kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

টাচলাইন থেকে

আফগান আয়না

মোস্তফা মামুন   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



আফগান আয়না

ইতিহাসে ওরা কাবুলিওয়ালা; রহমত-মিনির হৃদয়গ্রাহী গল্প তৈরি হয় ওদের নিয়ে। কাবুলিওয়ালারা এই অঞ্চলে নানা জিনিস বেচতে এলেও এর মধ্যে আয়না কখনো ফেরি করেছিল এমন তথ্য কোথাও নেই। আধুনিক যুগে অবশ্য ক্রিকেটের সঙ্গে অদৃশ্যে ওরা একটা আয়নাও নিয়ে এসেছিল। আর সেই আয়নায় আমরা আমাদের ছবি দেখে শিউরে উঠলাম। শিউরে উঠলেও ওটাই আমাদের ছবি। এবং শুধু আমরা নয়, চিন্তার ক্ষেত্র আরেকটু বাড়ালে এই আয়নায় বিশ্ব ক্রিকেটকেই দেখাচ্ছে অন্য রকম। আমাদের বহু কালের বহু ক্রিকেট-চিন্তাও হাবুডুবু খাচ্ছে আফগান শিক্ষার কাছে।

একটা বাচ্চা কিভাবে বড় হয়! বড় হয় তখনই যখন তার ছোট কেউ পরিবারে আসে। আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে মিলে আফগানিস্তান প্রথম যে কাজটা করেছে, সেটা হলো বাংলাদেশকে বড় বানানো। ছোটত্বটা খসে পড়াতে বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আর আদুরে শিশু নয়, যার যেকোনো ভ্রান্তিকে দেখা হবে ক্ষমার দৃষ্টিতে। এখন বরং নিষ্ঠুর পরীক্ষাগারে। সেই পরীক্ষাগারে মাপকাঠিটা বদলে গিয়ে বাংলাদেশের অর্জন-ব্যর্থতা দেখা হবে নিখাদ ক্রিকেটীয় দৃষ্টিতে। আর তাতে ১৯ বছরে শতাধিক টেস্ট খেলা একটা দেশের, মাত্র তিন নম্বর টেস্ট খেলতে নামা দলের কাছে বিরাট হারকে দেখা হবে ক্রিকেটেরই সামগ্রিক ভাটার টান হিসেবে। মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশের সমর্থকরাও আর এর বিরোধিতা করবে না। করছে না। একে তো আর আইসিসির ষড়যন্ত্র বলে দেখার সুযোগ নেই। ক্রিকেট মোড়লরা মিলে নিশ্চয়ই বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ভুলিয়ে দেয়নি।

একটা ঘটনা খুব মনে পড়ছে। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় সাফ গেমস। এর আগে বেশ কয়েকবার ফুটবলে সোনা হারানোর ফলে সেবার পুরো বাংলাদেশ এমন মরিয়া হয়ে গিয়েছিল যে সোনা না জিতলেই নয়। সুইস ওল্ডরিখ সোয়াবকে কোচ করে আনা হলো। তিনি মধু-টধু খাইয়ে দলকে প্রস্তুত করলেন। মালদ্বীপের সঙ্গে উদ্বোধনী ম্যাচ। তখনো দক্ষিণ এশিয়ান ফুটবলের মানচিত্রে মালদ্বীপ ওদের ভৌগোলিক মানচিত্রের মতোই অদৃশ্য প্রায়। ওদের বিপক্ষে কে কত গোল দেবে, সেটাই প্রশ্ন। বাংলাদেশও বলা যায় হাসি-তামাশাতেই ম্যাচটি শুরু করল। একটি পেনাল্টিও পেল। কায়সার হামিদ সেটা মিস করলেন যেন তামাশা করতে করতেই। মোটের ওপর আজ এত বছর পরও বাংলাদেশ দলের বডি ল্যাঙ্গুয়েজটা স্পষ্ট দৃশ্যায়িত করতে পারি, এমন আয়েশি ভাব, এমন হেলাফেলা যে আমরা তো কয়েক গোলে জিতব। কোনো গোলই হলো না। ম্যাচ ড্র। পরের ম্যাচ নেপালের সঙ্গে জিততেই হবে। গোল খেয়ে গেল বাংলাদেশ। আর সমর্থকদের ধৈর্যের বাঁধও ভেঙে গেল। অবিশ্বাস্য লাগলেও সত্য, পুরো দ্বিতীয়ার্ধ বাংলাদেশের সমর্থকরা নেপালকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। ‘নেপাল-নেপাল’ ধ্বনিতে মনে হচ্ছিল যেন ঢাকার বদলে কাঠমাণ্ডুতে খেলা হচ্ছে। নেপাল ম্যাচ জিতে যায়। বাংলাদেশ হেরে গিয়ে ছয় দলের মধ্যে ষষ্ঠ। আমার হিসাবে সেই রাতে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামেই আসলেই বাংলাদেশ ফুটবলের মৃত্যু। এত বছর আগের অন্য খেলার একটা উদাহরণ উল্লেখ করলাম এ জন্য যে একটা টুর্নামেন্ট-একটা ম্যাচই আসলে ইতিহাসের গতিপথ নতুনভাবে তৈরি করে। কোথাও ওঠায়। কোথাও নামায়। দেশের ফুটবল এর আগেও ধুঁকছিল, তবু মানুষ ভালোবাসা নিয়ে ঠিকই আশা করে যেত, মাঠে দর্শকের অভাব হতো না, ফুটবল কর্তারা তাই ক্ষয়ে যাওয়া তলানিটা দেখতে পাননি। এর আগেও ফুটবলের ডুবুডুবু ছবি বহুবার দেখা গেছে, তবু সেসব সামাল দেওয়া গেছে বলে ওরা মনে করেছিলেন কোনো কিছুতেই কিছু হবে না। ক্রিকেট এখন যেমন মনে করছে। কিন্তু শিক্ষা হলো, পতন হয়ে গেলে আর কিছুতে কাজ হয় না। যতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে ততক্ষণ নানাভাবেই মেরামত সম্ভব। ক্রিকেট এখনো দাঁড়িয়ে আছে। তবে আফগান শিক্ষা কাজে না লাগালে শুয়েও পড়তে পারে। এখনো সময় আছে। খুব বেশি সময় নেই। আফগান আয়নায় তাই যে ছবিটা দেখলাম সেটা খুব ভীতিকর হলেও আবার একভাবে দেখলে বিরাট সুযোগও হতে পারে। এতকাল পর্যন্ত পড়ি পড়ি করেও বাংলাদেশের ক্রিকেট দাঁড়িয়ে থাকছিল বলে ধাক্কাটা ঠিক গায়ে লাগছিল না। ধাক্কা গায়ে না লাগায় এলো ঝড়। ঝড়টাও যদি গায়ে না মাখেন! উড়ে যাবেন।

ধরা যাক, ম্যাচটা আফগানিস্তান না হয়ে অন্য কেউ। শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের মতো সাম্প্রতিক সময়ে সংগ্রাম করতে থাকা দলগুলোর কোনো একটা। ওদের কাছেও এ রকম হার। তবু যুক্তি বের হয়ে যেত। ওরা কত বছর ধরে ক্রিকেট খেলছে। ওদের ক্রিকেট কাঠামো কত পুরনো। আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে এ রকম যুক্তি না থাকায় সুবিধা হয়েছে যে মানতেই হচ্ছে আমরা আসলে ক্ষেত্রবিশেষে তাসের ঘরকে অট্টালিকা ভেবে বসে আছি। আর এখানে আমরা বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ কম খেলি, ঘরোয়া ক্রিকেট কাঠামো দুর্বল—এসব আওড়ানোরও অবকাশ নেই। কারণ, আফগানিস্তান এমন কী বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচ খেলে! ওদের ঘরোয়া ক্রিকেট! ঘরই তো নেই। বেদেদের মতো এখানে-ওখানে খেলে বেড়াচ্ছে। তাহলেও ওদের ক্রিকেটাররা পারে কিভাবে? আফগানিস্তানের সঙ্গে টেস্ট হলে রশিদ খান বা লেগ স্পিন সামলাতে সমস্যা হবে আমরা জানতাম। সেই জানাটা ঠিক ছিল। সঙ্গে এটাও জানতাম, বড় দৈর্ঘ্যের ক্রিকেটের অনভ্যস্ততা এবং ওদের ব্যাটসম্যানদের মার মার কাট কাট খেলার জন্য ব্যাটিংয়ে ওরা পারবে না। সেই জানাটা ভুল ছিল। এই জায়গাতেই অন্য একটা সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। এর মানে তো ওদের ব্যাটসম্যানরা পরিস্থিতি বা খেলার দাবিমতো নিজেদের রূপান্তর ঘটিয়ে নিতে পারেন। অথবা তাদেরই দলে নেওয়া হয়েছে, যারা আসলে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচের মতো করে খেলাটা খেলতে জানে। ঘরোয়া ক্রিকেট আমাদেরও দুর্বল, ওদেরও সবল নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের ঢাল এখানে খাটছে না। তাহলে বাকি থাকছে খেলোয়াড়দের নিবেদন করার অক্ষমতা। এবং খুব সম্ভব উইকেট-পরিকল্পনা এসব নিয়ে না মেতে থেকে এটা মেনে নেই আমাদের ক্রিকেটারদের যতটা তারকামূল্য তাদের অনেকেরই বাস্তব মূল্য এর চেয়ে অনেক কম। বোর্ড-সিস্টেম সেসব ঘাটতি আছে, স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, কিন্তু আফগানিস্তানের কাছে টেস্ট হার কিন্তু ক্রিকেট আর ক্রিকেটারদের সামগ্রিক মানকেই প্রশ্নের মুখে নিয়ে এলো। সবার বোধ হয় এই সত্য মানার সময় চলে এসেছে, আমরা নিজেদের যতটা ভালো মনে করি আমরা ততটা ভালো নই। আর মেনে নিলে সুবিধা হবে এই যে সামগ্রিক মান বাড়ানোর পথে যাব। নইলে আমরা তো সব কিছুতে আইসিসি-আম্পায়ার-ষড়যন্ত্র করে নিজেদের ঢেকে রাখি। এবার ঢেকে রাখার উপায় নেই। তবু যদি কেউ উপায় বের করতে চান তিনিই হলেন দেশের ক্রিকেটের শত্রু। আর ছোট্ট দুটি প্রাসঙ্গিক ফুটনোট।

১. আমরা বিদেশি ষড়যন্ত্র-আইসিসি ইত্যাদি নিয়ে বেশি মেতে থাকি বলেই তলার দিকেই ক্ষয়রোগের চিকিৎসাটা হয় না। এটা বাদ দিয়ে নিজেদের অক্ষমতার দিকে চোখ ফেরাই। তাহলে ক্ষমতা বাড়ানোর চাপটা তৈরি হবে। তরুণ খেলোয়াড়রা বাধ্য হবে বহুমুখী মনোযোগ সরিয়ে ক্রিকেট মাঠে নিজেকে আরো আবদ্ধ করতে। কর্তারা বাধ্য হবেন প্রক্রিয়াগত ত্রুটি সারাইয়ে।

২. ক্রিকেটারদের সেই ১৯৯৩ সালের ম্যাচটার দিকে মনোযোগ ফেরাই। আপনাদের অনেকের তখনো জন্ম হয়নি বলে হয়তো জানেন না তখনো মুন্না-সাব্বির-আসলামরা বিরাট তারকা। সেদিন থেকেই আসলে পতনের শুরু। আফগানিস্তানের পর ঢালটা সরে গেছে। আফগানরা তো দেখিয়ে দিল সিস্টেমের দুর্বলতাকেও জয় করা যায় নিজেদের নিবেদন করার আন্তরিক চেষ্টা দিয়ে। বোর্ড আর সিস্টেমের ঢালে লুকাতে চাইলে কে জানে, আফগানিস্তান ম্যাচটা কিন্তু ১৯৯৩-র নেপাল ম্যাচ হয়ে যাবে।

আচ্ছা, আমরা না জানি টেস্ট ক্রিকেটে ভালো করতে হলে সময় লাগে! ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, শক্ত ঘরোয়া কাঠামো না হলে হয় না! আফগানিস্তানের সাফল্য কিন্তু চিরন্তন ক্রিকেট শিক্ষাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে। শত বছর ধরে খেলা দলগুলো লেগ স্পিনার খুঁজে হয়রান হয়, আফগানিস্তানে এরা গণ্ডায় গণ্ডায়। ক্রিকেট কি তাহলে খুবই অর্জনযোগ্য একটা দক্ষতা, যে কেউ কয়েক বছর সিরিয়াসলি খেললেই পারে? প্রশ্ন। সামগ্রিক ক্রিকেটকে ঘিরেই বিরাট প্রশ্ন। সেটা নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে আরেক দিন আলাপ করা যাবে।

আজ শুধু বাংলাদেশেই থাকি। আফগান আয়নায় নিজেদের মুখটা ভালো করে দেখি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা