kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

উত্তরের খোঁজে বাংলাদেশ

১০ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



উত্তরের খোঁজে বাংলাদেশ

দাবা আর লেগস্পিনের পাশাপাশি আরেকটা কাজে যুযবেন্দ্র চাহাল দারুণ দক্ষ। সেটা হচ্ছে উপস্থাপনা! বিসিসিআইর ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর জন্য সতীর্থের সাক্ষাৎকার নেন চাহাল, যেটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘চাহাল টিভি’ নামে। রাজকোটের ম্যাচের পর ‘চাহাল টিভি’তে রোহিত যা বললেন, তার সঙ্গে কাল সংবাদ সম্মেলনে আসা রাসেল ডমিঙ্গোর কথাবার্তার বিস্তর অমিল। মতপার্থক্য থাকতেই পারে। তবে যখন গোঁজামিলের অঙ্ক জোর করে মেলাবার চেষ্টা করা হয়, আপত্তি সেখানেই। কারণ চিকিৎসা শুরুর প্রথম ধাপটা তো রোগটাকে স্বীকার করা। অথচ বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক ও কোচ—কেউই মানতে চাইছেন না যে টি-টোয়েন্টি ম্যাচে বাংলাদেশের ইনিংসগুলোতে ডট বলের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেশি।

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক মাহমুদ উল্লাহ দ্বিতীয় টি-টোয়েন্টির পর বলেছিলেন, ম্যাচে ৪০টা পর্যন্ত ডট বল কোনো সমস্যা নয়। কাল রাসেল ডমিঙ্গোও একই কথা বললেন, ‘একটা টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৩৮টা ডট বল একেবারে খারাপ নয়। ৪০-এর নিচে থাকলে সেটা নিয়ে ভাবনার কিছু নেই।’ এবার তাকানো যাক একই সময়ে পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তে ঘটে যাওয়া কিছু টি-টোয়েন্টি ম্যাচের দিকে। ৮ তারিখে নেপিয়ারে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৩ উইকেটে ২৪১ রান করে ইংল্যান্ড, যা এখন পর্যন্ত টি-টোয়েন্টির সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ। এমন ম্যাচেও ইংল্যান্ডের ইনিংসে ডট বলের সংখ্যা ৩৩টি। অন্যদিকে ইনিংসে বাউন্ডারির সংখ্যার দিকে চোখ ফেরানো যাক। ইংল্যান্ডের ইনিংসে স্রেফ ছয়ের সংখ্যাই ছিল ১৫, আর ভারতের বিপক্ষে রাজকোটে ৩৮টা ডট বল দেওয়া বাংলাদেশের ইনিংসে ছক্কা মাত্র একটি! বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যে অবলীলায় ছয় মারতে পারেন না, সেটা ভালো করেই জানা আছে ডমিঙ্গোর, ‘আমার মনে হয় বাংলাদেশ কখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজ বা ইংল্যান্ডের মতো টি-টোয়েন্টি দল হতে পারবে না, যারা অবলীলায় বল মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিতে পারে। শারীরিকভাবে আমরা সেই ধরনের দল নই। আফিফ, মোসাদ্দেক, লিটন এরা সবাই ছোটখাটো গড়নের ছেলে। তবে আমরা চেষ্টা করছি বলের গতিটা কাজে লাগাতে, দৌড়ে বেশি রান নিতে, বল ফাঁকা জায়গায় ফেলে দৌড়ে দুই রান নিতে। ওভারের সব বলে দুই রান করে নিলে সেটাও তো দুটো রানের সমান।’ তবে কল্পনার ভেলায় ভাসতে থাকা ডমিঙ্গো হয়তো ভুলে গেছেন, খেলাটা ল্যাপটপে নয়, মাঠে হয়। এখানে ঐকিক নিয়মে কিছু হয় না! এভাবে বলে বলে রান নেওয়া আর এককে দুইয়ে বদলে ফেলার গল্প বলে ডমিঙ্গো যখন মিনিট তিনেকের মাথায় ৪০ আর ৩৮-এর মাঝে মাত্র ২-এর বিপজ্জনক ফারাক জেনেও বলেন, ‘সংখ্যাটা ৪০-এর নিচে হলে খুব একটা খারাপ নয়’, তখন সেটা গোঁজামিলই মনে হয়।

রোগের ‘চিকিৎসক’ নতুন হলেও রোগটা পুরনো। বছর দেড়েক আগে, রোহিত শর্মার ভারতের বিপক্ষে নিদাহাস ট্রফিতে ভারতের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ১২০ বলের ভেতর দিয়েছিলেন ৫৫টা ডট বল। তখনো সাকিবের অবর্তমানে দলের অধিনায়ক ছিলেন মাহমুদই, ভারতের বোলারদের ভেতর যুযবেন্দ্র চাহাল, ওয়াশিংটন সুন্দররাও ছিলেন সেদিনের ম্যাচে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ব্লুফন্টেইনের ম্যাচে ১৯৬ রানের জয়ের লক্ষ্য তাড়া করে কাছে গিয়েও ২০ রানে হারের পেছনে ৪৫টা ডট বলের দায় কম নয়। এমনকি বেঙ্গালুরুর সেই হৃদয়ভাঙা ম্যাচেও মাত্র ১৪৬ রান তাড়ায় বাংলাদেশের ইনিংসে ছিল ৫০টি ডট বল!

ফিরে আসা যাক ‘চাহাল টিভি’তে প্রচারিত রোহিতের সাক্ষাৎকারে। ক্যারিবীয়দের মতো গায়ের জোরে নয় বরং রোহিত ছয় মারেন ক্রিকেটের ব্যাকরণ মেনেই। এর পরও তাঁর ব্যাটে লেগে উড়ে যাওয়া বল ছোটে রকেটের মতোই! সতীর্থ চাহালের কাছে খোলামেলা আলাপেই রোহিত বলছিলেন, ‘ছয় মারার জন্য প্রচণ্ড পেশিবহুল হতে হবে কিংবা গায়ে খুব জোর থাকতে হবে এ রকম কিছুই নয়। টাইমিংটা ঠিকঠাক হতে হবে আর বলটা ব্যাটের একদম মাঝ বরাবর লাগতে হবে। মাথা সোজা থাকবে, শরীর সঠিক জায়গায় থাকবে। ভালো উইকেটে এ ব্যাপারগুলো খেয়াল রাখলেই যে কেউ ছয় মারতে পারবে।’ তবে সারা বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা যেখানে অনুশীলন করেন, সেই মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটের উইকেটকে আর যা-ই হোক, ‘ভালো’ বলার উপায় নেই! তাই বাংলাদেশি ব্যাটসম্যানদের ছয় মারতে অনেক কিছুর সঙ্গে ভাগ্যটাও লাগে। রাজকোটের মতো বড় পরিধির মাঠে যেটা ছিল না বাংলাদেশের পক্ষে। আশঙ্কার জায়গাটা হচ্ছে, নাগপুরের বিদর্ভ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেটটাও রাজকোটের প্রায় কার্বন কপি এবং মাঠের পরিসীমাও কাছাকাছি!

ছাত্ররা তাই শিখবে, হেডমাস্টার যা শেখাবেন। তাই ডমিঙ্গো যেটা ভুল মনে করছেন না, মাহমুদেরও সেটা ভুল মনে না করাটাই স্বাভাবিক। তবে সমস্যাটা হচ্ছে, ডমিঙ্গো ডট বলের সংখ্যাটা মাপছেন বৈশ্বিক মানদণ্ডে আর রান করার সামর্থ্যটা মাপছেন বাংলাদেশি দাঁড়িপাল্লায়। শক্তির এ তারতম্য ঘোচাতেই ইনিংসে বাড়াতে হবে এক ও দুই রানের সংখ্যা, যেভাবে শারীরিক শক্তিতে অনেকের চেয়ে পিছিয়ে থাকেও রানের খাতায় পিছিয়ে নেই বিরাট কোহলি। তা না হলে নিজেদের সামর্থ্যের চেয়ে প্রতিপক্ষের ব্যর্থতা, উইকেটের চরিত্র, টস ভাগ্যসহ অনেকগুলো দৈব ব্যাপারের ওপরই নির্ভর করবে বাংলাদেশের সাফল্য।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা