kalerkantho

রবিবার । ২০ অক্টোবর ২০১৯। ৪ কাতির্ক ১৪২৬। ২০ সফর ১৪৪১                

মরুর বুকে ফুটবলের ফুল

সামীউর রহমান   

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



মরুর বুকে ফুটবলের ফুল

সাড়ে ১১ হাজার বর্গকিলোমিটারের ছোট্ট দেশ কাতার। বেশির ভাগ স্থলভাগই  বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি আর রুক্ষ পাথুরে কণায়। মাটির ওপরটা বিরানভূমি হলেও নিচটা সমৃদ্ধ নানা রকম মূল্যবান প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থে। তাইতো বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মাথাপিছু আয়ের দেশ এখন কাতার। পেট্রো-ডলারের অনেকটা ভোগবিলাসে খরচ হলেও খেলাধুলার প্রতি কাতার সরকারের অনুরাগ কম নয়। কাতারের আমিরের সরাসরি নির্দেশে কাতারে গড়ে তোলা হয়েছে ‘এস্পায়ার একাডেমি’, যেটা বিশ্বের অন্যতম সেরা ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে এশিয়ান কাপ ও বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব খেলতে আসা কাতার ফুটবল দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই ছিলেন এস্পায়ার একাডেমির ছাত্র। এমনকি দলটির কোচ ফেলিক্স সানচেস বার্সেলোনার যুব দলের কোচের চাকরি ছেড়ে চলে এসেছিলেন কাতারের এস্পায়ার একাডেমিতে। শুধু ফুটবল নয়, খেলাধুলার আরো অনেক শাখাতেই কাতারের ক্রীড়াবিদদের সর্বোচ্চ সাফল্য অর্জনের পেছনে এস্পায়ার একাডেমির অবদান অনেক।

অল্প কিছুদিন আগেই এস্পায়ার একাডেমি আয়োজন করেছিল ফুটবল পারফরম্যান্স ও বিজ্ঞানবিষয়ক একটি বৈশ্বিক সম্মেলন, যেখানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার হার্নান ক্রেসপো, অস্ট্রেলিয়ার টিম কাহিল, আইসল্যান্ডের হেইমির হ্যালগ্রিমসন, টটেনহামের কোচ মুরিসিও পচেত্তিনোসহ আরো অনেকে। সাবেক ফুটবলার, কোচ, ক্লাব কর্তারা মিলে আলোচনা করেছেন ফুটবলের আরো অনেক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে, বিনিময় করেছেন ধ্যান-ধারণা। এই সম্মেলনেই কাতারের কোচ ফেলিক্স সানচেস বলছিলেন কী করে এই একাডেমিটা বদলে দিয়েছে কাতারের ফুটবলকে, ‘আমি যদি অনেক দিন আগে এস্পায়ার একাডেমিতে যোগ না দিতাম, তাহলে আজকে হয়তো এই জায়গাটাতে আমি থাকতাম না। এই প্রকল্পটা একেবারে অনন্য আর এখানে কাজ করে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গার প্রতিভাবান মানুষদের সংস্পর্শে এসে আমি মানুষ হিসেবেও অনেক উন্নত হয়েছি।’

২০০৬ সালে বার্সেলোনার যুব দলের কোচের চাকরি ছেড়ে এস্পায়ার একাডেমিতে যোগ দেন সানচেস, এরপর ধাপে ধাপে অনূর্ধ্ব-১৯, ২০, ২৩ দলের কোচ থাকার পর ২০১৭ সালে হোর্হে ফসেত্তি চাকরি ছাড়লে কাতার মূল দলের কোচের দায়িত্ব পান সানচেস। দীর্ঘদিন বয়সভিত্তিক দলে কাজ করার সুবাদে দলের খেলোয়াড়দের চেনেন অনেক দিন ধরে, এটাই কোচ হিসেবে সানচেসকে সাহায্য করেছে দলের সামর্থ্যটা বুঝতে। লা লিগায় ভিয়ারিয়াল ও স্পোর্তিং গিজনে খেলেছেন কাতারের আকরাম আফিফ। জাতীয় দলের হয়ে ৫১ ম্যাচে ১২ গোল করা এই লেফট উইঙ্গারকে মনে করা হচ্ছে এশিয়ার অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল ফুটবলার। চোটের কারণে সব শেষ ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে খেলা হয়নি আফিফের, বাংলাদেশে বিপক্ষে অবশ্য থাকছেন তিনি। আফিফকে এস্পায়ার একাডেমির দিনগুলো থেকেই দেখেছেন সানচেস, ‘আফিফ আমাদের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড়। অনেক দিন ধরেই তাকে দেখে আসছি। আমি অনেক দিন ধরেই কাতারে কাজ করছি আর কাতারে ফুটবল উন্নয়নের খুব ভালো একটা পরিকাঠামো আছে। তারা অনেক দিন ধরেই এই নিয়ে কাজ করছে।’ আফিফও মনে করেন, এস্পায়ার একাডেমিই তাঁকে সুযোগটা করে দিয়েছে প্রথম কাতারি ফুটবলার হিসেবে ইউরোপের শীর্ষ লিগে খেলার, ‘এস্পায়ার একাডেমি অনেক খেলোয়াড়কেই সাহায্য করে, আমি কৃতজ্ঞ তাদের কাছে। আমার একটা লক্ষ্য চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলা।’

২০১৪ সালে, মিয়ানমারে উত্তর কোরিয়াকে হারিয়ে এএফসির অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছিল কাতারের যুব দল। সেই দলের ২৪ জন ফুটবলারই ছিলেন এস্পায়ার একাডেমির সেসময়কার অথবা সাবেক ছাত্র। এরপর ২০১৮ সালে এএফসির অনূর্ধ্ব-২৩ চ্যাম্পিয়নশিপে তৃতীয় হয় কাতার, সেই দলেও সবাই ছিলেন এস্পায়ার একাডেমির খেলোয়াড়। কাতার ফুটবল দলের অন্যতম বড় তারকা আল মুয়াজ আলিও এস্পায়ার একাডেমি থেকেই উঠে এসেছেন। এবারের এশিয়ান কাপে ৯ গোল করে এশিয়ান কাপে এক আসরে সবচেয়ে বেশি গোলের রেকর্ডটা নিজের করে নিয়েছেন এই ফরোয়ার্ড। খেলছেন অস্ট্রিয়া ও স্পেনের লিগে। আফিফ ও আল মুয়াজ ছাড়াও ইব্রাহিম মাজিদ, আব্দেল করিম হাসানের মতো ফুটবলাররাও উঠে এসেছেন এস্পায়ার একাডেমি থেকেই। আর বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকেই তাঁদের কোচিং করিয়ে আসছেন সানচেস।

এশিয়ার ফুটবলে প্রথাগত পরাশক্তি হিসেবে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার নামের সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে ইরানের নামটাই সবার আগে আসে। অস্ট্রেলিয়া এএফসিতে চলে আসায় বেড়েছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রথাগত সব শক্তিকে পেছনে ফেলে এশিয়ান কাপের শিরোপা জিতেছে কাতার। কোপা আমেরিকাতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ পারফরম্যান্স। আসছে বিশ্বকাপে স্বাগতিক কাতার নিজের দেশে ভালো একটা কিছু করতে এগোচ্ছে আটঘাট বেঁধেই। আর সেই অগ্রযাত্রার নিউক্লিয়াস হচ্ছে এস্পায়ার ফুটবল একাডেমি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা