kalerkantho

বুধবার । ২৩ অক্টোবর ২০১৯। ৭ কাতির্ক ১৪২৬। ২৩ সফর ১৪৪১                 

সুযোগ এসেছিল, কিন্তু...

এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের কাঁপাল বাংলাদেশ

শাহজাহান কবির   

১১ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের কাঁপাল বাংলাদেশ

ছবি : মীর ফরিদ

র‍্যাংকিং সত্যিই কাগুজে রূপ নিয়েছিল কাল। এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে ১৮৭ নম্বর দলের লড়াই বিস্ময় জাগানিয়া। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে বাঙালির ফুটবলপ্রেমে অনেক দিন পর তা ঢেউ তোলে। দুকূল ছাপিয়ে যেতে চায়, যখন ১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে লাল-সবুজ সাঁড়াশি আক্রমণে যায় ২০২২ বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া প্রতিপক্ষের বিপক্ষে। প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের এমন রোমাঞ্চই তো ছিল এই ম্যাচ ঘিরে প্রত্যাশার পুরোটাজুড়ে। তা পূর্ণ। কাতারের সঙ্গে ২-০ গোলের হারে তাই গ্লানি নেই এতটুকু।

বাংলাদেশ যেমন চেয়েছিল তেমন কন্ডিশনই পায়। ম্যাচ শুরুর আগে ঘণ্টাখানেক বৃষ্টিতে মাঠ বেশ নরম সরম হয়ে ওঠে। বুট পড়লেই দেবে যাবে এমন অবস্থা। দ্রুত গতির মাঠে খেলে অভ্যস্ত এবং বৃষ্টিতে একেবারেই অনভ্যস্ত কাতারিদের খেলা তাতে যদি কিছুটা ধীর হয়। অন্তত ডিফেন্ডিংয়ের জন্য এমনটাই চাওয়া ছিল বাংলাদেশের। ম্যাচ শুরুর আগে স্টেডিয়ামেরও ৭০ শতাংশ ভরে গিয়েছিল। আবাহনী গ্যালারি আর ভিআইপি গ্যালারিতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। মোহামেডান গ্যালারি আর পূর্ব দিকের গ্যালারি ভরে ওঠার অপেক্ষা ছিল। ম্যাচ অর্ধেকে গড়াতে তাও প্রায় পূর্ণ।

‘হাই আপ’ ডিফেন্স নিয়েই শুরু করেছে কাতার। যেমনটা আশা করা হয়েছিল, তেমনই। তবে বাংলাদেশও যে সুযোগ পেলেই উঠবে, তারও ছাপ শুরুতে। নাবিব মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই বাঁদিক দিয়ে উঠে গিয়েছিলেন। অন্য প্রান্তে অবশ্য আল মোয়াজ আলীর রানিংয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। এর মধ্যেই রায়হানের লং থ্রোয়ের সুযোগ এসে যায়। সেটা অবশ্য কাজে আসেনি। কাতার প্রত্যাশামতো উইংয়ে বল ফেলছিল অধিনায়ক হাসান আল হায়দুস আর ডান প্রান্তে ইউসুফ আব্দুর ইসহাগের কাছে। সেই চাপ সামলে রায়হান আরেকটি বল রিকভার করে নাবিবকে ফেললে উত্তেজনা তৈরি হয়, নাবিব এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়েও ফেলেছিলেন। তবে তাঁর সমর্থনে সেভাবে উঠে আসতে পারেনি কেউ। তবে বাংলাদেশ কর্নার পায়, এরপর আবার থ্রো। তাতে ফাঁকা জায়গা পেয়ে এশিয়ান গেমসে কাতারকে বধ করা জামাল শটও নিয়েছিলেন। তা শুধু লাইন মিস করে গেছে। ম্যাচের মিনিট পনেরোর মধ্যেই তাই দর্শক উত্তেজনার অনেক খোরাক পেয়ে যান। হায়দুসের সামনে থেকে আল মোয়াজ আলীই দাপাচ্ছিলেন বাংলাদেশের বক্সের সামনে। তাঁকে সামলানোটাই রায়হান আর তরুণ রিয়াদের বড় মাথাব্যথা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ১৬ মিনিটে বক্সের বাঁ প্রান্তেই ফাউল করে জামাল ফ্রিকিক দেন, দেয়াল করে ইয়াসিন মাথায় ফেরান সেই শট। আরেকবার পোস্টের মুখে লাফিয়ে উঠে রহমত বল ক্লিয়ার করেন। স্নায়ুর চরম পরীক্ষা নিচ্ছিল এই ম্যাচ। মাঠের ফুটবলাদের কথা বাদই যাক, ক্রমে পরিপূর্ণ হওয়া স্টেডিয়ামের প্রত্যেক দর্শকও যেন সেই চাপ অনুভব করছিলেন। বাংলাদেশ বল ‘রিগেইন’ করলেই তাই উল্লাসে মত্ত হচ্ছিলেন হাজার বিশেক দর্শক। এরই মধ্যে নাবিবের ক্রসে ইব্রাহিমকে পাহারা দিতে গিয়ে কাতারি ডিফেন্ডারের পড়িমরি করে কর্নার দেওয়া স্বাগতিক গ্যালারিতে আরেক দফা উল্লাস জাগায়। ২৬ মিনিটে কাতার প্রথম কর্নার পায়। বক্সের ভেতর বাংলাদেশ অবশ্য সেই হুমকি ভালোভাবেই সামলে নেয়। কিন্তু এর পরমুহূর্তে ডান দিক থেকেই একটি ক্রসে প্রতিরোধ ভাঙে। বক্সের ভেতর কাতারের দুজন বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি ডিফেন্সের প্রহরায়। কিন্তু একটু পেছনে দাঁড়ানো ইউসুফ আব্দুর ইসহাগ ছিলেন ফাঁকা, সেখান থেকে নেওয়া তাঁর জোরালো শটে অসহায় আশরাফুল ইসলাম রানা। ২৮ মিনিটে ম্যাচে তাই প্রথম পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ।

কিন্তু দর্শক হাল ছাড়তে ছিল নারাজ। গোলের পরপরই হাততালিতে লাল-সবুজদের আবার উজ্জীবিত করতে চেয়েছেন তারা। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার মিনিট পাঁচেক আগে আবার আগুন হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। রায়হানের থ্রোর পর জামালের ক্রসে বাংলাদেশ গোল শোধ করে দিতে চলেছিল প্রায়। জটলার ভেতর থেকে প্রথম ইয়াসিনের শট গোললাইন থেকে ফিরিয়ে দেন এক কাতারি ডিফেন্ডার। ফিরতি বলে রিয়াদুল লাফিয়ে উঠে যে সাইডভলি নিয়েছিলেন, সেটাও লাইনে দাঁড়িয়েই ফিরিয়ে দেন আরেক কাতারি। প্রথমার্ধের সবচেয়ে উত্তুঙ্গ মুহূর্তই সেটি। গোল খেয়ে বাংলাদেশ কিসের হতোদ্যম হবে বিরতির আগে তা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য যেভাবে ঝাঁপিয়েছেন জামাল, রায়হানরা তা জ্বালানি হয়ে থাকে পরের ৪৫ মিনিটের জন্য।

সেখানেও একই উত্তেজনা। জীবনকে উঠিয়ে মাহবুবুর রহমান সুফিলকে নামাতেই আরো ধারালো হয়ে ওঠে বাংলাদেশের আক্রমণ। ৭১ মিনিটে গতিতে কাতারি ব্যাককে পেছনে ফেলে সুফিলের নেওয়া ক্রসে জামাল ছুটে এসে পা-ও চালিয়েছিলেন, কিন্তু বল পোস্টে থাকেনি। এর পরপরই সুফিল নিজে আবারও ডজে বক্সে ঢুকে পড়ে নিয়েছিলেন কোনাকুনি শট। কাতারি গোলরক্ষক লাফিয়ে তা ফিস্ট করেন। বাঁ প্রান্ত দিয়ে ইব্রাহিমও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন। ৭৯ মিনিটে দারুণ ড্রিবলিংয়ে বক্সে ঢুকে অবশ্য নিশানায় রাখতে পারেননি শট। আরেকবার ইব্রাহিমের কাটব্যাকেই বিপলু সুযোগ নষ্ট করেছেন দুর্বল শট নিয়ে। তাতে কী, এশিয়ান চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে যে প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল জেমির শিষ্যদের, সেই প্রত্যাশা তখন কানায় কানায় উপচানো, এমন ম্যাচে তখন একটা পয়েন্ট প্রাপ্যই মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের। শেষ মুহূর্তে অবশ্য জটলা থেকে কাতার আরেকটি গোল না পেয়ে গেলে লড়াইয়ে তৃপ্তিটা আরো বেশিই হতো।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা