kalerkantho

বিশ্বাস আর কোচের মাস্টারস্ট্রোকেই এ আবাহনী

কোচ বলেছিলেন ২১ আগস্টের নতুন ইতিহাস গড়তে হলে খেলোয়াড়ের নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এটা বললেই কিন্তু আসে না। তা ছাড়া কোরিয়ান দলের কোচ ঢাকায় পা রেখেই সদর্পে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবল সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আবাহনী কেমন খেলে, সেটাও ভালোভাবে জানি না। আমরা জিততে এসেছি।’ প্রতিপক্ষে যখন এমন সদম্ভ ঘোষণা, তখন স্বাগতিকদের বিশ্বাস টুঁটে যাওয়ারই কথা। তাই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বড় দোলাচল ছিল আবাহনীতে।

সনৎ বাবলা   

২৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিশ্বাস আর কোচের মাস্টারস্ট্রোকেই এ আবাহনী

আবাহনীর আনন্দভুবনে ঘণ্টা দুয়েক কিভাবে কেটে গেছে, টেরই পাওয়া গেল না। সবার মুখে নতুন গল্পের বিস্তার। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভেলায় চড়া এক দল ফুটবলারের পায়ে রচিত হয়েছে বিজয়ের নতুন কীর্তি। নতুন ইতিহাস, যার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ছোট ছোট অনেক বিজয় গাথা। এর একটি হলো সোহেল রানার অবিশ্বাস্য শটে এপ্রিল টোয়েন্টিফাইভের বিপক্ষে আবাহনীর গোল উদ্বোধন।

তাঁর মধ্যে এ রকম গোলের বিশ্বাসটা সঞ্চার করেছেন বেলফোর্ট। গতকাল সোহেল রানাকে সামনে রেখেই এ হাইতিয়ান বলেছেন, ‘সে প্র্যাকটিস মাঠে এ রকম শট অহরহ করে। কিছু গোলে যায়, কিছু বাইরে। তাকে বলেছিলাম শটের সময় শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে রাখবে, তখন লক্ষ্যে যাবে বল। আর ম্যাচেও এ রকম শটে সুযোগ নেবে। এ ম্যাচের আগের দিনও বলেছি একই কথা।’ সোহেল রানাও সায় দিলেন মাথা নেড়ে। এরপর বেলফোর্ট যোগ করেন, ‘সোহেলের গোলের পরই আসলে আমাদের মধ্যে বিশ্বাস তৈরি হয়েছিল।’ উত্তর কোরিয়ানদের চমকে দেওয়ার বিশ্বাসের সূত্রপাত ওই গোলে। গুণে-মানে তারা যতই এগিয়ে থাকুক, আবাহনীর খেলোয়াড়রা লড়বে শেষ পর্যন্ত। এ লড়াই এবং ইতিহাস গড়ার মূল প্রেরণাদাতা দুজন—ম্যানেজার সত্যজিৎ দাশ রূপু ও কোচ মারিও লামোস। রূপু চেষ্টা করেছেন খেলোয়াড়দের মনের বাতিটা জ্বালিয়ে রাখতে, প্রতিদিন বলে গেছেন এককথা, ‘তোমরা মন থেকে বিশ্বাস করলে এ ম্যাচটি জিততে পারবে।’ আর আবাহনীর পর্তুগিজ কোচ ব্ল্যাকবোর্ডে কষেছেন সেই জেতার অঙ্ক।

প্রত্যেক খেলোয়াড়ের মোবাইল ফোনে এপ্রিল টোয়েন্টিফাইভের আগের দুটি ম্যাচের ভিডিও পাঠিয়েছিলেন কোচ। এরপর ব্ল্যাকবোর্ডে এঁকে দেখিয়েছেন ম্যাচ জেতার কৌশল। কোরিয়ানরা যখন আক্রমণে ওঠে, তখন তাদের রক্ষণ একদম ফাঁকা হয়ে যায়। তখনই তৈরি হবে সুযোগ, যদি বেলফোর্ট ও সানডে নিখুঁত কাউন্টার করতে পারেন। এ দুই বিদেশি ফরোয়ার্ডের ওপর তিনি আস্থা রেখেছিলেন ভীষণভাবে। তবে ফরমেশন নিয়ে নাকি বড্ড দ্বিধায় ছিলেন কোচ! লম্বা থ্রো-ইনে দ্বিতীয় গোলের সূত্রপাত করা ডিফেন্ডার রায়হান হাসান বলছেন, ‘আমি কোথায় খেলব সেটা ঠিক হয়েছে ম্যাচের আগের বিকেলে। এর আগে কয়েক দিন ধরে প্র্যাকটিসে আমরা নানা ফরমেশনে খেলেছি। ম্যাচের আগের দিন কোচ জিজ্ঞেস করেছেন আমাকে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড পজিশনে খেলতে পারব কি না। আমি হ্যাঁ বলার পর তিনি ৫-৩-২ ফরমেশনে খেলানোর সিদ্ধান্ত নেন।’ এ মৌসুমে তারা প্রথমবারের মতো খেলেছে এই ফরমেশনে। রক্ষণের ওপরই বেশি জোর দিয়েছিলেন কোচ। কিছু করারও ছিল না। রক্ষণের জন্য মিসরের আলেলদীন ঈসাকে আনার পর জানা গেল আগে লাল কার্ড দেখায় তিনি এই ম্যাচ নিষিদ্ধ। এরপর ইনজুরিতে বাদ পড়েন মামুনুল ইসলাম। এক অর্থে ‘ভাঙাচোরা’ একটি দল নিয়েই লামোস নেমেছিলেন বড় যুদ্ধে!

সোহেল রানাও মানেন এটা—তাঁদের সেরা একাদশ ছিল না, ‘আমাদের নিয়মিত একাদশের অনেক খেলোয়াড় এখন ইনজুরিতে। সেরা একাদশ ছাড়াই এত বড় কঠিন ম্যাচ জিতে গেলাম! কারণ যারা এসেছে, তারাও সেরাটা উজাড় করে দিয়েছে। আসলে সবার সাহস ও কমিটমেন্ট ছিল শতভাগেরও বেশি।’ সতীর্থদের মনে সাহস জোগানো এই মিডফিল্ডারের শুরুর গোলটি এএফসির সপ্তাহের সেরা গোলের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছে। এখন সেরার ভোটিং চলছে। দুর্ভাগ্য হলো এত সুন্দর গোলের লিড ধরে রাখতে পারে মাত্র দুই মিনিট। এরপর কোরিয়ান ক্লাব ম্যাচে ফিরে এলেও নাবিব নেওয়াজ আবার লিড এনে দেন বিরতির আগে। ‘আগের জীবন হলে হয়তো এই গোল মিস করতাম। কিন্তু পরশু গোল করেছি তুমুল আত্মবিশ্বাসে। গোলের আগমুহূর্তেই বুঝতে পারছিলাম আমরা আবার লিড নিচ্ছি’—লিগে ১৭ গোল করা এই দেশি স্ট্রাইকারের যে গোল অভ্যাস তৈরি হয়ে গেছে!

এর পরও যে ঘোর কাটছে না! স্বপ্নের ঘোরের মধ্যেই যেন ধরা দিয়েছে এমন ঐতিহাসিক জয়! নাবিব নেওয়াজ বললেন, ‘তাদের সহজে ছাড় দেব না—এটুকু ভেবেছিলাম। রায়হান হাসান সোজাসাপ্টা বলে দিলেন, ‘জিতব, এই বিশ্বাস আমি করতে পারিনি।’ তবে কোচ বলেছিলেন ২১ আগস্টের নতুন ইতিহাস গড়তে হলে খেলোয়াড়ের নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। এটা বললেই কিন্তু আসে না। তা ছাড়া কোরিয়ান দলের কোচ ঢাকায় পা রেখেই সদর্পে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবল সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। আবাহনী কেমন খেলে, সেটাও ভালোভাবে জানি না। আমরা জিততে এসেছি।’ প্রতিপক্ষে যখন এমন সদম্ভ ঘোষণা, তখন স্বাগতিকদের বিশ্বাস টুঁটে যাওয়ারই কথা। তাই বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বড় দোলাচল ছিল আবাহনীতে।

সেটা এখন অতীত। বেলফোর্ট সেই উত্তর কোরিয়ান কোচের উদ্দেশে বলছেন, ‘তিনি নিশ্চয়ই বুঝে গেছেন বাংলাদেশ কী আর আবাহনী কেমন খেলে।’ তারপর ম্যাচের সারসংক্ষেপটা বলে দিলেন এভাবে, ‘এ ম্যাচটি হলো আমাদের খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ চেষ্টা আর কোচের ট্যাকটিক্যাল জয়। আমাদের কোচের ম্যাচ রিডিং দুর্দান্ত।’ আসলে তা-ই। শুধু গুণে-মানে এগিয়ে থাকলেই হয় না, সঙ্গে লাগে কোচের ম্যাচ জেতার কৌশলও। মারিও লামোসের মাস্টারস্ট্রোকেই এগিয়ে গেল শক্তিতে পিছিয়ে থাকা আবাহনী।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা