kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

কাটারে আর ধার নেই!

সামীউর রহমান, ইন্দোর থেকে   

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



কাটারে আর ধার নেই!

বছর চারেক আগে যে প্রতিপক্ষের কাছে মুস্তাফিজুর রহমান ছিলেন জলজ্যান্ত আতঙ্ক, তাদের কাছে আজ মুস্তাফিজ যেন স্বস্তির প্রতিশব্দ, রহস্য ফুরিয়ে গিয়ে মুস্তাফিজ যেন এক মলাট ছিঁড়ে যাওয়া খোলা বই। ধার কমে গেছে কাটার মাস্টারের। ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজে যাঁকে মনে করা হয়েছে ইশকাপনের টেক্কা, সেই মুস্তাফিজ হয়ে গেছেন চিঁড়েতনের দুরি; বোলিং আক্রমণের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। মুস্তাফিজের ভোঁতা হয়ে যাওয়ার প্রমাণ মিলছে পরিসংখ্যানে, ধরা পড়ছে টিভি ভাষ্যকারদের চোখে। শুধু দেখছেন না দুজন—বাংলাদেশ দলের কোচ ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক। তাঁদের চোখে মুস্তাফিজ এখনো ‘চ্যাম্পিয়ন বোলার’, হিসাবের খাতা বলছে ভারত সফরে মুস্তাফিজ উইকেটশূন্য।

ভারতের মাটিতে খেলার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের যে ক্রিকেটারটির সবচেয়ে বেশি, সেই সাকিব আল হাসান নিষেধাজ্ঞার বেড়াজালে বন্দি। অভিজ্ঞতায় তাঁর পরই মুস্তাফিজ, হায়দরাবাদ সানরাইজার্সের হয়ে একটি মৌসুম দারুণ খেলে হয়েছিলেন আইপিএলের সেরা উঠতি ক্রিকেটার, যে পুরস্কারটি এর আগে পাননি কোনো বিদেশি ক্রিকেটার। সেই মুস্তাফিজ সময়ের সঙ্গে আরো ধারালো ও অভিজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে হয়েছেন বিবর্ণ ও ভোঁতা। গত এক বছরের কাছাকাছি সময়ে খেলা সব শেষ ১০টি টি-টোয়েন্টিতে ৩৩.৪ ওভার বল করেছেন মুস্তাফিজ, রান দিয়েছেন ৩১৫ আর উইকেট পেয়েছেন মাত্র ৯টি। ওভারপিছু রান খরচ করেছেন ৯.৩৫, গড়ে প্রতি ৩৫ ডেলিভারিতে নিয়েছেন ১টি উইকেট, যেখানে একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে একজন বোলারের জন্য বরাদ্দ ২৪টি বৈধ ডেলিভারি। ভারত সফরের তিন ম্যাচের দুটিতেই বোলিং কোটা শেষ করতে পারেননি মুস্তাফিজ, প্রথম ম্যাচে অধিনায়ক তাঁর হাতে দুই ওভারের পর বলই দেননি আর পরের ম্যাচটিতে রোহিত শর্মার বেধড়ক পিটুনিতে বোলিং কোটা শেষ করার আগেই ম্যাচের সমাপ্তি। নাগপুরের শেষ ম্যাচে মুস্তাফিজের একাদশে জায়গা নিয়েই প্রশ্ন উঠলেও কোচ রাসেল ডমিঙ্গোর অবিচল আস্থা, ‘সে (মুস্তাফিজ) একজন ভালো মানের বোলার, ম্যাচ জেতানো বোলার, আমাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ বোলার। সামনেই যেকোনো দিন সে জ্বলে উঠবে।’

গত এক বছরের কাছাকাছি সময়ে খেলা সব শেষ ১০টি টি-টোয়েন্টিতে ৩৩.৪ ওভার বল করেছেন মুস্তাফিজ, রান দিয়েছেন ৩১৫ আর উইকেট পেয়েছেন মাত্র ৯টি। ওভারপিছু রান খরচ করেছেন ৯.৩৫।

সেই এক দিন আসেনি নাগপুরে বরং শিখর ধাওয়ান ও লোকেশ রাহুলরা স্বাচ্ছন্দ্যে খেলেই তাঁর ওভারে মেরেছেন জোড়ায় জোড়ায় বাউন্ডারি। শুধু তা-ই নয়, ভারত সফরে টি-টোয়েন্টিতে শূন্য হাতে সিরিজ শেষ করা মুস্তাফিজ কখনোই ব্যাটসম্যানদের সামনে ছুড়ে দিতে পারেননি চ্যালেঞ্জ, একটা কোনো স্পেল বা ডেলিভারি ছিল না, যেটাতে মনে পড়ে ২০১৫ সালে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ কিংবা ২০১৬-র আইপিএলের ‘ফিজ’কে।

কেন এমন হচ্ছে মুস্তাফিজের? এ প্রশ্নই রেখেছিলাম ইরফান পাঠানের কাছে। স্টার স্পোর্টসের হয়ে ধারাভাষ্য দেওয়ার ফাঁকে ভারতের সাবেক বাঁহাতি পেসার ইরফান পাঠানের পর্যবেক্ষণ, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, ওকে আরো ফুলার লেংথে বল করতে হবে। ওর ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে দেখতে পাই, ও কিন্তু বেশি উইকেট পেয়েছে ফুল লেংথ ডেলিভারি থেকেই। তখন ওর বলের বৈচিত্র্য কাজে লাগে। আরেকটি ব্যাপার যেটা খুব বেশিই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হচ্ছে ও যেন ফলো থ্রুতে নিজের শরীরটাকে ছেড়ে না দেয়। বিশেষ করে ওর যে হাতটিতে বল ধরা নেই (ডান হাত) সে হাতটির ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকছে না। ওর এ জায়গাটা নিয়ে কাজ করতে হবে আর দেখতে হবে ডান হাত যেন ব্যাটসম্যানের দিকে না যায়। সে যদি এটা করতে পারে আর বোলিংটা নিয়ন্ত্রিত হয়, তবেই সে ভালো করবে।’ নতুন বলে মুস্তাফিজ আরো ভালো করতে পারে বলে মনে করেন ইরফান, ‘এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বেশির ভাগ ম্যাচই হয় একেবারে ফ্ল্যাট উইকেটে। তাই এই রকম উইকেটে বোলিং করার জন্য বোলারের ভাণ্ডারে বলের বৈচিত্র্য দরকার। সে তো বেশ কয়েক বছর হয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। এখন কোন ধরনের উইকেটে কিভাবে বোলিং করে সফল হওয়া যায়, সেটা তাকেই আসলে বের করতে হবে।’

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একজন তরুণ পেসার হয়ে ওঠেন ধারালো ও গতিশীল। মুস্তাফিজ যেন পুরোই উল্টো রথের যাত্রী। আবির্ভাবে বাজিমাত করলেও দিন যত গড়িয়েছে, কমেছে গতি আর ধার। ইরফান মনে করেন, বলের বৈচিত্র্য বাড়ালে গতি কম হলেও সফল হওয়া সম্ভব, ‘সে তো বাঁহাতি বোলার, সে যদি সঠিক বোলিং বৈচিত্র্য নিয়ে ১৩৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা গতিতেও বল করে তাহলেও সে সফল হতে পারবে। ওয়াসিম আকরামের বলের গতি কি খুব বেশি ছিল? তাঁর তো বলের গতি ১৫০ কিলোমিটার ছিল না; কিন্তু তাঁর বৈচিত্র্যের জুড়ি ছিল না। আসলে গতিই সব নয়, সঠিক জায়গায় সঠিক লেংথে বল করাটাই আসল। তাকে লেংথের ওপর নিয়ন্ত্রণটা ফিরে পেতে হবে।’

মুস্তাফিজের দুঃসময়ে তাঁর ওপর ভরসা হারাননি মাহমুদ উল্লাহ। ডমিঙ্গোর মতো মাহমুদও মনে করেন, আরো সুযোগ দেওয়া উচিত মুস্তাফিজকে, ‘আমার মনে হয় প্রত্যেক ক্রিকেটারের জীবনেই এমন সময় আসে। যখন চার-পাঁচটি ম্যাচে দল তার কাছ থেকে ভালো কিছু প্রত্যাশা করছে—চাহিদা অনুযায়ী ও যখন পারফরম করতে পারছে না, তখন একটু নতুন করে ভাবা উচিত। দল হিসেবে ওর পাশে থাকা উচিত। ও অনেক কষ্ট করছে, কোচের সঙ্গে কাজ করছে, আমার মনে হয় যেকোনো এক ম্যাচেই সে (আগের চেহারায়) ফিরতে পারবে।’

সেই এক দিন স্বপ্নের দিনের প্রত্যাশায় যে কতগুলো বিবর্ণ দিন চলে যাচ্ছে, সেই হিসাবটি শুধু ভারীই হচ্ছে। সেই সঙ্গে গুঞ্জন থেকে বড় হয়ে অপ্রিয় প্রশ্নতে রূপান্তরিত হয়েছে কথাটি। ‘ফিজ’ কবে বোলিংয়ের সেই ধার ফিরে পাবেন?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা