kalerkantho

সোমবার । ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১১ রবিউস সানি ১৪৪১     

নাঈমের জন্য আক্ষেপ মাহমুদের

১২ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নাঈমের জন্য আক্ষেপ মাহমুদের

তারুণ্যের উদ্ধত সাহস আর অভিজ্ঞদের জরাগ্রস্ততা, নভেম্বরের নাগপুর দেখাল দুই-ই। একদিকে নাঈম শেখের দুঃসাহস, অন্যদিকে মাহমুদ উল্লাহ ও মুশফিকুর রহিমের অবিমৃশ্যকারিতা। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্যারিয়ারের মাত্রই তৃতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নামা নাঈম স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন নাগপুরের দর্শকদের, একই ম্যাচে এক দশকেরও বেশি সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাটিয়ে দেওয়া বর্তমান ও সাবেক অধিনায়ক দেখালেন, অসম্ভব এক হারকে সম্ভব করে তোলার যে পারদর্শিতা তাঁরা দেখিয়েছিলেন বেঙ্গালুরুতে; দিল্লির জয়েও সেই ভূত তাঁদের ছেড়ে যায়নি!

নয় নয় করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কম সময় পার করেননি লিটন দাস ও সৌম্য সরকার। প্রতিভাবান তকমার জোরে সুযোগও পেয়েছেন ঢের, যদিও প্রত্যাশা মিটিয়েছেন সামান্যই। নাঈম শেখকে নিয়ে স্তুতিবাক্যের ফুলঝুরি ছোটাতে খুব একটা শোনা যায়নি কাউকে। বরং পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মতোই এই সিরিজে তাঁর দলে ঢুকে পড়া। পারিবারিক সমস্যায় তামিম ইকবাল সরে দাঁড়ালে তাঁর বদলি হিসেবে দলে ঢুকে পড়েন ‘এ’ দলের হয়ে ভালো করা এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান। লিজেন্ডস অব রূপগঞ্জের হয়ে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে অভিষেক মৌসুমেই ১৬ ম্যাচে ৮০৭ রান করা নাঈমের কাছে তাই ছিল না কোনো বাড়তি প্রত্যাশা। অথচ নিজের প্রথম সিরিজেই নাঈমের ব্যাটে প্রতিশ্রুতির ছাপ। ভারতের বিপক্ষে শেষ টি-টোয়েন্টিতে, দীপক চাহারের পর পর দুটো বলে লিটন ও সৌম্যর বিদায়ের পর যদি নাঈমও অল্পতেই বিদায় নিতেন, তাহলে কেউ তাঁকে চড়াত না সমালোচনার শূলে। কিন্তু নাঈম এত দ্রুত রণে ভঙ্গ দিতে চাননি। পরদিনই তাঁকে ধরতে হবে দেশে ফেরার বিমান, তামিম ইকবাল ফিরলে না জানি আরেকটা সুযোগের জন্য কত দিনের অপেক্ষা; এত সব ভাবনার ভিড়েও তাঁর ব্যাটটা কথা বলল প্রতিরোধের ভাষায়। শুরুর খানিকটা জড়তা আর আড়ষ্টতা কাটিয়ে চোখধাঁধানো সব শটের প্রদর্শনী মেলে বিদর্ভ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের স্টেডিয়ামে নিস্তব্ধতা নামিয়ে আনেন নাঈম। আড়মোড়া ভেঙেছেন যুযবেন্দ্র চাহালের প্রথম তিন বলেই টানা তিন বাউন্ডারি মেরে। রাজকোটে মুশফিক চাহালের প্রথম বলেই স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন মিড উইকেটে, নাগপুরে নাঈম বলটা সীমানা ছাড়া করেন চাহালের মাথার ওপর দিয়ে। এরপর আরো দুটো চার। প্রতিপক্ষের সেরা বোলারটিকেই এভাবে অভ্যর্থনা করা নাঈম পরের ওভার করতে আশা শিভম দুবেকেও স্বাগতম জানান প্রথম দুটো বলে বাউন্ডারি মেরে। ৩৪ বলে পৌঁছে যান ক্যারিয়ারের প্রথম অর্ধশতকে, তাতে সাতটি বাউন্ডারি আর এক ছক্কার মার। ম্যাচের ১৩তম ওভারে, ক্রিকইনফোর ম্যাচ প্রেডিক্টর বলছে বাংলাদেশের জয়ের সম্ভাবনা ৭৮%। সেখান থেকে বাংলাদেশের ৩০ রানের হার, ১৪৪ রানে অল আউট হওয়ার দায়টা সবচেয়ে বেশি বর্তায় দলে উপস্থিত তথাকথিত ‘পঞ্চপাণ্ডব’-এর দুই পরমাত্মীয়, মুশফিক ও মাহমুদের ওপরই। মিথুনের বিদায়ের পর মুশফিক এসে শিভম দুবের মতো অনিয়মিত বোলারের বলে যেভাবে প্লেড-অন হলেন, তাতেই পাল্লাটা হেলে গেল ভারতের দিকে। পরের বলে আফিফ হোসেনের বিদায় আরো গভীর করল সংকট, তারপর সেই চেনা দৃশ্যের মতোই জয়ের সম্ভাবনা জাগিয়ে হারের চিত্রনাট্য লেখার পুরনো অভ্যেস।

দলে নতুন আসা নাঈম জ্যেষ্ঠদের ব্যর্থতার দিকে প্রকাশ্যেই আঙুল তোলার মতো অর্বাচীন নন, তবে হতাশা একেবারে গোপনও করেননি, ‘আরেকটা জুটি হলে আমরা জিততে পারতাম। ছোট একটা জুটি হলেও সুযোগ ছিল। শতরানের জন্য খেলিনি, দলকে জেতাবার জন্য খেলেছি। বেশি রান করেছি বা সর্বোচ্চ রান করেছি এসব নিয়ে ভাবছি না।’ নাঈমের আক্ষেপ ম্যাচটা শেষ করে আসতে না পারাতেই হারতে হলো সিরিজ, ‘আমাদের দুজনের কথা হচ্ছিল, শেষ করলে আমাদেরই শেষ করে আসতে হবে। পেছনের দিকে যেন না যাই, আমাদেরকেই শেষ করতে হবে।’ শেষ পর্যন্ত কথাটা রাখতে পারেননি নাঈম, আউট হয়েছেন দুবেরই বলে যেটা নাঈমের ভাষায়, ‘বলটা আমার কাছে মনে হয়েছে ওদের ইনিংসেরই সেরা বল।’

নাঈমের আক্ষেপ তো আছেই, তাঁর এই অনবদ্য ইনিংসটাকে জয়ের মালায় সাজাতে না পারা সতীর্থরাও পুড়ছেন অনুতাপে। মাহমুদ সরাসরি মেনে নিয়েছেন, ‘এই ম্যাচে (তৃতীয় টি-টোয়েন্টি) আমরা ব্যর্থ হয়েছি। আমাদের সুযোগ থাকলেও আমরা করতে পারিনি। নাঈম খুবই দৃষ্টিনন্দন একটা ইনিংস খেলেছে। আমার খারাপ লাগছে যে আমরা ম্যাচটা শেষ করে আসতে পারলাম না, ওর জন্য খারাপ লাগছে। আমরা ওর জন্য হলেও যদি ম্যাচটা শেষ করে আসতাম, তাহলে ওর অনেক কৃতিত্ব হতো।’

দেশের ক্রিকেট অঙ্গনকে টালমাটাল করে দেওয়া আট দিনের পর ভারত সফরে এসে টি-টোয়েন্টি সিরিজ জেতার মতো জায়গায় চলে যাওয়া, এটাকে কৃতিত্ব হিসেবে দেখার সুযোগ যেমন আছে, তেমনি ভারতের বিপক্ষে জয়ের দোরগোড়া থেকে পথ হারানোর পুরনো রোগের পুনরাবৃত্তি পিছু ছাড়েনি এবারও। সিরিজে বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি আল আমিন হোসেন ও শফিউল ইসলামের বোলিং, সেই সঙ্গে টপ অর্ডারে নাঈমের ব্যাটিং। মাহমুদের সুরে সুর মিলিয়ে নির্বাচক হাবিবুল বাশারও নাঈমকে দেখছেন আগামীর সম্ভাবনা হিসেবে, ‘নাঈমের রান করাটা শুভ লক্ষণ, দুই বছর ধরে সে হাইপারফরম্যান্স দলের সঙ্গে আছে। এত তাড়াতাড়ি কিছু বলা কঠিন, তবে মনে হচ্ছে এত দিন ধরে নাঈমের ওপর যে বিনিয়োগটা করা হয়েছে, সেটা ফেরত আসবে।’

প্রতিভাবান তকমাটা গায়ে লেগে গেলেই কেন যেন পারফরম্যান্সে ভাটার টান পড়ে অনেক ক্রিকেটারের! নাঈম আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শুরুর গতিটা পেয়ে গেছেন। এখন কিভাবে তিনি এগোবেন সেটা পুরোটাই তাঁর আত্মনিবেদন আর পরিশ্রমের ওপর। তবে যা-ই হোক, টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের সেরা ব্যাটিং ইনিংসগুলোর তালিকায় ভারতের বিপক্ষে নাঈমের নাগপুরের ইনিংসটা যে ওপরের দিকেই থাকবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহই নেই।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা