kalerkantho

শনিবার । ১৪ চৈত্র ১৪২৬। ২৮ মার্চ ২০২০। ২ শাবান ১৪৪১

ক্যাসিনোয় ধসে গেল ক্লাব ঐতিহ্য!

‘খেলা এবং সমাজের প্রতি ক্লাবগুলোর দায়বদ্ধতা থাকল কোথায়? ক্রীড়া তো সমাজ গঠনের একটি মাধ্যম, কয়েক দিনে সব কিছু সামনে চলে আসার পর একজন বাবা কী করে তাঁর ছেলেকে ক্লাবে পাঠাবে খেলাধুলার জন্য!

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ক্রীড়া প্রতিবেদেক : বৈধ হাউজি থেকে কার্ড রুমের জুয়া। এরপর ক্যাসিনোতে উত্তরণে ক্লাব পাড়ায় মহা বিস্ফোরণ। ঐতিহ্যবাহী স্পোর্টিং ক্লাবগুলোর ক্রীড়া ঐতিহ্য ধুলোয় মিশিয়ে আলোচনার মূল বিষয় হয়ে গেল জুয়া খেলা—‘ক্যাসিনো কালচার’!

ক্লাবগুলো এই কালচারে ঢুকেছে খুব বেশি দিন হয়নি। ২০১৫-১৬ সাল থেকে ক্যাসিনোর সংক্রমণ শুরু হয় আরামবাগের ক্লাব পাড়ায়। শুধু চারটি ক্লাব—ওয়ারী, আজাদ স্পোর্টিং, সোনালী অতীত ক্লাব ও মেরিনার্স বাদ দিলে আরামবাগের বাকি ক্লাবগুলোতে এই রোগের প্রকোপ ভয়াবহ। ইয়ংমেন্স ফকিরেরপুল, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও মোহামেডান স্পোর্টিং লিমিটেডের আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গেছে এই রোগ। তবে এই বিষ প্রথমে কোন ক্লাবে ঢুকেছে, সেটি কেউ নিশ্চিত করতে পারেননি। এত দিন ক্যাসিনোর ব্যাপারটি ঢাক ঢাক গুড় গুড় হয়ে থাকলেও মুখোশ খুলে ফেলার পর সবার মুখে উল্টো কুলুপ। কেউ কথা বলতে চান না স্বনামে। এক ক্লাব সদস্য বছরখানেক আগে ক্লাবে গিয়েই জানতে পারেন ক্যাসিনোর খবর, ‘ক্যাসিনোর ঝলমলে পরিবেশ দেখে চমকে গিয়েছিলাম। হরেক রকমের বোর্ড, ৯০ ইঞ্চি টিভি স্ক্রিন। খেলার পাশাপাশি খাবার-দাবার, মদ-বিয়ার সবই আছে। একটু দেখেই বেরিয়ে এসেছিলাম।’ ক্লাবের বহিরঙ্গের চেহারা জীর্ণ হলেও ভেতরের ওই ক্যাসিনো রুমের সজ্জা দুর্দান্ত। রুলেট, রামিসহ অর্থ হরণের নানা খেলার আয়োজন। 

ক্লাব সদস্য বলে ওই সংগঠকের জন্য ক্যাসিনোর দুয়ার খোলা ছিল। তাই বলে অচেনা-অপরিচিত লোক ঢুকতে চাইলে পারবে না। প্রথমে ঢুকতে গেলে কারো রেফারেন্স লাগবেই। বিশেষ করে যারা নিয়মিত খেলে তাদের রেফারেন্স থাকলে নাকি কোনো সমস্যা হয় না। যারা সমস্যা করার সেই মতিঝিল থানার ৩০০ গজের মধ্যেই সব ক্যাসিনো, তারা যখন চুপচাপ তখন অয়োজকদের ভয়ের কিছু থাকে না। তাই বছর দুয়েক কিছু পেশাদার লোক ছাড়া সবার জন্যই ক্যাসিনো একরকম উন্মুক্ত। বড়-ছোট, ধনী-গরিব কারো বেলায় বাধা নেই, এক-আধজন পরিচিত থাকলেই হয়। মতিঝিলে চাকরি শেষ করেও প্রতিটি দিন শেষে এক দলের নিয়মিত ক্যাসিনোতে যাওয়ার অভ্যাস গড়ে ওঠে। স্বল্প আয়ের লোকজনকেও পেয়ে বসেছে এই নেশা। জুয়া এমন এক ছন্নছাড়া নেশা, তাতে মজে গেলে আর রক্ষা নেই। বছর দুয়েক আগে এমনও ঘটেছে। অরামবাগের এক ফ্ল্যাট মালিক তাঁর ফ্ল্যাটে থাকা কয়েকজন ছাত্রকে উদ্ধার করেছে এক ক্লাবের ক্যাসিনো থেকে। তারা সবাই ছিল নটর ডেম কলেজের ছাত্র। মানে ছাত্ররাও ক্যাসিনোয় আসক্ত!

এখানেই এক সংগঠক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘খেলা এবং সমাজের প্রতি ক্লাবগুলোর দায়বদ্ধতা থাকল কোথায়? ক্রীড়া তো সমাজ গঠনের একটি মাধ্যম, কয়েক দিনে সব কিছু সামনে চলে আসার পর একজন বাবা কী করে তাঁর ছেলেকে ক্লাবে পাঠাবে খেলাধুলার জন্য! অথচ দেশে সুষ্ঠু ক্রীড়া চর্চার জন্য সরকার ৯৯ বছরের লিজে জায়গাগুলো দিয়েছে ক্লাবগুলোকে। তারা একসময় খেলাধুলায় মেতে থাকলেও এখন ক্লাবের সাইনবোর্ডের আড়ালে চলে জুয়া খেলা।’ শুরু থেকে হাউজি খেলার বৈধতা আছে ক্লাবগুলোতে। এ জন্য ডিসি অফিস থেকে প্রতিবছর অনুমতি নিতে হয় তাদের। ক্লাবের অর্থের উেসর কথা ভেবেই সরকার অনুমতি দেয় হাউজি খেলার। এর পাশাপাশি ওয়ান-টেনও চলত।

এরপর একসময় আলাদা আলাদা কার্ড রুম হয় ক্লাবে, সেখানে চলে তাসের জুয়া। প্রতি রুম থেকে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা করে আয় হয়। তবে ’৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম ক্ষমতায় আসার পর বন্ধ করে দিয়েছিল ক্লাব পাড়ার জুয়া। কয়েকটি ক্লাবের কর্মকর্তারা তখন গিয়েছিলেন ওই এলাকার (এখন বিভক্ত হয়ে গেছে) সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীর কাছে। তাঁরা যুক্তি দেখিয়েছিলেন, কার্ডের জুয়া থেকে ক্লাবের কিছু আয় হয়, যা খেলাধুলায় কাজে লাগে। কিন্তু ১৯৯৮ সালে তিনি পাল্টা বলেছিলেন, ক্লাবের আয়ের জন্য জুয়া ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে যেতে।

কোনো বিকল্প প্রস্তাব না যাওয়ায় আয়ের নতুন কোনো পথও বের হয়নি। এটাও ঠিক, খেলা চালাতে গেলে অর্থের প্রয়োজন আছে। এই অর্থের জোগান দেবে ক্যাসিনোর জুয়া, এটাও বা হয় কী করে! ক্রীড়া আর জুয়া কখনো যে হাত ধরাধরি করে চলতে পারে না। বিকল্প হতে পারে, ক্লাবের লিজ নেওয়া জায়গায় বহুতল ভবন তুলে যদি ভাড়া দেওয়া যায়। সবই সরকারি জায়গা, সিদ্ধান্ত দেওয়ার মালিকও সরকার। তবে ক্যাসিনোর ভূত তাড়িয়ে নতুন করে বাঁচার উদ্যোগ নিতে হবে ক্লাবগুলোকেই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা