kalerkantho

সোমবার । ১৮ নভেম্বর ২০১৯। ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ২০ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

বাংলাদেশ ফুটবলের নতুন ছবি

১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বাংলাদেশ ফুটবলের নতুন ছবি

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরেও এক দলের কেটেছে নির্ঘুম রাত। আরেক দল দিব্যি ঘুমিয়েছে ১ পয়েন্ট পাওয়ার সুখানুভূতিতে। একদিকে অতৃপ্তি-আফসোস, আরেক দিকে অ্যাওয়ে ম্যাচে সর্বস্ব না হারানোর সান্ত্বনা। যুবভারতী স্টেডিয়ামে জয়ের স্বপ্ন দেখানো ম্যাচের পর রাতটা এমনই মিশ্র অনুভূতিতে কেটে গেল বাংলাদেশ দলের।

বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে আগের দুই ম্যাচ হারলেও খেলায় ছিল অনেক ইতিবাচক দিক। ছিল আক্ষেপও, যেমন আফগানিস্তানের ম্যাচ থেকে শূন্য হাতে ফেরাটা মেনে নিতে পারছিলেন না জেমি ডে। বাংলাদেশের এই ব্রিটিশ কোচ কাতারের বিপক্ষে পরের ম্যাচটিকে দিয়েছেন তাঁর কোচিংয়ে ‘সেরা ম্যাচ’-এর আখ্যা। তাহলে ভারতের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র ম্যাচটি? জেমির জবাব, ‘এই ম্যাচের তুলনা হয় না। খেলোয়াড়রা অসাধারণ এক ম্যাচ খেলেছে। নেহাত দুর্ভাগা বলেই জয় পায়নি তারা।’ প্রথমার্ধে সাদউদ্দিনের গোলে লিড নিয়ে বাংলাদেশ জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও অক্ষত রাখতে পারেনি নিজেদের পোস্ট। ভারতের বিপক্ষে ঠিক আগের দুটি ম্যাচেও জয়বঞ্চিত হয়েছিল ইনজুরি টাইমে গোল খেয়ে। এবার তীরে এসে তরি ডোবে ৮৮ মিনিটের গোলে। তার আগেই যে লিড বড় করার অনেক সুযোগ পেয়েছিলেন জামাল ভূঁইয়ারা। কোচের বিশ্লেষণে এর দায় দুর্ভাগ্যের, ‘ম্যাচের শুরুটা দেখুন। শুরু থেকেই ভারতের রক্ষণে হানা দেয় আমার খেলোয়াড়রা, এই ম্যাচ নিয়ে তারা খুব ফোকাসড ছিল। শুরুর পেনাল্টিটা আমাদের প্রাপ্য ছিল, পরে ভিডিও দেখে আরো নিশ্চিত হয়েছি। এরপর ব্যবধান বাড়ানোর অনেক সুযোগ ছিল, জীবন (নাবিব নেওয়াজ) তো একটা গোল পেতেই পারত। স্রেফ দুর্ভাগা বলেই...।’

নাবিব নেওয়াজ পেয়েছিলেন দু-দুটি সুযোগ। একটি গোলরক্ষক সেভ করেছেন অন্যটি গোললাইন থেকে অবিশ্বাস্যভাবে ফিরিয়েছেন ভারতীয় ডিফেন্ডার। তাই এই ফরোয়ার্ডের আক্ষেপের শেষ নেই, ‘জাতীয় দলে ভাগ্যটাই আমার খারাপ। গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে পোস্টে তুলে দিয়েও পারলাম না। সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, ওই দুটি মুভের কথা মনে পড়ছিল। একটি গোল হয়ে গেলে আজ ৩ পয়েন্ট নিয়েই ফিরতাম।’ অথচ ঘরোয়া ফুটবলে গোল উৎসবের দুর্দান্ত এক মৌসুম কাটিয়েছেন জীবন। তাই জাতীয় দলের জার্সিতে গোল না পাওয়ার আক্ষেপটা তাঁর বেশি। তাঁর দুটি সুযোগ তো গেল, পাশাপাশি ইব্রাহিমের বাঁ পায়ের দুর্দান্ত শট ফিরিয়ে দেয় ক্রসবার। আসলে পরিষ্কার সুযোগ দিয়ে বিবেচনা করলে ম্যাচটি হতে পারত লাল-সবুজের।

এই ভাবনাটা প্রথম ভেবেছিলেন কিন্তু জামাল ভূঁইয়াই। যুবভারতী স্টেডিয়ামে ম্যাচের আগের সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ অধিনায়কের মুখেই প্রথম শোনা গিয়েছিল ‘ভারতকে গুঁড়িয়ে’ দেওয়ার কথা। শুনে কেউ চমকে গিয়েছিল, কেউ বা তাকিয়েছিল বাঁকা চোখে। তখন যে ভারতীয় সাংবাদিকরা সুনীল ছেত্রীর হ্যাটট্রিক-চর্চা করছিলেন! এই ভারতীয় স্ট্রাইকারকে তাঁরা প্রশ্ন করছিলেন বাংলাদেশের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করবেন কি না? সত্যিটা হলো, মাঠের খেলায় তিনি কিছুই করতে পারেননি। উল্টোদিকে আছে যুবভারতী স্তব্ধ করে দেওয়া জামাল ভূঁইয়ার দুর্দান্ত এক ফ্রি-কিক। তাতে সাদের লক্ষ্যভেদী হেডে জেগে ওঠে লাল-সবুজের জয়ের স্বপ্ন। সেটা ৮৮ মিনিটে এভাবে ভেঙে যাবে অধিনায়ক জামাল ভাবতেই পারেননি, ‘সারা রাত আমি ঘুমাতে পারিনি। শুধু আফসোস হচ্ছে এই ভেবে, কী সুযোগটা আমরা হারিয়েছি। কর্নারে রবিউলই ছিল আদিলের মার্কার, ওর মার্কিংটা ঠিকঠাক হয়নি। নইলে শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে ফিরতে হয় না আমাদের।’ কর্নার কিকে আদিলের হেডে সমতায় ফেরে ভারত।

এর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ রক্ষণে হয়নি একটি ভুলও। ভারত বল পজেশনে এগিয়ে থাকলেও সুনীলের একটি ভলি বাদে পারেনি পরিষ্কার কোনো সুযোগ তৈরি করতে। কারণ ইয়াসিন-রিয়াদ-রায়হানদের গড়া ব্যাক-লাইন ছিল প্রাচীরের মতো অভেদ্য। জামাল ভূঁইয়া মনে করেন, ‘দুর্ভেদ্য রক্ষণ এক দিনে তৈরি হয়নি, রক্ষণ-সংগঠন নিয়ে আমাদের কাজ হয়েছে দিনের পর দিন। এটা শুধু ডিফেন্ডারদের কাজ নয়, সবাই মিলে আমরা নিচে নামি, আবার আক্রমণে উঠি।’ ব্রিটিশ কোচ গত ১৬ মাস ধরে বাংলাদেশকে তৈরি করেছেন ‘ডিফেন্স ও কাউন্টারে’ খেলার জন্য। খেলোয়াড়দের তৈরি করেছেন দাবার ঘুঁটির মতো করে। বলের পজিশন অনুযায়ী কার কী দায়িত্ব সেটা একরকম মুখস্থ হয়ে গেছে সবার। লাল-সবুজের এই রূপান্তরটাই ভারতীয় দলের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। র‌্যাংকিংয়ের পার্থক্যে বা কাতারের সঙ্গে ড্র করে ভারত হিমালয়ের উঁচুতে উঠেই হয়তো জামালদের ভেতরের আগুনটা দেখতে পায়নি! অধিনায়ক বলেছেন দলের ভেতরকার সেই বারুদের কথা, ‘এই ম্যাচে ভীষণ মনঃসংযোগ ছিল আমাদের। সবাই সর্বোচ্চ দিয়ে খেলেছে। এত স্ট্যামিনা ক্ষয় হয়েছে আমাদের, ম্যাচ শেষে কেউ নড়তে পারছিল না। কাতার ম্যাচে বদলি নামানো হয়েছিল একজনকে, এই ম্যাচে তিন বদলির সুযোগই নিয়েছেন কোচ। এই ম্যাচে আমরা এত দৌড়েছি, এত বেশি স্ট্যামিনা খরচ হয়েছে...।’

দুটি হারের পর সবাই ভাগ্য বদলাতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। ভাগ্য বদলেছে, ৩ পয়েন্ট না হলেও ১ পয়েন্ট মিলেছে। বড় প্রাপ্তি হয়েছে যুবভারতীতে নতুন বাংলাদেশের ছবি এঁকে ফিরেছেন জামাল-সাদরা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা