারবেন না। শটের ভাণ্ডারে হুক-পুলও ছিল না। তাই জাভেদকে একাদশে রাখতে পারলাম না।’

মাথায় এলেও রাখতে পারেননি ইমরুল কায়েস-লিটন দাস-এনামুল হক (বিজয়), কাউকেই। ব্যাখ্যাও দিয়েছেন, ‘ওরা অনেক সুযোগ পেয়েও দলে জায়গা পাকা করতে পারেনি। ইমরুল এত দিন খেলার পরও নয়। অথচ ওদের মতো সুযোগ-সুবিধা পেলে আরেকজন আরো ভালো ব্যাটসম্যান হতে পারত। সে সেই সব সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। কিন্তু যারা বঞ্চিত হয়নি, তারা এর সদ্ব্যবহারও করতে পারেনি।’

গাজী আশরাফের সেরা একাদশে দ্বিতীয় ওপেনার হিসেবে জায়গা করে নেওয়া সেই ‘আরেকজন’ হলেন, ‘শাহরিয়ার নাফীস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ক্লাসিক সেই ইনিংসটির (২০০৬-র এপ্রিলে ফতুল্লা টেস্টে ১৩৮ রান) কথা ভাবুন। ভাবুন অস্ট্রেলিয়ার সেই বোলিং আক্রমণের কথাও। এখনকার যেকোনো বোলিং আক্রমণের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না, ভালো ছাড়া।’

সময় এবং সুযোগ-সুবিধার পার্থক্যের সঙ্গে মুগ্ধতার স্মৃতি যোগ হয়ে গাজী আশরাফের সেরা একাদশে দ্বিতীয় ওপেনার হিসেবে জায়গা করে নেওয়া সেই ‘আরেকজন’ হলেন, ‘শাহরিয়ার নাফীস। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ক্লাসিক সেই ইনিংসটির (২০০৬-র এপ্রিলে ফতুল্লা টেস্টে ১৩৮ রান) কথা ভাবুন। ভাবুন অস্ট্রেলিয়ার সেই বোলিং আক্রমণের কথাও (ব্রেট লি, জেসন গিলেস্পি, শেন ওয়ার্ন, স্টুয়ার্ট ম্যাকগিল)। এখনকার যেকোনো বোলিং আক্রমণের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না, ভালো ছাড়া।’

দেশের মাটিতে স্পিন সহায়ক এবং পেসারদের জন্য সামান্য প্রাণ আছে, এ রকম উইকেটে খেলার কথা ভেবে নিজের একাদশ বেছেছেন গাজী আশরাফ। স্বর্ণ যুগের ওয়েস্ট ইন্ডিজের আদলে ছয়জন খাঁটি ব্যাটসম্যান রেখে একাদশ সাজিয়েছেন তিনি। যেখানে প্রাধান্য দিয়েছেন বিশেষজ্ঞদেরও। তাই এ সাবেক অধিনায়কের একাদশে থাকলেও মুশফিকর রহিম শুধুই ব্যাটসম্যান। যাঁকে ৫ নম্বরেই খেলাতে চান গাজী আশরাফ। তবে ছয়ে থাকা সাকিব আল হাসানেরও এক ধাপ ওপরে ওঠার সুযোগ উন্মুক্ত রেখেছেন তিনি।

ব্যাটিংয়ে মুশফিককে নির্ভার করে দিয়ে গাজী আশরাফ উইকেটের পেছনে দাঁড় করাতে চান তাঁর চোখে বাংলাদেশের সর্বশ্রেষ্ঠ খালেদ মাসুদকে। এখানেও তাঁর যুক্তি ক্রিকেটীয়ই, ‘আমার দলে তিনজন স্পিনার থাকবে। কাজেই স্পিন বলে কট বিহাইন্ড ও স্টাম্পিংয়ের সুযোগ আসবে। মুশফিকের অনেক মিস আছে। তা ছাড়া স্পিন সহায়ক নিচু বাউন্সের উইকেটে কিপিং খুব কঠিনও। অনেক সময় টার্ন বেশি করার কারণে মুশফিক একটু আগেই উঠে বা দাঁড়িয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে বেশি অ্যাথলেটিক, ফিট ও ক্যাচ নেওয়ার সামর্থ্যে পাইলটকেই (মাসুদের ডাকনাম) আমার অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়েছে।’

একটি টেস্ট সেঞ্চুরিরও মালিক মাসুদ ব্যাটিংয়ে নামবেন ৮ নম্বরে। তাঁর ঠিক আগে এবং পরে অফস্পিনার মেহেদী হাসান মিরাজ ও বাঁহাতি স্পিনার মোহাম্মদ রফিক। প্রথমজনের ক্ষেত্রে বিবেচনা, ‘সোহাগ গাজীও মাথায় ছিল। মিরাজ ওর চেয়ে ভালো। সম্প্রতি যারা এসেছে, তারা এখনো পরীক্ষিত নয়। পরীক্ষিতদের মধ্যে সাড়া জাগিয়ে আবির্ভাব মিরাজের। লাইন ও লেংথ নিখুঁত। অসাধারণ ফিল্ডার। ব্যাটিংও জানায় সে আমার অলরাউন্ডারও।’

বহুমুখী বৈশিষ্ট্য রফিককেও অবধারিত করেছে গাজী আশরাফের একাদশে, ‘দারুণ ফিল্ডার। ওর থ্রোয়িংয়ের ভক্ত ছিলাম আমি। ব্যাটিংয়ে টেস্ট সেঞ্চুরিও আছে। আর দেশের উইকেটে ওর আর্ম বলও দারুণ কার্যকর। ওর সোজা বলে এলবিডাব্লিউর সুযোগ তৈরি হয়। আজকালকার মতো আরো কয়েকজন উইকেট নেওয়া বোলার থাকলে রফিক আরো আগ্রাসী হতে পারত।’

গাজী আশরাফ ২০০৯ সালে সব শেষ টেস্ট খেলা মাশরাফি বিন মর্তুজাকে এর আগের সময় বিবেচনায় শুধু দলেই রাখেননি, করেছেন অধিনায়কও, ‘মাশরাফি হয়তো বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার নয়। কিন্তু লাইন ও লেংথের ক্ষেত্রে নিখুঁত ছিল। গ্রেট ফাইটার। কোনো কিছুই যে কাউকে থামিয়ে রাখতে পারে না, ও তার প্রতীক। প্রতীক ও পারফরমার হিসেবে সে আমার দলে। এবং সে আমার অধিনায়কও। গ্রেট মোটিভেটর।’ খুব বেশি বিকল্প না থাকায় এবং দেশের উইকেটের চরিত্র মাথায় রেখে মাশরাফির সঙ্গে দ্বিতীয় পেসার হিসেবে এই সাবেক অধিনায়ক রেখেছেন বাঁহাতি মুস্তাফিজুর রহমানকে, ‘বাংলাদেশে যেহেতু খেলা, উইকেট মন্থর থেকে মন্থরতর হতে থাকবে। প্রথম ইনিংসের জন্য যতটা না, তার চেয়ে বেশি শেষ ইনিংসে আমি মুস্তাফিজের ক্ষুরধার কাটারের ওপর নির্ভর করব।’

যদিও ব্যাটিংয়ের ৩ নম্বরে হাবিবুল বাশার কিংবা মমিনুল হকের ওপর নির্ভর করতে পারেননি গাজী আশরাফ। হাবিবুল বাদ পড়েছেন ‘টেকনিক্যাল’ কারণে, ‘ওর ফ্রন্ট ফুট ল্যান্ডিং ছিল একই জায়গায়। সেটি হোক না অফ স্টাম্পের বাইরের, মিডল স্টাম্পের কিংবা লেগ স্টাম্পের বল। খুব গতির বলে কিংবা ইনসুইংয়ে এলবিডাব্লিউর একটা বড় রকমের সুযোগ থাকে তাই। যখন মানুষ উইকেটের জন্য যাবে, তখন হাবিবুল সহজ শিকার হয়ে যেতে পারে।’

পছন্দের মমিনুলও জায়গা পাননি এ কারণে, ‘টেস্ট খেলোয়াড়ের তকমা লাগিয়ে দেওয়ার পর মনে হচ্ছে আগের সেই মমিনুলকে আর পাচ্ছি না।’ তিনে তাহলে কে? ‘আশরাফুল। সব সময় চাপের মুখে ব্যাটিং করতে না হলে অন্য আশরাফুলকেই আমরা দেখতে পারতাম। দুর্দান্ত ফুটওয়ার্ক ও জমাট ডিফেন্স। দারুণ হুকার এবং পুলারও।’ গাজী আশরাফের একাদশে ৪ নম্বরে ব্যাটিং করবেন আমিনুল ইসলাম, ‘বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অন্যতম সেরা নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান। টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার সময় বয়স কম থাকলে আরো অনেক রেকর্ডই সে গড়তে পারত। অভিষেকে ইতিহাস গড়া সেঞ্চুরিই সে কথা বলে। দারুণ ফুটওয়ার্ক। পেস এবং স্পিন—দুটিই যথেষ্ট ভালো খেলতে পারত। তাই চারে মুশফিককে না পাঠিয়ে বুলবুলকে রেখেছি।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা