kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

অহিংসার শহরে সিংহের দর্শন

৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



অহিংসার শহরে সিংহের দর্শন

নাগপুর থেকে প্রতিনিধি : ক্লান্ত শরীর আর সামনে অনিশ্চিত যাত্রার শঙ্কা নিয়ে আহমেদাবাদের সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বিমানবন্দরে যখন কয়েক দিন আগে দিল্লি থেকে প্রায় মাঝরাতে উপস্থিত হয়েছিলাম, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই দেয়ালচিত্রের দিকে চেয়ে দেখার সময় হয়নি। একই বিমানবন্দরে কাল ভোরবেলায় এসে, নাগপুরের ফ্লাইটের অপেক্ষায় ভেতরে পায়চারি করতে করতে দেয়ালচিত্রগুলো দেখার পর মেলালাম নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে। বিমানবন্দরের গুজরাট রাজ্যের ব্র্যান্ডিং করতে যে দুটি ‘আইকন’ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, আপাতদৃষ্টিতে তাদের ভেতর সম্পর্কের সেতু স্থাপন করা কঠিন। সিংহ এবং মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী, গুজরাট আসলে এই দুটি কারণেই ভারতের অন্য সব জায়গার চেয়ে আলাদা। এশিয়া মহাদেশে সিংহের একমাত্র আবাসস্থল হচ্ছে গুজরাটের গির ন্যাশনাল পার্ক, যেখানে সংরক্ষণ করা হচ্ছে পশুরাজের বিপন্ন এই প্রজাতিকে। হিংস্র প্রাণীর আবাসস্থল যে রাজ্যে, সেখানেই জন্ম ও বেড়ে ওঠা অহিংসার চর্চা করা মহাত্মা গান্ধীর।

করমচাঁদ গান্ধী ও পুতলি বাঈয়ের চতুর্থ সন্তান মোহনদাস কিভাবে একজন সাধারণ আইনজীবী থেকে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা হয়ে উঠলেন, সেই ইতিহাসই ধাপে ধাপে সাজিয়ে রাখা হয়েছে রাজকোটের গান্ধী স্মৃতি জাদুঘরে। যে স্কুলে তৃতীয় থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন ‘বাপু’, সেই স্কুলের ভবনটিকেই বদলে ফেলা হয়েছে জাদুঘরে। একেকটা ঘরে মহাত্মা গান্ধীর জীবনের এক একটা অধ্যায় নিয়ে ছবি, অডিও ভিজ্যুয়াল। চোখের সামনে দেখছিলাম তরুণ আইনজীবী মোহনদাসকে, যে লন্ডন থেকে ওকালতি পড়ে এসে দেশে রাজকোটে পসার জমাতে না পেরে পাড়ি দিয়েছিল বোম্বেতে। পরিবারের খরচ জোগাতে সেখানে তাঁকে করতে হয়েছে খণ্ডকালীন শিক্ষকতাও। লাজুক মোহনদাস আইনি সওয়াল জওয়াবের চাইতে মানুষের হয়ে সরকারের কাছে আরজি লিখে দিতেই বেশি পারঙ্গম ছিলেন। মহাত্মা গান্ধী বলতেই ধুতি পরা লাঠি হাতের যে মানুষটির কথা চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বিলেতফেরত ব্যারিস্টার হিসেবে স্যুট কোট পরা মানুষটির ছবি দেখে দুজনকে মেলানো যায় না। দেখতে দেখতে চলে এলাম সেই কক্ষে, যেখানে অ্যানিমেশনের মাধ্যমে দেখানো হচ্ছিল পিটারমারিজবার্গ রেলস্টেশনের সেই ঘটনা। স্রেফ গায়ের রং কালো হওয়ার কারণে প্রথম শ্রেণির কামরার টিকিটধারী যাত্রী হওয়ার পরও সেখানে গান্ধীজিকে কামরা থেকে বের করে দিয়েছিল ইউরোপিয়ান যাত্রীরা। সারা রাত ঠাণ্ডায় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে কাঁপতে কাঁপতেই গান্ধী প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, এই বর্ণপ্রথার শেষটা তিনি দেখে ছাড়বেন। সিংহের আবাসভূমির কাছাকাছি জন্মেছিলেন বলেই কি এই সাহসটা দেখাতে পেরেছিলেন মহাত্মা?

একই দিনে অহিংস আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং সবচেয়ে হিংস্র প্রাণী, দুই-ই দেখার সুযোগ হয়েছে রাজকোটে। শহর থেকে একটু দূরেই প্রদ্যুম্ন ন্যাশনাল পার্ক। সেখানেই প্রাকৃতিক পরিবেশে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে এশিয়ান সিংহসহ অনেক রকম বন্য প্রাণী। আছে লেপার্ড বা চিতাবাঘ, সাইবেরিয়ার সাদাবাঘ, রয়াল বেঙ্গল টাইগারসহ আরো অনেক রকম বন্য প্রাণীই। তবে মুক্ত পরিবেশে চারটি সিংহের হুটোপুটি, খুনসুটির পর যখন দূর থেকে ভেসে আসা গর্জন শুনতে পেলাম, তখনই বুঝলাম পশুরাজ নামকরণের মাহাত্ম্য!

সব মিলিয়ে গুজরাট যেন অদ্ভুত এক বৈপরীত্যের রাজ্য। শহরের বেশির ভাগ বাসিন্দা নিরামিষভোজী, মাছ মাংস তো দূরে থাক সকালের নাশতায় একটা ডিমের খোঁজও মেলেনি রাজকোট কিংবা আহমেদাবাদে। ভারতের একমাত্র রাজ্য গুজরাট, যেখানে মদ বিক্রি আইন করে নিষিদ্ধ। অথচ সেই শহরের প্রবেশদ্বারে সিংহের ছবি, ক্রিকেটদলের প্রতীকেও সিংহ। সে জন্যই বোধহয় নিরামিষভোজী নিরীহ মানুষগুলোই আবার ধর্মের নামে হয়ে ওঠে সিংহের মতোই হিংস্র। হিন্দু-মুসলমান জাতিগত দাঙ্গায় এই রাজ্যে যত মানুষ মরেছে, যত সহিংস ঘটনা হয়েছে, তেমনটা আর কোথাও হয়নি। একটা জায়গায় অবশ্য গান্ধীর আদর্শ আর গির অভয়ারণ্যের সিংহ, দুটোরই খুব মিল। দুটোই বিপন্ন। মহাত্মা গান্ধীর অহিংসা আর ত্যাগের আদর্শ ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকে অনেকটাই উধাও। গির অভয়ারণ্যের সিংহও কমে মাত্র ৬৫০টিতে এসে ঠেকেছে। কিছুদিন পর হয়তো সিংহ শুধু শোভা পাবে দেয়ালচিত্রেই, আর মহাত্মা গান্ধী তো দেয়ালে ছবি হয়ে ঝুলছেন সেই কবে থেকেই!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা