kalerkantho

বুধবার । ১৩ মাঘ ১৪২৭। ২৭ জানুয়ারি ২০২১। ১৩ জমাদিউস সানি ১৪৪২

দুই দশকে বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেট

সাকিব, তামিম, মুশফিকের সঙ্গে আশরাফুলও

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



অদ্ভুত এক বিভ্রম তাঁর যাচ্ছিল না কিছুতেই! গত প্রায় দুই দশকে বাংলাদেশের হয়ে টেস্ট খেলা ৯৫ জন ক্রিকেটারের মধ্য থেকে সেরা একাদশ বেছে নেওয়ার পরও রকিবুল হাসানের মনে হচ্ছিল, আসলে সব মিলিয়ে খেলোয়াড়ের সংখ্যা হয়ে গেছে ১২ জন! বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অধিনায়কের এমন ধন্দে পড়ে যাওয়ার কারণ সাকিব আল হাসান, ‘সে সব সময় একই সঙ্গে দুজন খেলোয়াড়ের প্রতিনিধিত্ব করে। ওর পারফরম্যান্স সে কথাই বলে।’

সে জন্যই নিষেধাজ্ঞায় এক বছরের জন্য বাইরে ছিটকে পড়া সাকিবের বিকল্প ভাবতে গিয়ে গলদঘর্ম হতে হয়েছে জাতীয় নির্বাচকদেরও। এই অলরাউন্ডার না থাকলে যে দলে নিতে হয় দুজন ক্রিকেটারকে! রকিবুলের অবশ্য কখনো কখনো সাকিবকে এমনও মনে হয়, “বাংলাদেশ ক্রিকেটের এক বিপ্লবের নাম সাকিব। এক দশক ধরে কোনো না কোনো ফরম্যাটে সে এক নম্বর অলরাউন্ডার ছিল। সব ফরম্যাটের জন্যই ওকে আমার ‘থ্রি ইন ওয়ান’ মনে হয়। ব্যাটিং-বোলিংয়ের বাইরে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবেও নিজেকে প্রমাণ করেছে।”

তবে সাকিব নন, নিজের সেরা একাদশের অধিনায়ক হিসেবে মাশরাফি বিন মর্তুজাকেই বেছে নিয়েছেন রকিবুল। এর আগে পারফরমার হিসেবেও দলে ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’-এর জায়গা অবধারিত বলেই মনে করেছেন তিনি, ‘ওর টেস্ট ক্যারিয়ার চোটের কারণে অত বড় না হলেও মাশরাফি এমন এক বোলার ছিল, ওর উচ্চতার সুবিধা সে পুরোপুরি নিয়েছে। ওর লাইন-লেন্থও ভালো ছিল খুব। সব সময় ওর কাছ থেকে ব্রেক থ্রুও পাওয়া যেত। আউট সুইং-ইন সুইং, নিয়ন্ত্রণ ছিল দুটোর ওপরই।’

সেই সঙ্গে মাশরাফির নেতৃত্বগুণও তুলে ধরলেন রকিবুল, ‘ওর কল্পনাশক্তি, শৃঙ্খলা, খেলা নিয়ে ভাবনা এবং মাঠের মধ্যে প্রভাববিস্তারী উপস্থিতি মিলিয়ে আমি অধিনায়কত্বের ব্যাটন মাশরাফির হাতেই দিচ্ছি।’ মাশরাফির নেতৃত্বে দুজন করে খাঁটি পেসার ও স্পিনারের সঙ্গে অলরাউন্ডার সাকিবকে যোগ করে বোলিং বিভাগ স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে চেয়েছেন স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। যে একাদশে তামিম ইকবালের ওপেনিং সঙ্গী হিসেবে তিনি বেছে নিয়েছেন ইমরুল কায়েসকে।

নিতে গিয়ে খুব বেশি ভাবনারও অবকাশ পাননি ম্যাচ রেফারি হিসেবে এখনো ক্রিকেটের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত এই সাবেক ক্রিকেটার, ‘টেস্ট ব্যাটসম্যান হিসেবে ইমরুলের বড় বড় পার্টনারশিপ ও সেঞ্চুরি আছে। টেম্পারমেন্টও খুব ভালো। আমি এখানে আর কাউকে তুলনায়ই আনতে চাইনি।’ দ্বিতীয় ওপেনার নিয়ে তেমন ভাবতে না হলেও ব্যাটিং অর্ডারে মহাগুরুত্বপূর্ণ তিন নম্বরে কাকে রাখবেন, তা নিয়েই সবচেয়ে বেশি যুক্তি-পাল্টাযুক্তি দাঁড় করাতে হয়েছে রকিবুলকে, ‘মমিনুল নাকি হাবিবুল? সেটি ঠিক করাই মুশকিল হয়ে পড়েছিল।’

অবশেষে এই যুক্তিতেই মমিনুলের পক্ষে ভোট পড়েছে তাঁর, ‘রেকর্ডও হাবিবুলের পক্ষে কম কথা বলছে না। তবে ওরা দুজন যে দশকে খেলেছে, সেটি দিয়েই আমি পার্থক্য বের করে ফেলেছি। মমিনুল এমন এক যুগে খেলা শুরু করেছে, যখন ক্রিকেট বৈজ্ঞানিক হয়ে গেছে। আগের দশকের তুলনায় অনেক কঠিনও হয়ে গেছে খেলাটি। এখন প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের শক্তি-দুর্বলতা খুব সহজেই বেরিয়ে যায়। মমিনুলের ধারাবাহিকতা এই কঠিন সময়েই। হাবিবুল কাছাকাছি থাকলেও মমিনুলের আটটি সেঞ্চুরি, ওর রেকর্ড ও গড় চিন্তা করে ওকেই নিয়েছি।’

ব্যাটিংয়ের চারেও দুটো নাম ভেবেছিলেন। তবে সেখানে ভাবনা হাবিবুল-মমিনুলের মতো বেশিক্ষণ আটকে থাকেনি, ‘চার নম্বরে বুলবুলও (আমিনুল ইসলাম) আমার ভাবনায় এসেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান বেশি দিন খেলতে পারেনি। তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আমি ওকে চারে আনতে পারিনি।’ যাঁকে এনেছেন, সেই মোহাম্মদ আশরাফুল এগিয়ে থেকেছেন অনেক বিবেচনায়ই, ‘ওর উপস্থিতি বিশ্বক্রিকেটে বাংলাদেশকে পরিচিতি এনে দিয়েছে। পারফরমার আশরাফুলের বড় গুণ হলো ও সব সময় বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে খেলেছে। অভিষেকেই মুরালিধরন-ভাসদের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেছে। অনিল কুম্বলে-জহির খানদের সামলে বড় সেঞ্চুরিও (১৫৮) করেছে। এসব ইনিংস খেলতে যে সাহস ও মানসিকতা লাগে, এর সবই ওর ছিল।’

রকিবুল ব্যাটিংয়ের পাঁচ ও ছয়ে নামাবেন সাকিব এবং মুশফিকুর রহিমকে। কিপিং যখন করছেন না, তখন মুশফিককে এত পেছনে নামানোর ব্যাখ্যায় বললেন, “ওকে আমি ছয়ে নামাচ্ছি যাতে সে ওই সময়ে উইকেটে গিয়ে ইনিংসটি গড়তে পারে। ওর নামই হয়ে গেছে ‘মিস্টার ডিপেন্ডেবল’। এ রকম নির্ভরশীল ব্যাটসম্যানকে ওখানেই কাজে লাগাতে চাই আমি।” এই সাবেক অধিনায়কের দলের উইকেটরক্ষক খালেদ মাসুদ নামবেন সাত নম্বরে, ‘আমার দেখা বাংলাদেশের সবচেয়ে ভালো উইকেটরক্ষ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওর টেস্ট সেঞ্চুরিও আছে। অর্থাৎ সে ব্যাটিংয়েও অবদান রাখতে পারবে।’

বোলিংয়ে একজন অফস্পিনারও রেখেছেন রকিবুল, ‘এখনকার দিনে প্রতিপক্ষে অনেক বাঁহাতি ব্যাটসম্যান থাকে। এ ক্ষেত্রে অফস্পিনাররা খুব কার্যকরও হয়। তবে সে বিবেচনায় নয়, যোগ্যতায়ই আমার দলে মিরাজ থাকছে। ওর হৈচৈ ফেলে দেওয়া অভিষেক, ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পারফরম্যান্স এই স্পিনারের যোগ্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।’ স্পিন বিভাগে রকিবুল সাকিব-মিরাজদের সঙ্গী বানিয়েছেন টেস্টে ১০০ উইকেট পাওয়া প্রথম বাংলাদেশি বোলার মোহাম্মদ রফিককেও, ‘সবচেয়ে নিখুঁত বাঁহাতি স্পিনার। ওর দুটো প্রধান অস্ত্র-আর্ম বল ও বৈচিত্র্যময় স্পিন। লোয়ার অর্ডারে ওর ব্যাটিংও বাড়তি সুবিধা।’

পেস বোলিংয়ে মাশরাফির সঙ্গী বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ডানহাতি-বাঁহাতি কম্বিনেশন খুঁজে নিতে চাওয়া রকিবুল শেষ পর্যন্ত মুস্তাফিজুর রহমান ছাড়া কোনো বিকল্পও পাননি, ‘মুস্তাফিজের জায়গায় ভাবনায় এমন কেউ আসেনি, যে কিনা আমাকে খুব বেশি নাড়া দিতে পেরেছে।’ মুস্তাফিজই বরং নানা কারণে উঠে এসেছেন সেরা পছন্দে, ‘ও এসে বাংলাদেশের পেস বোলিংকে কিন্তু একটি উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইদানীংকালে ওর ইনকামিং বলটি হচ্ছে না। তবে ওর যে কাটার এবং গতি, আমি বলব মুস্তাফিজ প্রতিপক্ষের জন্য ভীতির সঞ্চার করতে পেরেছে। অন্য দলগুলো যখন বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলেছে, ওরা মুস্তাফিজকে নিয়ে গবেষণা করেছে।’

গবেষণা করে সেরা একাদশ দাঁড় করানোর পর ‘টু ইন ওয়ান’ সাকিবের জন্যই এটিকে ১২ জনের দল বলে মনে হচ্ছিল রকিবুলের!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা