kalerkantho

রবিবার। ১৭ নভেম্বর ২০১৯। ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

পূজারা পরিবারের ক্রিকেট পাঠশালা

সামীউর রহমান, রাজকোট থেকে   

৮ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পূজারা পরিবারের ক্রিকেট পাঠশালা

রাজকোটের পূজারা পরিবারের তিন সদস্য প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন রঞ্জি ট্রফিতে। চেতেশ্বরের বাবা অরভিন্দ পূজারা ছয়টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন, চাচা বিপিনও খেলেছেন ৩৬টি ম্যাচ। দুই ভাইয়ের কেউ জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে না পারলেও তাঁদের পরের প্রজন্মের চেতেশ্বর ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন ভারতীয় দলে।

সীমিত ওভারের ক্রিকেটের বিনোদনের দুনিয়াকে এড়িয়ে সাদা পোশাক আর লাল বলের শুদ্ধ ক্রিকেটকেই বেছে নিয়েছেন চেতেশ্বর পূজারা। গ্যালারি মাতানো, চোখ-ধাঁধানো সব শটের পসরা হয়তো তাঁর ব্যাটে নেই; আছে ধৈর্যশক্তি আর উইকেট বিলিয়ে না দেওয়ার দৃঢ় ইচ্ছা। সৌরাষ্ট্রের এই ক্রিকেটার নিজের শহর রাজকোটে গড়ে তুলেছেন একটি ক্রিকেট একাডেমি, যেখানে বিনা পয়সায় দেওয়া হচ্ছে ক্রিকেটের পাঠ।

রাজকোটের পূজারা পরিবারের তিন সদস্য প্রদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন রঞ্জি ট্রফিতে। চেতেশ্বরের বাবা অরভিন্দ পূজারা ছয়টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন, চাচা বিপিনও খেলেছেন ৩৬টি ম্যাচ। দুই ভাইয়ের কেউ জাতীয় দলে জায়গা করে নিতে না পারলেও তাঁদের পরের প্রজন্মের চেতেশ্বর ঠিকই জায়গা করে নিয়েছেন ভারতীয় দলে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক, ৭৩ টেস্টে ১৮ শতরানসহ ৫৬৩১ রান করা এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান রাহুল দ্রাবিড়, ভি ভি এস লক্ষ্মণ পরবর্তী সময়ে ভারতীয় টেস্ট দলের মিডল অর্ডারে এনে দিয়েছেন আস্থার দৃঢ়তা। ভারতীয় ক্রিকেটের প্রথাগত ‘পাওয়ারহাউজ’; মুম্বাই, দিল্লি, হায়দরাবাদের বাইরে সৌরাষ্ট্রও জোর চেষ্টা করছে ঘরোয়া ক্রিকেটে সফল হতে। গত চার মৌসুমে দুইবার রঞ্জি ট্রফির ফাইনালে খেলেছে সৌরাষ্ট্র, যে দলের হয়ে খেলেন পূজারা। নিজের রাজ্যে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটার তৈরির জন্য খুলেছেন সম্পূর্ণ বিনা পয়সার ক্রিকেট পাঠশালা। যেখানে অবসর সময়টায় নিজেও অনুশীলন করেন পূজারা। অন্যান্য সময় একাডেমির দেখভাল করেন পূজারার বাবা অরভিন্দ, চাচা বিপিন এবং সৌরাষ্ট্রের সাবেক বাঁহাতি পেসার কুলদীপ শর্মা।

কাল সকালে বিপিন শর্মাকে যখন মুঠোফোনে ধরা হলো, তখন তিনি অনূর্ধ্ব- ১৬-র ম্যাচ দেখতে ব্যস্ত। বললেন বিকেলে মাঠে কাজ আছে, তখন কথা হবে। ম্যাচের আগে একসময়ের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান বিপিনের কাছেই জানা গেল, ‘আমরা একাডেমিটা আরো আগে থেকেই চালাতাম। কিছুদিন আগে ছয় একর জমি কেনা হয় একাডেমির জন্য। সেখানেই আমরা নতুন করে একাডেমির কার্যক্রম শুরু করেছি।’

বিপিনের কাছ থেকেই জানা গেল, রাজকোট থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই একাডেমির সুযোগ-সুবিধার কথা, ‘এই অঞ্চলে পানির খুব অভাব। তাই ছয় একর জমির এক একর আমরা একটা বড় পুকুর কেটেছি। মাঠে পানি দেওয়ার জন্য পানির জোগান এই পুকুর থেকে আসে। এ ছাড়া সেন্টার উইকেট আছে পাঁচটি, দুটি অ্যাস্ট্রোটার্ফ উইকেট, চারটি প্র্যাকটিস টার্ফ উইকেট। আছে বোলিং মেশিন, ছোট করে হলেও একটা জিমও আছে।’ ৭০ গজ বাউন্ডারির একটা মাঠও আছে একাডেমির নিজের। বিপিন জানালেন, এখানে অনুশীলন করা ক্রিকেটারদের কোনো টাকা-পয়সা দিতে হয় না, ‘আমরা ট্রায়াল নিয়ে প্রতিভাবান ক্রিকেটারদের বেছে নিই, যাদের আমরা মনে করি সামনের দিনে রাজ্য ও ভারতীয় দলে খেলতে পারবে। এ জন্য তাদের কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা নেই না, উল্টো তাদের যাতায়াতের খরচ দিই।’

খরচ তো লাগছেই না, তার ওপর জাতীয় দলের ক্রিকেটারের সংস্পর্শে আসার সুযোগ; ভুজ অঞ্চলের উঠতি ক্রিকেটারদের কাছে খুবই আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে এই ক্রিকেট একাডেমি। বিপিনের কাছেই শোনা গেল, ‘যখন খেলা থাকে না, তখন চেতেশ্বরও এখানেই অনুশীলন করে। বাচ্চাদের বোলিং খেলে নেটে, ওদের ব্যাটিং নিয়ে নানা রকম টিপস দেয়।’ বছর চারেক আগে, এই একাডেমি শুরু করেন চেতেশ্বর। কারণ হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটাই লক্ষ্য, আমরা সবার জন্য সেরা অনুশীলন সুবিধা নিশ্চিত করতে চাই। এই ছেলেরা যদি কঠোর পরিশ্রম করে, তাহলে তাদের ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলে সুযোগ না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। আমরা সৌরাষ্ট্রের জন্য আরো ভালো ভালো সব ক্রিকেটার তৈরি করতে চাই।’ পূজারার বাবা একটা সময় রেলওয়ের মাঠে বিনা পয়সায় উঠতি ক্রিকেটারদের শেখাতেন। রেলের চাকরিটা ছেড়ে দেওয়ার পর ছেদ পড়ে সেই অভ্যাসে। এখন অরভিন্দ নিজেদের পাঠশালায় ইগলের চোখে দেখছেন তরুণ ক্রিকেটারদের।

অরভিন্দ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটার হলেও রেলের চাকরির কারণে খেলোয়াড়ি জীবন লম্বা করতে পারেননি। বিপিন ভারতীয় অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর করলেও জাতীয় দল পর্যন্ত আসতে পারেননি। চেতেশ্বর পেরেছেন। আরো অনেকের স্বপ্ন যেন বাবা-চাচার মতো ভেঙে না যায়, সে জন্যই হয়তো তরুণদের জন্য পূজারা পরিবারের এই পাঠশালা।

বিপিনের সঙ্গে আলাপ করতে করতে আর পূজারা পরিবারের বিনা পয়সার পাঠশালার সুযোগ-সুবিধার কথা শুনতে শুনতে চোখের সামনে ভেসে উঠল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের একাডেমি বিল্ডিংয়ের ছবিটা। একজন ক্রিকেটার নিজের উদ্যোগে যে সুযোগ-সুবিধার একাডেমি তৈরি করতে পারে, বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া সংস্থার সামর্থ্য কি তার চেয়ে কম নাকি সদিচ্ছা আর দূরদৃষ্টির অভাব?

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা