kalerkantho

সোমবার । ২৯ আষাঢ় ১৪২৭। ১৩ জুলাই ২০২০। ২১ জিলকদ ১৪৪১

ডাউন দ্য উইকেট

আশা-নিরাশার জাতীয় লিগ

সাইদুজ্জামান

১০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আশা-নিরাশার জাতীয় লিগ

জাতীয় লিগ মৌসুমে এমন দৃশ্য দেখা যায় না। অনুশীলনে সব ক্রিকেটারের একই জার্সি। সহজেই চেনা যায় কে কোন দলের খেলোয়াড়। এমনটাই হওয়ার কথা। যদিও আগে হরেক রকমের জার্সি আর টুপিতে দলসংশ্লিষ্ট কাউকে চেনাই দুষ্কর ছিল। আজ আরেকটি জাতীয় লিগ শুরুর আগে দৃশ্যমান এ পরিবর্তন দেখে আশাবাদী হতে ইচ্ছা করছে।

সমস্যা হলো মাঠ এবং মাঠের বাইরের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির কারণে ক্রিকেটাঙ্গনে আশ্বাস অর্থহীন আর বিশ্বাসও গেছে পালিয়ে! অংশগ্রহণকারী দলগুলোর জার্সিতে দলীয় স্পন্সরের লোগো বসেছে। শুনলাম নামমাত্র মূল্যে বিকিয়েছে দলগুলোর জার্সির স্পন্সরশিপ। তবু তো মিলেছে, যাতে করে এবার জার্সি নিয়ে খুব বেশি অভিযোগ উঠবে না ক্রিকেটারদের তরফ থেকে। একটা সুসজ্জিত এবং ভালো জার্সি একজন ক্রিকেটারের কাছে কতটা মূল্যবান, সেটি কর্তাব্যক্তিদের কাছে অতীতে কখনোই প্রাপ্য গুরুত্ব পেয়েছে বলে শোনা যায়নি। এমনও হয়েছে একবার, চট্টগ্রামে কোনো একটি টেস্টের দিন ভোরে টিম হোটেলে দর্জি আনিয়ে অল্টার করাতে হয়েছে ক্রিকেটারদের পোশাক। সেখানে জাতীয় লিগের জার্সির মান কী হতে পারে, তা বোধগম্য। জাতীয় দলের তারকাদের জন্য এবারের লিগ বাধ্যতামূলক করার চেয়েও দৃশ্যমান এ পরিবর্তনটি বেশি নজরকাড়া। আশা করি ম্যাচের জার্সিতেও ‘সাম্যবাদে’র ছাপ থাকবে। আগের মতো কেউ দলীয়, কেউ বা বিসিবির লোগোখচিত জার্সি গায়ে মাঠে নামবেন না।

এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার কথা মনে পড়ছে। জাতীয় লিগের ম্যাচে ব্যাটিংয়ের সময় এক ব্যাটসম্যান তাঁর ক্লাবের দেওয়া রঙিন জাম্পার (সোয়েটার) পরে নেমেছেন। লাল বলের খেলায় যা অননুমোদিত। কিন্তু এসব নিয়ে বরাবর কঠোর আম্পায়ার নাদির শাহকেও সেদিন এ ব্যত্যয় মেনে নিতে হয়েছিল। কারণ ওই দল থেকে সাদা সোয়েটার সরবরাহ করা হয়নি। ওদিকে ব্যাটসম্যানের গা গরম রাখার জন্য সোয়েটার লাগবেই। অতএব আম্পায়ার অনন্যোপায়! আশা করি এবার সে রকম কিছু হবে না।

একটু লজ্জাই লাগছে, জাতীয় লিগের ২১তম আসরে এসেও এসব তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে লিখতে হচ্ছে! অবশ্য লজ্জা করে লাভ কী, এমন আরো অনেক বিষয়ই আজ লিখতে হবে, যার সমাধান সর্বোচ্চ ২০০২-০৩ মৌসুমের মধ্যেই হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হয়নি। হয়নি বলেই মাঠ, উইকেট, বল এবং ত্রুটিপূর্ণ লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে লিখতে হয়।

মনে আছে, ২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদাপ্রাপ্তির পর আয়োজিত প্রথম জাতীয় লিগ থেকে যে যে বিষয়ে উন্নতির তাগিদ দেওয়া হতো, এখনো সে বিষয়গুলোর নিশ্চয়তাই চাওয়া হয় টুর্নামেন্ট কমিটির কাছ থেকে। অবশ্যই উন্নতি হয়েছে, তবে যে গতিতে হওয়ার কথা ছিল তা হয়নি।

ইউনিফর্মড জার্সির মতো সুখবর আছে ভেন্যু বিষয়ক খবরেও। ভেন্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে আটটি। তবে সংখ্যাগত উন্নতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গুণগত মান কি বাড়বে? গতকাল দুপুরে ঢাকা মেট্রোর দুজনকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে মিরপুরের উইকেট পর্যবেক্ষণ করতে দেখে চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলের এক ক্রিকেটারের কটাক্ষ, ‘ভাই, যতই দেখিস কোনো লাভ নেই! এই উইকেট বোঝার সাধ্য কারোর নেই।’ তাই তিনি নিশ্চিত যে টস জয়ী অধিনায়ক চোখবুজে প্রথমে ফিল্ডিং করবেন। চট্টগ্রাম, বিকেএসপি কিংবা ফতুল্লার ম্যাচে আবার ব্যাটিংয়ে উন্মুখ থাকবে যেকোনো দল। তবে বরিশাল কিংবা রংপুরের উইকেট কেমন আচরণ করবে, কেউ জানে না। এর-ওর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, শুধু রাজশাহী ও বগুড়ার উইকেট রোমাঞ্চ জাগায় ক্রিকেটারদের মনে। ‘স্পোর্টিং উইকেট। ব্যাটে-বলের সমান লড়াই হয় রাজশাহী আর বগুড়ায়’, দীর্ঘদিন জাতীয় লিগ খেলার অভিজ্ঞতা থেকে সার্টিফিকেট দিয়েছেন ইলিয়াস সানি। তাঁর সঙ্গে কারো দ্বিমতও নেই।

 

তবু দেড় যুগ আগের চেয়ে উইকেটের অবস্থা অনেক ভালো। শুরুর দিকে তো হাঁটুর ওপর বলই উঠত না, পেসারের বল গড়িয়ে স্টাম্প ভাঙতে দেখেছি। সেই ‘ছুররি’ উইকেট এখন নেই। তবে শতভাগ ব্যাটিং সহায়ক ‘পাটা’ কিংবা ধীরগতির ‘ধ্যান্দা’ উইকেটে কেন ঘরোয়া ক্রিকেটের ম্যাচ হবে? বিকেএসপি মাঠের সেঞ্চুরিয়ানকে নিয়ে কেন হাসাহাসি হবে ক্রিকেটের অন্দরমহলে? কেনই বা বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়ক সাকিব আল হাসান বলবেন, ‘আমি ঠিক নিশ্চিত নই জাতীয় লিগ খেললে লাভ হয় কি না!’ দল নির্বাচনীতেও জাতীয় লিগের নৈপুণ্য খুব বেশি গুরুত্ব পায় বলে মনে হয় না। যদিও টেস্ট ক্রিকেটের বেলায় এ আসরটির সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়ার কথা। মৌসুমের শুরুতে সে রকম বলাও হয় নির্বাচকদের পক্ষ থেকে। কিন্তু দল নির্বাচনের পর মনে হয় তাঁরাও যেন জাতীয় লিগে ক্রিকেটের মান নিয়ে সন্দিহান। ঘটা করে বলাও হয় যে ঘরোয়া আর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মান এক না।

সেটা কে না বোঝে! তবে এ কথাটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় বাংলাদেশে। বিসিবির দায়িত্বশীল জায়গায় বসে এ ধরনের নিরাশা ব্যক্ত করা যে লজ্জা সেটি তাঁরা কেউ কেন যে অনুধাবন করেন না! তা ছাড়া ঘরোয়া ক্রিকেটের এ মানহীনতার দায়দায়িত্ব যে তাঁদের ওপর অনেকাংশে বর্তায়, সেটিও সম্ভবত গায়ে মাখেন না!

অবশ্য ঘরোয়া এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যবধান নিয়ে হৈচৈটা সবচেয়ে খারাপ লাগার কথা খেলোয়াড়দের। বিশেষ করে যাঁরা জাতীয় লিগে পারফরম করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নাম লেখানোর আশায় দিন কাটান। গতকাল এ নিয়ে জাতীয় দলের বাইরে থাকা কয়েক ক্রিকেটারকে খোঁচাখুঁচি করেও অবশ্য উত্তেজিত করা গেল না। সবচেয়ে আশঙ্কার জায়গা সম্ভবত এটাই! জাতীয় দলের কয়েক খেলোয়াড়ের মতো তাঁরাও যেন বিভাগীয় দলে নাম তুলতে পেরেই খুশি!

জীবনে প্রতিকূলতা থাকবেই। সে প্রতিকূলতা জয় করতে না পারলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঠাঁই করে নেওয়া সত্যিই কঠিন। একজন ক্রিকেটারকে বুঝতে হবে মৌসুমে এক-দুটি সেঞ্চুরি নয়, এমন কিছু করতে হবে যেন নির্বাচকরা বাধ্য হন দল নির্বাচনী সভায় তাঁকে নিয়ে আলোচনা করতে। গত দুই মৌসুম ধরে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে বাংলাদেশের সবচেয়ে আলোচিত ব্যাটসম্যান ৩৭ বছর বয়সী তুষার ইমরান। বোলিংয়ে এখনো ‘ম্যাচ উইনার’ তাঁর সমসাময়িক আব্দুর রাজ্জাক। অভিনন্দন তাঁদের। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এখনো তাঁদের পেছনে ফেলার মতো ক্রিকেটার উঠে আসেনি? তবে কি প্রতিকূলতার দেয়াল ভাঙার ক্ষুধাটা নেই একালের ক্রিকেটারদের? এক সিনিয়র ক্রিকেটার তেমন অনুযোগই করেছেন।

এবার বিপ টেস্টে বসিয়ে জাতীয় লিগে অংশগ্রহণের টিকিট দেওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক আলোচনা হয়েছে। তবে বিস্ময়কর হলো, অনেক সিনিয়র ক্রিকেটার সে পরীক্ষায় উতরে গেলেও জুনিয়র পর্যায়ের দুই ক্রিকেটার ‘ফেল’ করেছেন, যদিও তাঁরা বছরজুড়ে ট্রেনিংয়ে ব্যস্ত থাকেন! অথচ সারা বছর বসে থেকে আচমকা পরীক্ষা দিয়েও অনেকে পাস করেছেন। তাই জানতে ইচ্ছা করে, ওই দুই ক্রিকেটার এত দিন কী অনুশীলন করলেন? তাঁদের প্রশিক্ষকই বা কী পর্যবেক্ষণ করলেন এত দিন?

আসলে আমাদের ঘাটতি পর্যবেক্ষণে। জাতীয় লিগের বাই লজ আর দল গঠনে সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বিসিবির। কিন্তু এরপর নেতৃত্বের লাগাম তুলে দেওয়া হয় আঞ্চলিক প্রতিনিধির হাতে। তাতে লজিস্টিকস থেকে একাদশ গঠন নিয়ে বিস্তর ফিসফাস চলে। এই যেমন, জাতীয় লিগের প্রস্তুতি নিয়ে সব শেষ সভার সিংহভাগ সময় ব্যয় হয়েছে হোটেল আর খাওয়া নিয়ে শিশুতোষ আলোচনায়। যদিও ক্রিকেটাররা জানেন এসব আলোচনায় মিলবে লবডঙ্কা! লেগ স্পিনার খেলানোর নির্দেশনাও রক্ষা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অতীতে এসব নির্দেশনায় কোনো সুফল মেলেনি যে!

আরো বড় ক্ষত আছে জাতীয় লিগে। প্রতিপক্ষের পয়েন্ট হরণ করার নামে পিছিয়ে থেকেও প্রথম ইনিংস ঘোষণা করার হঠকারিতার অনেক উদাহরণ আছে জাতীয় লিগে। নিজেদের অবনমন ঠেকানোর বিনিময়ে প্রতিপক্ষের শিরোপা জয়ে ‘অবদান’ রাখার অভিযোগও আছে।

এগুলোর নজরদারি কে বা কারা করবেন? এ দায়িত্ব অবশ্যই বিসিবির। কিন্তু সমস্যা হলো পুরো টুর্নামেন্টটি নিজেদের অর্থায়নে হলেও নজরদারির ব্যাপারে কঠোর হয় না বিসিবি। জেলা ও বিভাগীয় ভোট ব্যাংক আছে না!

এ কারণেই আরেকবার পর্বতের মূষিক প্রসব দেখার ভয় হয়। এই এত দিন পরও। গোছানো পোশাকও তাড়াতে পারে না পুরনো শঙ্কা।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা