kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ নভেম্বর ২০১৯। ২৯ কার্তিক ১৪২৬। ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

‘কাওয়াসাকি’ ঝড় সামলে ওঠার পর ইমরুল

মাসুদ পারভেজ   

১৪ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘কাওয়াসাকি’ ঝড় সামলে ওঠার পর ইমরুল

ঝড়ে গৃহহীন এক উদ্বাস্তুর জীবনই যেন বেছে নিতে হয়েছিল তাঁকে। অসুস্থ ছেলেকে নিয়ে এই হাসপাতাল, ওই হাসপাতাল, দেশ আর বিদেশ করতে করতে ক্রিকেটটা বেমালুম ভুলেই থাকতে হয়েছিল ইমরুল কায়েসকে। এত বড় ঝড় যে জীবনে আর কখনোই সামলাতে হয়নি, ‘ছেলেকে নিয়ে যে ঝামেলায় ছিলাম, জীবনে এর চেয়ে কঠিন আর কিছুই হয় না।’ সন্তানের জীবন সংকটাপন্ন করে দেওয়া সেই ঝড়ের নাম ‘কাওয়াসাকি’।

সন্তান রক্তনালির এই সংক্রমণ সামলে উঠে এখন অনেকটাই সুস্থ। ইমরুলও তাই ‘কাওয়াসাকি’ ঝড় সামলে গুছিয়ে নিতে শুরু করেছেন নিজেকে। গোছালো ব্যাটিংয়ে সেটিরই প্রমাণ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তাঁর দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরিতে। ঝড়ের ঝাপটার পর জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) রংপুরের বিপক্ষে খুলনার হয়ে ফেরার ম্যাচেও তো পরিস্থিতি কম প্রতিকূল ছিল না। যেখান থেকে সেঞ্চুরিই হয় কি না সন্দেহ, সেখান থেকে দুই টেল এন্ডারকে নিয়ে পরিকল্পিত ব্যাটিংয়ে ভারত সফর সামনে রেখে জাতীয় দলের দরজায়ও কড়া নেড়ে রাখলেন।

অষ্টম ব্যাটসম্যান হিসেবে খুলনার আব্দুর রাজ্জাক যখন আউট হন, তখন ইমরুলের নামের পাশে ৯৩ রান। সেখান থেকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ১৮তম সেঞ্চুরিই শুধু হয় না, তিনি এগিয়ে যান দ্বিতীয় ডাবল সেঞ্চুরির দিকেও। নবম উইকেটে ৮৪ রানের পার্টনারশিপে রুবেল হোসেনের অবদান মাত্র ২ রান! এরপর আবার ডাবল সেঞ্চুরিতে পৌঁছানো নিয়ে সংশয়। রুবেলের বিদায়ের সময়ে যে ইমরুলের রান ১৭৪।

কিন্তু এবারও ঠিক সামলে নেন তিনি। আল-আমিন হোসেনকে নিয়ে ৪২ রানের অবিচ্ছিন্ন দশম উইকেট পার্টনারশিপ তাঁকে পৌঁছে দেয় ডাবল সেঞ্চুরির তীরেও। যে পার্টনারশিপে আল-আমিনের মাত্র ১ রান। বাঁহাতি স্পিনার সোহরাওয়ার্দী শুভকে টানা দুই বলে ছক্কা ও বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ১৯১ থেকে পেরিয়ে যান দুই শর সীমা। ২০১৩-১৪ মৌসুমে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আসর বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) উত্তরাঞ্চলের বিপক্ষে দক্ষিণাঞ্চলের হয়ে করেছিলেন নিজের প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। সেটির চেয়ে অবশ্য এটিকে এগিয়ে রাখছেন এ জন্য, ‘৯০-এর পর থেকে তো সঙ্গী ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান। রুবেল আউট হওয়ার সময়ও ডাবল সেঞ্চুরি থেকে বেশ দূরে। এরপর আল-আমিনকে নিয়ে গিয়েছি বাকিটা পথ। সব ফিল্ডারও তখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখা হয়েছিল। যা করার, তখন ওপর দিয়ে ছয়-টয় মেরেই করতে হয়েছে।’ অপরাজিত ২০২ রানের ইনিংসে মারা ছয় ছক্কার পাঁচটিই তাই ১৫০-এর পর।

তবে এমন ইনিংস খেলার পর পুরনো ভাবনার চক্করেও আর হারাতে চান না ইমরুল, ‘আগে চিন্তা করতাম। রান না করলে (জাতীয় দল থেকে) বাদ পড়ে যাব, এসব টেনশন আর আসে না। হলে হবে না হলে নেই। আমার কাজ আমি করে যাই। বয়স হয়েছে। বাবা হয়েছি। আগে অনেক কিছু বুঝতাম না, এখন বুঝি। বলতে পারেন মনের দিক থেকে পরিণত হয়েছি অনেক।’ টেনশন নেবেন না ঠিক আছে, তাই বলে আশাও অবশ্যই ছেড়ে দিচ্ছেন না, ‘যত দিন খেলব, তত দিন তো জাতীয় দলে খেলার আশা থাকবেই। যেদিন দেখব আমার মধ্যে আর জাতীয় দলে খেলার লক্ষ্য নেই, তখন আর ঘরোয়া ক্রিকেটও খেলব না। এটি বলে রাখলাম। অনেকে আছে জাতীয় দলেই আর খেলবে না, কিন্তু বছরের পর বছর ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলছে। আমি সে রকম কেউ হব না।’

ঝড়ের পর জীবন নতুন করে গুছিয়ে ওঠার পথে চিন্তাজগতেও বদল ইমরুলের। ঠিক করেছেন ব্যাটিংয়েও বদলে ফেলবেন অনেক কিছু। যেমন এই ইনিংসেই সেই বদল অনেকটা আনতে পেরেছেন বলে দাবি, ‘ঠিক করেছি আগের মতো আর তাড়াহুড়া করব না। এই ইনিংসের পুরোটাই ছিল গোছানো। ভালো বলে আউট হলে আউট হয়ে যাব তবে আমি আমার উইকেটটি সহজে দেব না। আমার পরিকল্পনাই ছিল এটি। প্রতিটা সেশন ধরে ধরে খেলেছি। কোনো তাড়াহুড়াই করিনি।’ রয়ে-সয়ে খেলা এই ইনিংসটিকে তিনি রাখছেন নিজের সর্বোচ্চ টেস্ট ইনিংসটির ঠিক পরেই, ‘এই মাঠেই (খুলনার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামে) টেস্টে নিজের প্রথম ১৫০ করেছিলাম (২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে)। একই মাঠে এবারের ইনিংসটি আমার র‌্যাংকিংয়ে দুইয়ে থাকবে।’

‘কাওয়াসাকি’ ঝড় সামলে ওঠার পর যে এটি তাঁর ফুরিয়ে না যাওয়ার ঘোষণাও!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা