kalerkantho

শুক্রবার । ১৫ নভেম্বর ২০১৯। ৩০ কার্তিক ১৪২৬। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪১     

দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সেরা তারকা আমি

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ১৭ মিনিটে



দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সেরা তারকা আমি

ছবি : মীর ফরিদ

বিশ্বজয়ের নেশায় মেতেছেন রোমান সানা। বিশ্ব আর্চারির তারকাদের এফোঁড়-ওফোঁড় করে তাঁর তীর ছুটছে লক্ষ্যে। গত জুনে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জেতার পথে পেয়েছেন টোকিও অলিম্পিকের টিকিট। এরপর এশিয়া কাপে এককে সোনাসহ রিকার্ভের তিন ইভেন্টে পদক জিতে নতুন ইতিহাস গড়ে ছোট খেলার বড় তারকা হয়ে উঠেছেন এই তীরন্দাজ। পাশাপাশি খেলাটিকেও ক্ষুদ্রতার মোড়ক ছাড়িয়ে নিয়ে চলেছেন বিশালতার দিকে। রোমানের এই ব্যক্তিগত এবং সামগ্রিক এগোনোর গল্পগুলো হতে পারে অন্য ছোট খেলাগুলোর অনুপ্রেরণা। সেই গল্পগুলোই বলেছেন তিনি কালের কণ্ঠ’র সনৎ বাবলাকে।

 

প্রশ্ন : আপনার ক্যারিয়ারের চারটি মাস যেভাবে কেটেছে, তাতে ঘোরের মধ্যে থাকার কথা!

রোমান সানা : আমার কাছেও অবিশ্বাস্য মনে হয়। বিশেষ করে গত জুনে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে পদক জয়, অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন—এসব যেন হঠাৎ করে হয়ে গেছে। এটা স্বপ্নপূরণ, তবে তা এমন এক কঠিন স্বপ্ন, যা হুট করে বাস্তব হয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে আমি ভাবতে পারিনি। মাঝেমধ্যে এই ভাবনাটা মাথায় এলে নিজেই ঘোরের মধ্যে চলে যাই।

প্রশ্ন : আর্চারি এ দেশে একদম নতুন, ১৭ বছরের মতো বয়স। যা কিছু বড় সাফল্য কিংবা অর্জন হবে, সবই নতুন। মানে পথ দেখানোর মতো কেউ নেই। এই খেলায় আপনার হাতেখড়ির সময় কি এমন রাঙানো সময় কল্পনা করতে পেরেছিলেন?

রোমান : মানুষ সাধারণত যে বয়সে খেলাধুলা শুরু করে, সেই স্কুলজীবনে বোধ হয় কারো মধ্যে স্বপ্নটপ্ন খুব কাজ করে না। খেলার আনন্দটাই থাকে মুখ্য। খেলতে খেলতেই একসময় মোহ তৈরি হয়, হয়তো একটা লক্ষ্যও ঠিক হয়। আমার নির্দিষ্ট লক্ষ্য বলতে ছিল ভালো কিছু করা। আমি যখন শুরু করি তখন দেখি মিলন ভাই এই খেলার তারকা, তিনি অলিম্পিকে খেলেছেন, অংশ নিয়েছেন অন্যান্য আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে। সেটা অনুপ্রাণিত করেছিল আমাকে। পরে নিজে কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিটে খেলতে খেলতে লক্ষ্যটা বড় হওয়ার পাশাপাশি বিস্মিত হয়েছি বিশ্বের বড় বড় তীরন্দাজদের দেখে। বড় সাফল্য পেতে গেলে, এঁদের হারাতে হবে—নিজের ভেতর এই সাহস তৈরি করাও কঠিন। এরপর তিনটি বিশ্বকাপ খেলতে খেলতেই আসলে নিজের অবচেতনে সেই সাহসটা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। আমি এখন বুঝতে পারি, ওই বিশ্বকাপগুলো না খেললে নিজে তৈরি হতে পারতাম না, আর ওই ভয়টাও কাটত না। ওই সবেরই ফল হলো আমার জুনের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জয়।

প্রশ্ন : আর্চারিতে আপনার হাতেখড়ি ২০০৮ সালে। খেলা শুরুর ১১ বছরের মাথায় পেয়েছেন বড় সাফল্য।

রোমান : তখন আমি খুলনার শিশু মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে পড়ি। একদিন আমাদের হাসান স্যার বলেন, ‘আর্চারি নামের একটি খেলা শুরু হয়েছে দেশে। এটার জন্য খেলোয়াড় বাছাই করতে ঢাকা থেকে কয়েকজন এসেছেন, তারা কয়েক দিন ট্রেনিং দেবেন তোমাদের। ভালো করলে ঢাকায় নিয়ে যাবে, উন্নত ট্রেনিং হবে, তারপর জাতীয় দলে খেলবে তোমরা।’ শুনে খুব একটা আগ্রহ জাগেনি। খেলার নাম আর্চারি, ক্রিকেট-ফুটবলের তুলনায় কিছুই না। তখন আমি ভালো ক্রিকেট খেলি। প্রথম দিন আর্চারির ট্রেনিংয়ে যাইনি, বকাঝকা করলেন হাসান স্যার। পরের দিন বাধ্য হয়ে ট্রেনিংয়ে অংশ নিলাম। সাজ্জাদ ভাই (সিনিয়র আর্চার) গিয়েছিলেন খেলা শেখাতে এবং ট্রায়াল নিতে। বাঁশের ধনুক, তার পেছনে সাইকেলের রাবারের টিউব বাঁধা। সেটা টেনেই ছুড়তে হয় তীর। একটু মজা লাগে, কারণ গুলতি দিয়ে পাখি শিকারের অভ্যাস আছে আমার। দুটোর মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়ায় আগ্রহ তৈরি হয় খানিকটা। তিন দিন ট্রেনিংয়ের পর ৪৫ জনের মধ্যে পাঁচজনকে মনোনীত করে, তার মধ্যে আমি একজন। মা-বাবাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ঢাকা আসি এক মাসের ট্রেনিংয়ে। ওই সময় ১২টি জেলা থেকে ৪৩ জনকে বাছাই করে আনা হয়েছিল বিকেএসপিতে। সেখানে এক মাসের ট্রেনিং শেষে আমি হয়ে গেলাম প্রথম। মূলত ঢাকায় অনুষ্ঠিত ২০১০ এসএ গেমস উপলক্ষে হয়েছিল এই বাছাই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলো, মা-বাবার অনুমতি পাইনি বলে আমার খেলা হয়নি সেই এসএ গেমসে।

প্রশ্ন : তাঁরা অনুমতি দেননি কেন?

রোমান : তখন খেলা বলতেই ক্রিকেট ফুটবল, এর বাইরে কেউ ভাবতে পারত না। আবার নতুন খেলা আর্চারি নিয়ে তাঁদের বোঝানোও কঠিন। এই খেলা খেলে কী হবে, এটা ছিল তাঁদের প্রশ্ন। স্বাভাবিকভাবে আমার কাছেও এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না। তাই ছেলের আর্চারিতে যোগ দেওয়া তাঁদের কাছে ছিল সময় ও অর্থ নষ্টের নামান্তর। এর চেয়ে বরং লেখাপড়ায় মনোযোগ দিতে বললেন বাবা-মা। সামনে এসএসসি পরীক্ষাও ছিল। মা-বাবা আসতে না দিলেও আমার আগ্রহ কিন্তু একেবারে ফুরিয়ে যায়নি। যোগাযোগ ছিল আর্চারির তখনকার কোচ নিশীথ দাসের সঙ্গে। খুলনায় তাঁর শ্বশুরবাড়ি ছিল, সুবাদে তিনি মাঝেমধ্যে খুলনায় যেতেন। নিশীথ স্যার আমাকে স্নেহ করতেন এবং বলেছিলেন পরীক্ষার পর তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে। তা-ই করি এবং মা-বাবাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে ২০১০ সালে ঢাকায় আসি। বিকেএসপিতে প্র্যাকটিস শুরু করি।

প্রশ্ন : ২০১০ সালের এসএ গেমসের পর পরীক্ষা শেষে আপনি ঢাকায় আসেন এবং সেই বছরই প্রথম জাতীয় আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেন।

রোমান : হ্যাঁ, সে বছরই আমি প্রথম ন্যাশনাল খেলি। তার জন্য আমাকে আলাদা করে প্র্যাকটিস করিয়েছিলেন নিশীথ স্যার। তখন মিলন-সাজ্জাদ-সজীব ভাইরা প্র্যাকটিস করছিলেন কমনওয়েলথ গেমসের জন্য। স্যার তৈরি করছিলেন আমাকে ন্যাশনাল মিটের জন্য। জাতীয় আর্চারিতে রিকার্ভ মিক্সড ডাবলসে আমি বিকেএসপিকে হারিয়ে রুপা জিতে নিজের ওপর বিশ্বাস খুঁজে পাই। ওই পদকই আমার আর্চারির প্রথম আনন্দ, আত্মবিশ্বাস ও সামনে এগোনোর প্রেরণা।

প্রশ্ন : এরপর নিশ্চয়ই মা-বাবা মত বদলান?

রোমান : সব মা-বাবা সব সময় সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় ব্যাকুল থাকেন। তাঁরা প্রথাগত চিন্তা করেন লেখাপড়ার মাধ্যমে ছেলেকে গড়ে তোলার। তা ছাড়া ১৪-১৫ বছর আগে আমাদের পরিবারের ওপর দিয়েও ঝড় বয়ে গিয়েছিল। আমাদের বাড়ি খুলনার কয়রা উপজেলায়, বাবার ছিল মাছের ঘেরের ব্যবসা। নানা ঝামেলায় সেসব ব্যবসা, পৈতৃক ভিটা ছেড়ে বাবা পুরো পরিবার নিয়ে চলে আসেন খুলনা শহরে। অনেক টাকা-পয়সা নষ্ট হয়। আমরা দুই ভাই ও এক বোনকে মানুষ করবেন বলে বাসা ভাড়া করে শহরে থাকতে শুরু করেন। একটি মাছের ঘেরে চাকরি নেন বাবা। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারে তখন তিনিই ছিলেন একমাত্র রোজগেরে মানুষ। অনেক টানাপড়েনের মধ্যে তাঁর পক্ষে আমার খেলার খরচ বহন করা কঠিন ছিল। তিনি বলতেন, কী এক খেলা খেলো, বাসা থেকে টাকা নিয়ে যেতে হয়! ২০১০ থেকে তিন বছর আমি আর্চারি খেলেছি বাড়ি থেকে টাকা এনে। তাই এই খেলার ওপর বাবা অত ভরসা রাখতে পারতেন না। তবে আমার ভরসা তৈরি হয়েছিল। ওই ন্যাশনালের পরের দুই-তিন বছর আমি কয়েকটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার পর বিশ্বাস করতাম, একদিন ভালো কিছু করতে পারব। সেটা আম্মাকেও বলতাম। শুনে তিনি হাসতেন আর লুকিয়ে আমাকে টাকা দিয়ে দিতেন।

প্রশ্ন : আপনার সেই বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত সত্যি হলো।

রোমান : পরিস্থিতি এখন অনেক বদলে গেছে। বাবা বাইরে বের হলে ছেলের প্রশংসা শোনেন। শহরে-গ্রামে আমাকে চেনে অনেকে। আমার সাফল্যে তারাও আনন্দিত হয়, গৌরব বোধ করে। আমার জন্য দোয়া করে। আমার পরিবারের সেই কষ্টের দিনগুলোও ফুরিয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে আমি আয় করি, শহরে জায়গাও কিনেছি। একটি সুন্দর বাড়ি করে মা-বাবাকে নিয়ে রাখতে পারলেই সব পরিশ্রম আমার সার্থক হবে।    

প্রশ্ন : যে আর্চারিকে নিয়ে শুরুতে অনেক সংশয় তৈরি হয়েছিল, সেটিই হয়ে গেছে আয়ের উৎস!

রোমান : ২০১৩ সালে অষ্টম বাংলাদেশ গেমসে আমি রিকার্ভ এককে এবং দলগতে সোনা জেতার পর আনসার চাকরির প্রস্তাব দেয় আমাকে। প্রতিদিন অফিস করতে হবে না, শুধু তাদের হয়ে খেলতে হবে। তাতেই আমি রাজি হয়ে যাই। এই চাকরি আমার খেলাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। বাড়ি থেকে আর টাকা আনতে হয় না, উল্টো কিছু পাঠাতে পারি। আমি নিশ্চিন্তে নিজের পারফরম্যান্স উন্নতির চেষ্টা করে যাই। আমার হিসাবটা ছিল, আরো ভালো করলে বোধ হয় আরো বড় জায়গা থেকে প্রস্তাব পাব। আয়ের সুযোগ আরো বেড়ে যাবে।

প্রশ্ন : লেখাপড়া?

রোমান : সেটা এইচএসসি পর্যন্ত। আমার লেখাপড়া করতেও ভালো লাগে না। আর্চারির নেশায় মেতে উঠি।

প্রশ্ন : তাতে বোধ হয় আপনার প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল ২০১৪ সালে এশিয়ান গ্রাঁপ্রিতে সোনা জয়?

রোমান : এর আগে আমি পাঁচ-ছয়টি আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নিলেও কিছু পাইনি। থাইল্যান্ডে ওই গ্রাঁপ্রিতে (বর্তমানে যা এশিয়া কাপ) সোনা জিতে নিজেই চমকে গিয়েছিলাম। খুব কঠিন ম্যাচ ছিল কোয়ার্টার ফাইনাল, অলিম্পিক গেমসে রুপাজয়ী জাপানি আর্চার তাকাহারু ফুরুখাওয়ার বিপক্ষে ছিল ম্যাচটি। তাকে হারাতে পারব, সেটা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। আমার কোচ-কর্মকর্তারাও ভাবেননি। কিন্তু বাস্তবে তা-ই হয়ে গেছে, এত বড় ম্যাচ জেতার পর সেমিফাইনাল ও ফাইনাল সহজ হয়ে যায়। দুই ম্যাচে দুই রাশিয়ান আর্চারকে হারিয়ে সোনা জিতি। নাম এশিয়ান আর্চারি হলেও এগুলো উন্মুক্ত টুর্নামেন্ট, এখানে ইউরোপিয়ানরাও অংশ নেন। এটা শুধু আমার প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্য নয়, ওই অলিম্পিয়ান রুপাজয়ীকে হারানোর ম্যাচটা যেন অনেক বড় স্বপ্নের দিকে ঠেলে দিয়েছিল আমাকে। এ রকম এক তারকাকে হারাতে হলে দক্ষতা ও মানসিক শক্তি দুই-ই লাগে। ওই টুর্নামেন্টে প্রথম আমি টের পাই আমার মধ্যে দুটোই আছে। আরেকটা হলো, আমি খুব সহজে ভেঙে পড়ি না।

প্রশ্ন : ২০১৪ সালে প্রথম অলিম্পিক পদকজয়ীকে হারিয়েছেন। পাঁচ বছর পর গত জুনে নেদারল্যান্ডসে ব্রোঞ্জ জিতেছেন বিশ্বের অনেক বড় বড় তারকাকে পেছনে ফেলে। বিশ্বের দুই নম্বর খেলোয়াড় কোরিয়ান কিম উ-জিন, র‌্যাংকিংয়ে চার নম্বর ইতালিয়ান মাওরো নেসপলি ও সাত নম্বর ডাচ আর্চার ভেন ডেন বার্গকে হারিয়েছেন। এটা কী করে সম্ভব?

রোমান : যাঁদের নাম বলেছেন তাঁরা একেকজন আর্চারির মহাতারকা। কিম উ-জিন রিও অলিম্পিকে দলগতে সোনা জেতা ছাড়াও ওয়ার্ল্ড কাপ ও ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছেন। মাওরো নেসপলি লন্ডন অলিম্পিকের সোনাজয়ী আর্চার, বেইজিং অলিম্পিকে জিতেছিলেন রুপা, সঙ্গে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের বড় বড় অর্জন তো আছেই। এঁদের মতো তারকাদের আপনি বলে-কয়ে হারাতে পারবেন না। তাঁদের কাছে আমি আগে হেরেছি। যেমন বিশ্বের সবচেয়ে অভিজ্ঞ আর্চার ইতালির নেসপলির কাছে আমি ২০১৫ সালে ডেনমার্কে হেরেছিলাম শেষ ষোলোর ম্যাচে। তাঁদের তুলনায় আমি এখনো ছোট আর্চার। তবে তাঁদের সঙ্গে লড়াইয়ের সাহস ও শক্তি আমার হয়েছে। এই শক্তিটা সঞ্চয় করেছি আমি তাঁদের সঙ্গে বিভিন্ন ইভেন্টে খেলে খেলে। আমাদের জার্মান কোচ আসার পর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ওয়ার্ল্ড কাপে অংশ নেওয়ার ওপর। ছোটখাটো অন্যান্য টুর্নামেন্টে যতই জিতি ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ না খেললে বড় স্বপ্ন দেখার সাহস তৈরি হবে না কখনো। ওটা বিশ্বের সেরা আর্চারদের মঞ্চ, ওখানে যত খেলব ততই ভয় কাটবে, সাহস বাড়বে। আগের তিনটি বিশ্বকাপ খেলে আমার অর্জন হয়েছে সেটা, বেড়েছে অভিজ্ঞতাও। তাতে করে স্নায়ুচাপে ভুগতে হয় না, নিজের সেরাটা বের করে আনা যায়। খারাপ করলে আমি হারব, এর চেয়ে বেশি কিছু তো হবে না। ঠিক এ রকম ভেবেই আমি বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলেছি, যেসব ম্যাচে নিজের সেরাটা দিতে পেরেছি সেসবে ধরাশায়ী হয়েছেন বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। সুবাদে টোকিও অলিম্পিকের টিকিট এবং বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে প্রথম পদক জয়ের ইতিহাস। 

প্রশ্ন : বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে পদক এবং যোগ্যতা দিয়ে অলিম্পিকে যাওয়াটা বাংলাদেশ আর্চারির ১৭ বছরের ইতিহাসে আলোড়ন তোলা এক ঘটনা। সুবাদে বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে আপনিও এখন বিশ্বের ১০ নম্বর আর্চার, এর পরও নিজেকে ছোট আর্চার মনে করছেন?

রোমান : এক ম্যাচ করে জিতেছি বলে মহাতারকাদের উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই আমার। আমার সম্বল শুধু বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপের একটি ব্রোঞ্জ। আর র‌্যাংকিংয়ে যাঁরা ওপরের দিকে তাঁদের একেকজনের অলিম্পিক পদক আছে এক-দুইটি করে। এর সঙ্গে আছে ওয়ার্ল্ড কাপ ও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের সোনা-রুপার পদক। এ রকম সাফল্য পেলেই হয়তো আমি ছুঁতে পারব তাঁদের। এখন পর্যন্ত তাঁদের তুলনায় আমি ছোট আর্চারই।

প্রশ্ন : বড় আর্চার হওয়ার বড় মঞ্চ টোকিও অলিম্পিক। সেখানেই দুর্দান্ত কিছু হয়ে গেলে...

রোমান : ঠিক বলেছেন, বড় আর্চার হওয়ার বড় মঞ্চ অলিম্পিক গেমস। এটার বিশালত্ব হলো, বিশ্বের সেরা অ্যাথলেটরা আসেন এখানে। এক হাজারেরও বেশি তীরন্দাজ থেকে বাছাই শেষে বিশ্বের ৬৪ জন লড়বে পদকের জন্য। এই গেমসের আকর্ষণ-আয়োজন, উপস্থিত দর্শকদের মুহুর্মুহু করতালি—পুরো পরিবেশটাই আলাদা। আমার মতো নতুন অলিম্পিয়ানকে নার্ভাস করে দেওয়ার সবই আছে সেখানে। তীর কতটা নিখুঁত হলো, সেটা দিয়ে পয়েন্টের বিচার হলেও এই খেলায় আসলে তীরন্দাজের শারীরিক ও মানসিক স্থিতির পরীক্ষা হয়। আমি ঠিকমতো নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম কি না, সেটারই পরীক্ষা। তাই অলিম্পিকে কথা দিতে পারব না। তবে আমার তরফ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে স্বপ্নের মঞ্চে স্বপ্নপূরণের।

প্রশ্ন : পারফরম্যান্সের রং বদলের পেছনে আপনার পরিশ্রম ও প্র্যাকটিস ছাড়া আর কী কী আছে?

রোমান : প্র্যাকটিস প্রধান হলেও আমাদের সারা বছরের ট্রেনিং ক্যাম্পের কথা আলাদা করে বলতেই হবে। বছরে দুইবার মাত্র অল্প সময়ের ছুটি পাই, বাকি সময় কাটে এই টঙ্গীর ট্রেনিং ক্যাম্পে। এ রকম সারা বছর প্র্যাকটিস আর্চারি ছাড়া বোধ হয় অন্য কোনো খেলায় হয় না। এর সঙ্গে জার্মান কোচ যোগ হওয়ায় শুধু আমার নয়, সবার পারফরম্যান্সে ইতিবাচক ধারা দেখতে পাবেন। তাই এখন দলগতে ও মিক্সড ডাবলসে পদক আসছে। আগে দু-তিনটি টুর্নামেন্ট খেলতে পারতাম। এই কোচের প্রেসক্রিপশনে আমরা বছরে এখন চার-পাঁচটি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে খেলার সুযোগ পাই, বিশ্বকাপ আর্চারি ও বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে খেলতে পারি। এসব কারণে আমাদের আর্চারিতে এখন উন্নতি আর উন্নতি। আগে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে রিকার্ভ দলগতে কখনো সেরা ২৪-এ ঢুকতে পারিনি আমরা, এবার সেখানে ৯৬ দলের মধ্যে ১৬-তম হয়েছি। মিক্সড ডাবলসে প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে হারিয়ে এবার শেষ ষোলোতে খেলেছে বাংলাদেশ। এখানে কোচের অনেক অবদান।

প্রশ্ন : আপনার কথা অনুযায়ী, জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখের অবদান অনেক বেশি। সেটা যদি একটু ব্যাখ্যা করতেন...

রোমান : মার্টিন দুর্দান্ত এক কোচ। আমার ইতিহাস গড়ার পেছনে তাঁর ভূমিকা অনেক। কোন আর্চারের কী সমস্যা সেটা বলার আগেই তিনি বুঝে নেন। তারপর সেগুলোর এত সুন্দর সমাধান করেন। তিনি খুব বন্ধুভাবাপন্ন, তাই তাঁর কাছে যেতেও কোনো সমস্যা হয় না আমাদের। সুবাদে প্রতিদিনের ট্রেনিং কোনো আর্চারের কাছে একঘেয়ে মনে হয় না। তাঁর টেকনিক্যাল জ্ঞান এত ভালো, সেটার সুফল শুধু আমরা ভোগ করছি।

প্রশ্ন : কয়েক দিন আগে আপনি বলেছেন, দেশের এক নম্বর খেলা আর্চারি। তুলনায় আপনি ক্রিকেটকে টেনেছেন, কিভাবে এক নম্বর?

রোমান : আমার চেয়ে আপনারা বিবেচনা করলে ভালো হতো। দেখুন, ক্রিকেট ও আর্চারি দুটিই আমাদের খেলা। যেকোনো খেলায় আমাদের কেউ সাফল্য পেলে অবশ্যই আমরা খুশি হই, এখানে কোনো বিরোধ নেই। তা ছাড়া আমিও স্কুলে ক্রিকেট খেলেছি। আমি বলতে চেয়েছি, সাফল্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার দিক থেকে আর্চারি এক নম্বরে। ক্রিকেট কয়টা দেশ খেলে, সেটা সবাই জানে। আর আর্চারি বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নিয়েছিল ৯২টি দেশ। বিভিন্ন দেশের ১০৪ জনের সঙ্গে লড়াই করে আমি প্রথমে ২০-তম হয়েছি র‌্যাংকিং (কোয়ালিফিকেশন) রাউন্ডে। এরপর ব্রোঞ্জ পদকের জন্য আমাকে টানা ছয় ম্যাচ খেলতে হয়েছে, তার আগে কোনোটা হেরে গেলেই আমি বাদ। গত বিশ্বকাপ ক্রিকেটের কথা ধরলে, ৯ ম্যাচের মধ্যে ছয়টি জিতলেই বোধ হয় সেমিফাইনালে উঠত আমাদের দল। যেকোনো ছয়টি জিতলেই হতো। আর্চারির মতো টানা জিততে হয় না। সদ্য শেষ হওয়া এশিয়া কাপ আর্চারিতেও ১৫ দেশের আর্চারদের সঙ্গে লড়ে আমি সোনা জিতেছি, এর আগেও একবার জিতেছি ২০১৪ সালে। পাশাপাশি আমি দুইবারের রানার-আপও। আমাদের ক্রিকেট দল কখনো এশিয়া কাপ জেতেনি। এখন বলেন, দেশের কোন খেলাটি এক নম্বরে?

প্রশ্ন : দলীয় খেলার সঙ্গে ব্যক্তিগত খেলার তুলনা কি সেভাবে করা যায়?

রোমান : ক্রিকেট আমাদের দেশে ভীষণ জনপ্রিয়, এখানেই খেলাটি এগিয়ে। আর্চারির জনপ্রিয়তা পেতে সময় লাগবে, আমরা যদি এগিয়ে নিতে পারি, এই খেলাটিও একসময় অবশ্যই জনপ্রিয় হবে। একসময় আমাদের কাবাডির সুনাম ছিল, এখন তার পাত্তা নেই। আমার মনে হয়, এখন ব্যক্তিগত খেলার দিকে ঝোঁকার সময় হয়ে গেছে আমাদের। আমাদের সরকার এবং ক্রীড়া কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। অলিম্পিক ইভেন্টগুলোর দিকে নজর বাড়াতে হবে।

প্রশ্ন : ওসবে কি সাফল্য আসবে?

রোমান : অবশ্যই আসবে। ভারতীয়রা যদি পারে, আমরা পারব না কেন? ভারত সরকার এই ইভেন্টগুলোতে উন্নতি করতে উঠেপড়ে লেগেছে। আর্চারি, ব্যাডমিন্টন, শ্যুটিং, কুস্তি, বক্সিং, এমনকি অ্যাথলেটিকসেও তারা খুব ভালো করছে। কারণ তারা দেখেছে, অলিম্পিক ও এশিয়াডে পদক জেতা, সংশ্লিষ্ট খেলার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে ভালো করলে তার আলোড়ন হয় বিশ্বব্যাপী। আর আমাদের ব্যক্তিগত ইভেন্টগুলোতে খেলোয়াড়রা খেলারই সুযোগ পায় না। নইলে ওখানেও প্রতিভা আছে। বছরে দু-একটা কম্পিটিশন করে আন্তর্জাতিক সাফল্য পাওয়া যায় না। তাদের প্র্যাকটিসের সুযোগ বাড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক ইভেন্টে অংশ নেওয়ারও সুযোগ দিতে হবে। এগোতে হলে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের সঙ্গে লড়তে হবে, প্রথমে হয়তো হারবে কিন্তু একসময় জিতবেই। আমাদের সিস্টেম বদলাতে হবে, ব্যক্তিগত খেলাগুলোর পৃষ্ঠপোষকতা খুব দরকার। সবাই গিয়ে ক্রিকেটে ভিড় না করে কিছু স্পন্সর কম্পানি যদি ছোট ছোট খেলাগুলোর সঙ্গে থাকে অবশ্যই খেলাগুলো বড় হবে।

প্রশ্ন : আপনার এই বিশ্বাসটা কিভাবে হয়েছে?

রোমান : বিভিন্ন গেমসে একসঙ্গে যখন খেলি, তখন দেখি অন্যান্য ডিসিপ্লিনের খেলোয়াড়দের অবস্থা। আসলে তারা নিজেদের তৈরি করারই সুযোগ পায় না।

প্রশ্ন : আপনাদের সৌভাগ্য যে ফেডারেশনের উদ্যোগ আছে, সঙ্গে পেয়েছেন তীরের মতো একটা পৃষ্ঠপোষক কম্পানি।

রোমান : তীরের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আর্চারির উন্নয়নের জন্য তারা হাত বাড়িয়ে দেওয়ায় আমাদের ট্রেনিং সহজ হয়েছে, রাজীব উদ্দিন আহমেদ চপল স্যারের উদ্যোগ সফল হয়েছে। তিনি এই খেলাটির পেছনে কী পরিশ্রম দেন, তা বলে বোঝানো যাবে না। আমাদের সৌভাগ্য যে, তাঁর মতো সংগঠক খেলাটির সঙ্গে জড়িত।

প্রশ্ন : আমরা শেষের দিকে চলে এসেছি, আপনার ফেভারিট ক্রীড়াবিদ কে?

রোমান : ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। গরিব ঘরে জন্মে তিনি নিজের চেষ্টায় আজ বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার। তাঁর লড়াই এবং সেরা হওয়ার জন্য নিজেকে তৈরি করাটা আমাকে খুব আন্দোলিত করে। মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া রোমান সানাও লড়াই করে এ পর্যন্ত এসেছে।

প্রশ্ন : দেশের সেরা ক্রীড়া তারকা কাকে মানেন?

রোমান : সেটা আমি নিজে। আমার বিবেচনায় অন্য কেউ সেরা নয়। কারণ লড়াই করে, প্রতি পদে পদে নিজেকে প্রমাণ করে টোকিও অলিম্পিক খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছি। পাশাপাশি এই খেলাটিকে সাধারণ মানুষের কাছে নিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, এমন বৈশ্বিক সাফল্যের পরও কোনো কোনো মিডিয়ার ক্রীড়া পুরস্কারে আমি হয়তো বা বাদ হয়ে যাব ক্রিকেটারদের তোপে। দেশের বাইরে যতই সুনাম হোক, দেশে আমি ছোট খেলার এক খেলোয়াড়। এটাই আমাদের নিয়তি!

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা