kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ডাউন দ্য উইকেট

অর্থেই অনর্থ

সাইদুজ্জামান   

২৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অর্থেই অনর্থ

দেশের জিডিপিতে ক্রিকেটের ভূমিকা অতি নগণ্য। তবে দেশের ভাবমূর্তির ‘মেকওভার’ বিবেচনায় খেলাটির মূল্য আকাশচুম্বী। মহামূল্য বলেই গত তিন দিন হলো মিরপুরে সাংবাদিকদের উপচে পড়া ভিড়। তাতে পোয়াবারো উল্টো দিকের রেস্তোরাঁগুলোর। মালিকদের ঠোঁটের কোণে তৃপ্তির হাসি, অর্ডার নিয়ে কুলানো যাচ্ছে না যে!

মিরপুরে ক্রিকেট শিফট হওয়ার পরও এমন দৃশ্য ছিল না, ২ নম্বরের মোড়ের পূর্ণিমাই ঠিকানা ছিল তখনকার দর্শকদের। ২০১১ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মিরপুর স্টেডিয়ামের দুই নম্বর গেটের আশপাশে গড়ে উঠতে থাকে একের পর এক খাবারের দোকান। ৩ বাই ৫ ফুটের ভাতঘরটাই আমার মতো আরো অনেকের ফেভারিট। খুব চাপাচাপি হলেও ঘরে রান্না নানা পদ ভীষণ সুস্বাদু, দামেও সস্তা। আবার হোস্টেল-জীবনের ‘ফিস্টি’ মানে, বিরিয়ানি খেতে চাইলে বিসমিল্লাহ কিংবা কাশ্মীরি বিরিয়ানি হাউসও মন্দ নয়। আর একাডেমি ভবন লাগোয়া একতলা মার্কেটে ‘গরিবের শেফস টেবল’ আদলে গড়ে ওঠা ফাস্ট ফুড, চায়নিজ, কাবাবের দোকান।

ক্রিকেটারদের আন্দোলনের উত্তপ্ত কড়াইয়ে বসে মিরপুরের ফুড রিভিউ করার কারণ গত তিনটি দিন এসব করেই কেটেছে আমাদের। ২১ অক্টোবর ১১ দফা দাবি জানিয়ে চলে যাওয়ার পর গতকাল সন্ধ্যার আগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থেকেছেন ক্রিকেটাররা। মাঝে ২২ অক্টোবর বোর্ড সভাপতি সমস্ত ক্ষোভ ঝেড়ে যাওয়ার পর দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আগে তাঁর কাছ থেকেও নতুন কিছু শোনার নেই। তাই গত ৪৮ ঘণ্টায় গুজব-পাল্টাগুজব ছড়িয়েছে মিরপুরে। এ সংকটে চূড়ান্ত জয় খেলোয়াড় নাকি সংগঠকদের হবে—সে আলোচনাও হয়েছে। 

প্রধানমন্ত্রী যেহেতু ক্রীড়াপ্রেমী এবং সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক, তাই তাঁর আনুকূল্য কোনদিকে, সে নিয়ে হয়েছে বিস্তর গবেষণা। এই শোনা যাচ্ছে সাকিব আল হাসান চেষ্টা করেও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেননি। বরং সরাসরি দেখা করে সংকট সমাধানের কর্তৃত্ব নিয়ে এসেছেন নাজমুল হাসান। আবার উল্টোটাও বাতাসে ভেসেছে— সাকিব ইন পাপন (নাজমুল হাসান) আউট! সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। কেননা দুই পক্ষের তাঁবু থেকে সরকারি সমর্থনের ব্যাপারে এমনটাই শোনা গেছে।

তবে ক্রিকেটাররা যদি আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে পুরোপুরি সংযোগ বিচ্ছিন্ন না হতেন, তাহলে গুঞ্জন এতটা ডালপালা মেলত বলে মনে হয় না। আপনি আন্দোলন করবেন, কিন্তু অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন না—এ কেমন কথা? বোর্ড সভাপতি বিষোদগার করে যাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানাতে ২৪ ঘণ্টার প্রস্তুতি নিতে হবে? হতে পারে মিডিয়া এবং জনতার প্রতিক্রিয়া দেখা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন তাঁরা। হতে পারে প্রথাগতভাবে সমর্থন প্রবলভাবে ঝুঁকে থাকবে তাঁদের দিকেই। সেটা আছেও। তবে বেহিসেবি জীবন ক্ষয়িষ্ণু। জনপ্রিয়তার অতি ব্যবহারও মোহ কাটিয়ে দিতে পারে—এটা সবার মনে রাখা দরকার।

ক্ষমতার অতি ব্যবহারও যেমন কাল হয়ে দাঁড়ায় ক্ষমতাসীনদের। সদর্পে ঘুরে বেড়ানো বোর্ড পরিচালকদের শরীরী ভাষাও গত দুই দিনে অনেকটা বদলে গেছে। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে যতটা আক্রমণাত্মক ছিলেন বোর্ড সভাপতি, গতকাল ঠিক ততটাই নমনীয় বোর্ডের তাঁর সহযোগীরা। নইলে সব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ক্রিকেটারদের অপেক্ষায় থাকবেন কেন বোর্ড সভাপতি? তবে যথারীতি খেলোয়াড়দের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাননি বিসিবির প্রধান নির্বাহী থেকে শুরু করে অন্য বোর্ড পরিচালকরা। সন্ধ্যায় গুলশানের একটি হোটেলে সংবাদ সম্মেলনের পর অবশ্য বিসিবির সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহ প্রকাশ করা হয় ক্রিকেটারদের তরফ থেকে। তবে সেই আলোচনা কবে হবে, সেটি এখনো অজানা।

ক্রিকেটারদের আন্দোলন ঘোষণার দিন থেকে অবশ্য একটা বিষয় সবারই জানা—খেলোয়াড় বনাম প্রশাসক লড়াইয়ের মূলে ‘সম্মান’, ক্রিকেটে যার মানে ভেঙে বললে খেলোয়াড়দের সামাজিক নিরাপত্তা। আর এ নিশ্চয়তার মূলে টাকা। সংগঠকরা টাকা অপব্যয়ে যতটা উৎসাহী, ততটাই অনুৎসাহী খেলোয়াড়দের ন্যায্য পাওনা বুঝিয়ে দিতে—আন্দোলনের ফোকাল পয়েন্ট এটাই।

এ দাবি সত্য না মিথ্যা—সে বিতর্কে যাব না। শুধু দীর্ঘকাল এ দেশের ক্রিকেটের পথপরিক্রমা থেকে কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই আজ।

একদা অবিরাম বিদ্যুৎ সরবরাহ যখন ছিল না তখন মোমের আলোয় ক্রিকেট প্রশাসন চালিয়েছেন সেকালের সংগঠকরা। ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর চেয়েও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন সেকালের সংগঠকরা। কল্পকাহিনির মতো শোনাতে পারে, সেসময় সংসারের চেয়ে কেউ কেউ ক্লাবের প্রতি বেশি যত্নশীল ছিলেন। আবার অনেক ক্রিকেটার ছিলেন যাঁরা ক্লাবের দৈন্যদশার কথা ভেবে পরের মৌসুমে পাওনা বুঝে পাওয়ার শর্তেও নিংড়ে দিয়ে খেলতেন। তখনকার সংগঠকরা ক্রিকেটারদের তুই-তুকারি করে কথা বলতেন। তবে সে সম্বোধনে অসম্মান নয়, অপত্য স্নেহ মিশে থাকত।

তবে টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির পর থেকে অর্থাগম ঘটতে শুরু করল বাংলাদেশের ক্রিকেটে। বেতন কাঠামোতেও এলেন ক্রিকেটাররা। যদ্দুর মনে পড়ে ‘এ’ ক্যাটাগরির ক্রিকেটারের বেতন ছিল ৬০ হাজার টাকা, ২০০০ সাল বিবেচনায় যা যথেষ্টই আকর্ষক। শুরুতে এতেই সন্তুষ্ট ক্রিকেটারদের ‘বিশ্বাসভঙ্গ’ হতে অবশ্য বেশি সময় লাগেনি। দ্রুতই বেতন বৃদ্ধির জন্য আনাচে-কানাচে অনুযোগ করতে থাকেন তাঁরা। আর সংগঠকেরাও আবডালে ক্রিকেটারদের অর্থলোভী বলে প্রচারে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

খেলোয়াড়-সংগঠক সম্পর্কের ছন্দঃপতনের শুরু মূলত তখন থেকেই। আশ্চর্য! কোথায় অর্থাগমে উন্নয়নের মাইলস্টোনের দিকে ছুটবে ক্রিকেট, তা না, উল্টো সংগঠক আর খেলোয়াড়কে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে মুখোমুখি অবস্থানে!

সেই অর্থের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে আজ সর্বোচ্চ পর্যায়ে। উন্নতির গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী থাকলে ভবিষ্যতে বিসিবির অ্যাকাউন্ট আরো ভারী হওয়ারই কথা। তবে তার চেয়েও দ্রুতগতিতে যেন যুদ্ধংদেহী হচ্ছে খেলোয়াড় বনাম সংগঠক লড়াই। ক্রিকেটাররা ধর্মঘটে যাওয়ার পরদিন সংবাদ সম্মেলনে যা যা বলেছেন তাতে ক্রিকেটারদের আক্রান্ত বোধ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবু ভালো যে গতকালের সংবাদ সম্মেলনে সেসবের পাল্টা না দিয়ে সম্প্রীতির কথাই বলেছেন সাকিব আল হাসান। এতে তাঁর জনপ্রিয়তার পাল্লা আরো ভারী হওয়ার কথা।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সব কিছু নিয়ে ক্রিকেটারদের পাশে দাঁড়ানোও জনপ্রিয় হওয়ার সহজ উপায়। কিন্তু খেলোয়াড়রা কি শতভাগ পরিশুদ্ধ? তাঁদের উত্থাপিত দাবিনামার পক্ষে মিডিয়া বিভিন্ন সময়ে সরব হয়েছে। আর্কাইভ ঘাঁটলে সেসব পাওয়া যাবে। কিন্তু তাঁরা নিজেরা নিজেদের কতটুকু সাহায্য করেছেন সেসব দাবি আদায়ে?

সামষ্টিক দাবি নিয়ে গিয়ে ব্যক্তিগত দাবি মিটিয়ে চলে আসার ঘটনা কিন্তু সে যুগে ছিল, এ যুগেও আছে। একবার জাতীয় দলের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ক বোর্ড কর্তার কাছে বেতন বৃদ্ধির দাবি নিয়ে গিয়েছিলেন। কারো বেতন বাড়েনি সেবার। অনেক পরে জানা যায় যে, আলোচনার টেবিলে অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ককে যথাক্রমে ১৫ ও ১০ শতাংশ বেতন বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব পেয়ে সেদিন নীরবে বেরিয়ে এসেছিলেন ওই দুজন।

এ যুগে একবার বিপিএলে প্লেয়ার্স ড্রাফটে স্থানীয়দের মূল্যমান নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে রফা হয়েছিল ‘আইকন’ ক্রিকেটারদের অবমুক্তির মাধ্যমে। অবমুক্ত হওয়ার কারণে নির্ধারিত মূল্যের বাইরে গিয়ে বেশি দাম হাঁকাতে পেরেছিলেন ‘আইকন’রা, সে তো সবারই জানা। বোর্ডও মনে করেছে হেভিওয়েটরা যখন খুশি, তখন আর কারোর আর্তনাদে কর্ণপাত না করলেও চলে। আজকের অবস্থান আরো আগে নিলে আরো আগেই অনেক সমস্যারই সমাধান হতে পারত।

যাক, ‘ইটস নেভার লেট’, শুরু তো হয়েছে। আপনার ব্যূহ থেকে বেরিয়ে সামগ্রিক আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন তারকা ক্রিকেটাররাও। সবচেয়ে ভালো লেগেছে ঘরোয়া ক্রিকেটের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টিও তাঁদের দাবিনামায় গুরুত্ব পেতে দেখে।

ধরে নিচ্ছি, বোর্ড এ দাবি মানবে। সে ক্ষেত্রে অনুরোধ থাকবে ক্রিকেটাররাও যেন উন্নত অবকাঠামোয় উন্নত মানসিকতা নিয়ে ক্রিকেটটা খেলেন! বিস্তারিত লেখাটা ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ— ক্রিকেটারদের জন্য সম্মানজনক হবে না!

ছোট্ট একটা ঘটনা দিয়ে লেখাটা শেষ করতে চাই। গত জাতীয় লিগের এক ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় চোট পেয়ে মাঠ ছেড়ে যান ঢাকা মেট্রোর এক ক্রিকেটার। ডাক্তারের পরামর্শে তাঁর পরের ম্যাচে বিশ্রামে থাকার কথা। কিন্তু কি আশ্চর্য, পরের ম্যাচে তিনি কিনা টুয়েলভথ ম্যান! উল্লেখ্য, দ্বাদশ খেলোয়াড় ম্যাচ ফি’র অর্ধেক পেয়ে থাকেন। জানি না এ ঘটনায় ওই ড্রেসিংরুমের জুনিয়র ক্রিকেটাররা কতটা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন!

সংগঠকরা না হয় খুব খারাপ। কিন্তু আপনি ক্রিকেটার মানসিকভাবে কতটা সামষ্টিক? অতীত বাদ দিন। শপথ নিন, এই আন্দোলনের সাফল্য প্রত্যাশিত পথে চলার শক্তিও জোগাবে আপনাকে।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা