kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্রিকেটারদের ১১ দফা

‘সম্মানে’র জন্য লড়ছেন ক্রিকেটাররা

নাঈম ইসলাম যেমন ১১ দফার প্রথমটি শুরুই করেছেন, ‘আমাদের ক্রিকেটাররা প্রাপ্য সম্মান পায় না’, বলে। এই অসম্মানের অনেকটা জুড়েই ঘরোয়া ক্রিকেট। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কথা তো শুরুতেই বলা হয়েছে। অন্যান্য আসরও আক্রান্ত। সাকিব যেমন মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘জাতীয় লিগে ভ্রমণভাতা মাত্র আড়াই হাজার টাকা। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছেন রাজশাহী থেকে একটা ছেলে ওই টাকায় কী করে কক্সবাজারের ম্যাচ খেলতে যাবে?’

২২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘সম্মানে’র জন্য লড়ছেন ক্রিকেটাররা

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ‘এনাফ ইজ এনাফ’—সহ্যশক্তির চিরায়ত এ জেদই একাট্টা করে এক ছাতায় নিচে জায়গা করে দিয়েছে ক্রিকেটারদের। জাতীয় দলের, বিশেষ করে সিনিয়র ক্রিকেটারদের সঙ্গে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটারদের দূরত্বের দেয়াল সরিয়ে দিয়েছে এ মনোভাব। আর সবার প্রতিনিধি হয়ে সাকিব আল হাসান তো বলেছেনই যে, আগামীর ক্রিকেটারদের কথা ভেবেই তাঁদের ‘আজকের’ আন্দোলন।

কাগজ-কলমে ‘লিড রোল’ বাংলাদেশের টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সাকিবের। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে এ আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে জাতীয় দলের বাইরের ক্রিকেটারদের নেতৃত্বেই। গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ঘোষিত ১১ দফা দাবির সিংহভাগই বহুদিনের অভিযোগ। সেসব নিয়ে বারকয়েক সভা হয়েছে ড্রেসিংরুমের অন্তঃপুরে। সেসব নিয়ে বোর্ড কর্তাদের সঙ্গে আলোচনাও করেছেন সিনিয়র ক্রিকেটাররা। কিন্তু সুফল মেলেনি কোনো। তাতে জাতীয় দলের তারকাদের ওপর থেকে আস্থা সরিয়ে নিয়েছিলেন। আর ক্রিকেটারদের স্বার্থরক্ষার জন্য গঠিত সংস্থার ওপর তো আস্থা নেই বর্তমান কোনো ক্রিকেটারেরই। সংস্থার দুই শীর্ষকর্তাই যে সরাসরি বোর্ডে জড়িত!

তবে নানা কারণে পরিস্থিতি বদলেছে। আয়ারল্যান্ড এবং বিশ্বকাপ সফরের সময়ই সিনিয়র ক্রিকেটারদের আত্মসমালোচনায় ব্যস্ত দেখা গেছে। চাইলে তাঁরাই পারেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ছবি বদলে দিতে। কিন্তু সেই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে তাঁরাও দিন বদলের ক্যানভাসে তুলির আঁচড় আঁকার সাহস করেননি। এমনও তাঁদের বলতে শোনা গেছে, ‘পরের প্রজন্ম আমাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।’ হয়তো এ আত্মসমালোচনাই তাঁদের কাছে নিয়ে এসেছে দেশের বাকি ক্রিকেটারদের।

বোর্ডের তরফে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাও জ্বালানি জুগিয়েছে এ আন্দোলনে। জাতীয় লিগে ব্যবহৃত বলের মান নিয়ে ঠিক প্রশ্নও তোলেননি মোহাম্মদ শরিফ। শুধু অনুরোধ করেছিলেন যেন ভালো মানের বল দেওয়া হয় ম্যাচে। সেটি মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার কারণেই জাতীয় দলের সাবেক এ পেসার এবার জাতীয় লিগে দল পায়নি বলে বিশ্বাস ক্রিকেটারদের। তারও আগে, আফিফ হোসেনকে বোর্ড যেতে দেয়নি ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ খেলতে। অথচ সাকিবকে বাধা দেয়নি বোর্ড। মুস্তাফিজুর রহমানের ওপরও একই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল বোর্ড।

ক্রিকেটারদের অসম্মানিতবোধ করার তালিকার এখানেই শেষ নয়। জাতীয় দল নির্বাচন থেকে শুরু করে গেম প্ল্যান নিয়ে কর্তাব্যক্তিদের খোলামেলা আলোচনাতে প্রায়ই বিদ্ধ হন কোনো না কোনো ক্রিকেটার। বোর্ডের অন্দরমহলে নিজেদের আর আড়াল খুঁজে পান না খেলোয়াড়রা। যদিও কর্মপরিধি বিবেচনা করলে বোর্ড কর্তারা খেলোয়াড়দের অভিভাবক, যে অভিভাবক শুধু নির্দয় শাসনই করে।

স্বার্থের ব্যাপার তো অবশ্যই রয়েছে। ম্যাচ ফি বৃদ্ধি, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ দল বদলের ওপর থেকে ‘প্লেয়ার্স বাই চয়েস’ নামক শিকল ভাঙার দাবি পূরণ হলে ক্রিকেটারদের অ্যাকাউন্টে বাড়তি অর্থাগম হবে নিশ্চিত। তবে এর সঙ্গে বেতনসীমা নির্ধারণ করে দেওয়ার নামে অবজ্ঞা থেকেও মুক্তি মিলবে বলে মনে করেন ক্রিকেটাররা।

নাঈম ইসলাম যেমন ১১ দফার প্রথমটি শুরুই করেছেন, ‘আমাদের ক্রিকেটাররা প্রাপ্য সম্মান পায় না’, বলে। এই অসম্মানের অনেকটা জুড়েই ঘরোয়া ক্রিকেট। ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের কথা তো শুরুতেই বলা হয়েছে। অন্যান্য আসরও আক্রান্ত। সাকিব যেমন মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘জাতীয় লিগে ভ্রমণভাতা মাত্র আড়াই হাজার টাকা। কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছেন রাজশাহী থেকে একটা ছেলে ওই টাকায় কী করে কক্সবাজারের ম্যাচ খেলতে যাবে? বাসে ছাড়া সম্ভব নয়।’ কিন্তু বাসে গেলে তিন দিনের বিরতির সিংহভাগই কেটে যাবে রাস্তায়। ম্যাচে নামার আগে পর্যাপ্ত বিশ্রামই মিলবে না।

আন্দোলনে নেমে পড়া ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁদের এ অযত্নকে নিছকই বোর্ডের মিতব্যয়িতা বলে মনে করেন না তাঁরা। তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস এটা স্রেফ অসম্মান থেকে করা হচ্ছে! বোর্ডকর্তারা যেখানে অকারণেও প্লেনে, হেলিকপ্টারে যাতায়াত করেন, সেখানে ক্রিকেটাররা কেন বাসে চড়বে? বোর্ডের কোষাগার তো ভরছে ক্রিকেটারদের কারণেই।

বোর্ড কর্মকর্তাদের তরফ থেকে অবজ্ঞার আরো উদাহরণ নিয়ে গত কিছুদিন নাড়াচাড়া হয়েছে ক্রিকেটারদের মাঝে। বিদেশ সফরে, বিশেষ করে সব শেষ বিশ্বকাপেই বোর্ড থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার পাউন্ড করে দেওয়া হয়েছে পরিচালকদের। ৮০০ কোটি টাকার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে পূর্বাচলে নতুন স্টেডিয়াম তৈরির জন্য। ক্রিকেটাররা বিশ্বাস করেন, এর চেয়েও কম খরচে পুরো দেশের ক্রিকেট অবকাঠামো ঠিক করা সম্ভব।

কিন্তু খোদ মিরপুরের হোম অব ক্রিকেট আজ মুমূর্ষু। দেশের সেরা মাঠের মতো সেরা ইনডোরও মিরপুরে। অথচ সেই ইনডোরের মান নিয়েও অভিযোগ রয়েছে ক্রিকেটারদের। ২০০৯ সালে তৈরির পরই ডিজাইনে ভুল ধরা পড়ে শুরুতেই। ভাপসা গরমে প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। এরপর ডিজাইনে সামান্য পরিবর্তন আনলেও মিরপুরের ইনডোর এখনো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেনি।

ক্রিকেটারদের ব্যক্তিগত দাবিতে এসেছে ঘরোয়া ক্রিকেটে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়টিও। তৃতীয় বিভাগের কোয়ালিফাইং রাউন্ড বন্ধ হয়ে গেছে বিশেষ উদ্দেশ্যে। আরো বড় অভিযোগ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেটের আম্পায়ারিং নিয়ে। ক্ষমতার বলয়ের কাছকাছি থাকা দলগুলোর এহেন বাড়তি সুবিধাপ্রাপ্তির ফলে ভবিষ্যতের ক্রিকেটার গড়ে উঠছে না বলে মনে করেন আন্দোলনে নামা খেলোয়াড়রা। সাকিব তেমনটাই বলেছেন, ‘বিভিন্ন সময়ে পত্রিকায় ঘরোয়া ক্রিকেট নিয়ে বিভিন্ন খবর এসেছে। ম্যাচে যাওয়ার আগেই ঠিক হয়ে যায় রেজাল্ট কী হবে। এটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক। এতে একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে যেতে পারে। এগুলো ঠিক না হলে আমাদের পাইপলাইন ঠিক হবে না।’

অবশ্য আপাতত যা অবস্থা, তাতে দেশের ক্রিকেটই সংকটাপন্ন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা