kalerkantho

রোমাঞ্চকর জয়ে স্বপ্নের সরণিতে আবাহনী

সনৎ বাবলা    

২২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



রোমাঞ্চকর জয়ে স্বপ্নের সরণিতে আবাহনী

এমন এক রোমাঞ্চকর ম্যাচের কথা কেউ ভাবেনি। হয়তো বা আবাহনীর কোচ-খেলোয়াড়রা ভাবেননি। শক্তিতে অনেক আগুয়ান উত্তর কোরিয়ান ফুটবল ক্লাব এপ্রিল টোয়েন্টিফাইভের বিপক্ষে জেতার প্রত্যাশা করা কঠিন। তাই যাবতীয় শঙ্কা ও সংশয় নিয়েই মাঠে হাজির হয়েছিলেন হাজার তিনেক দর্শক। তাদের চমকে দিয়ে আবাহনী চমৎকার ফুটবল সুরভি ছড়িয়ে উপহার দিয়েছে অসাধারণ এক ম্যাচ। সাত গোলের রোমাঞ্চ ছড়ানো এএফসি জোনাল প্লে-অফ সেমিফাইনালে আবাহনী ৪-৩ গোলে হারিয়েছে এপ্রিল টোয়েন্টিফাইভকে। 

দর্শক হয়ে দেখলে এই ম্যাচে উপভোগের রসদ অনেক। কিন্তু কোচ হলে বোধ হয় ততটা নয়, তাই আবাহনীর কোচ মারিও লামোসের হৃদযন্ত্রে চাপ পড়েছিল ভীষণ, ‘ম্যাচে এমন উত্থান-পতন... দুর্দান্ত এক ম্যাচ। তবে হার্টের জন্য ভীষণ চাপের ম্যাচ।’ তাঁর কথাগুলো অপ্রত্যাশিত জয়ের আনন্দের বহিঃপ্রকাশও। অথচ প্রি-ম্যাচ কনফারেন্সে ছিল ভয়ের বাতাবরণ। সব আলোচনা ছিল আবাহনীর রক্ষণ নিয়ে, একটু এদিক-ওদিক হলেই যেন গোলের বন্যা বয়ে যাবে আকাশি-হলুদের পোস্টে। সেই দল শুরু করে একের পর এক আক্রমণ করে, প্রথম ৭ মিনিটেই পোস্টে দু-দুটি শট স্বাগতিকদের। তাদের এমন নির্ভীক পারফরম্যান্স দেখে একসময় বলাবলি শুরু হলো এপ্রিল টোয়েন্টিফাইভ কী এমন দল। মাঠের আবাহনীতেও যেন তার সঞ্চারণ। ৩৩ মিনিটে আবাহনীর সোহেল রানার দুর্দান্ত গোলে ওই ভাবনাটা যেন আরো জোরালো হয়। সেটা এলেবেলে কোনো গোল নয়, দুর্দান্ত এক মুভে নাবিব নেওয়াজের চমৎকার এক ব্যাকহিলে জায়গা হয়ে যায় সোহেল রানার শটের। বক্সের বাইরে থেকে মুহূর্তে বাঁ পায়ের এক অবিশ্বাস্য শটে তিনি বল জড়িয়ে দেন এপ্রিল টোয়েন্টিফাইভের জালে। উত্তর কোরিয়ানদের ভয়ে যারা পাঁচ ডিফেন্ডার খেলানোর কৌশল নিয়েছে, সেই আবাহনী নিয়েছে লিড। এমন এক শটের লিড, যা সচরাচর দেশি ফুটবলারের পায়ে দেখা যায় না। আর গোলটিই যেন সতীর্থদের মাঝে ছড়িয়েছে আত্মবিশ্বাস। এই লিডের স্থায়িত্ব মাত্র দুই মিনিট হলেও আকাশি-হলুদের বডি ল্যাংগুয়েজ হয়ে গেছে দারুণ ইতিবাচক।

দুই মিনিট বাদেই ম্যাচে ফেরে উত্তর কোরিয়ানরা। ঠিক যেন আবাহনীর ওই মুভের রেপ্লিকা। একজনের ব্যাকহিলে বক্সের ওপর থেকে চো জং হিয়কের শটে সমতায় ফেরে ম্যাচ। গ্যালারিতে নামে খানিকটা হতাশা, তবে নাটক আরো বাকি। ৩৭ মিনিটে রায়হান হাসানের লম্বা থ্রো-ইনে কোরিয়ান ডিফেন্ডার বল ক্লিয়ার করেও পাঠাতে পারেননি বেশি দূর। ওয়ালি ফয়সালের আলতো শট এক কোরিয়ান ডিফেন্ডারের পা ছুঁয়ে সামনে গেলে নাবিব নেওয়াজ অফসাইডের ফাঁদ মুক্ত হয়ে পড়েন। ঠাণ্ডা মাথায় এই দেশি ফরোয়ার্ড বল জালে পৌঁছে দিয়ে আবার এগিয়ে নেন আবাহনীকে। বিরতির আগ পর্যন্ত আর স্কোরলাইনে কোনো পরিবর্তন হয়নি, লিড ধরে রেখে আশা জাগিয়ে তারা বিরতিতে যায়।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে যেন অগোছালো হয়ে পড়ে আবাহনীর রক্ষণ। আক্রমণে বারবার কেঁপে উঠছিল রক্ষণ, তার সুফলও ঘরে তোলে ৫৪ মিনিটে কোরিয়ান রিম চো মিনের গোলে। অনেক চেষ্টা করেও ঠেকাতে পারেননি দক্ষিণ কোরিয়ান ডিফেন্ডার লি তায়ে মিনকে। ওই গোলের পর আবার ম্যাচ ঘুরতে থাকে আবাহনীর দিকে। কাউন্টারে দুর্বার হয়ে ওঠে স্বাগতিকরা এবং ৫ মিনিটে সানডে চিজোবার ম্যাজিকে স্বাগতিকরা লিড নেয় ৪-২ গোলের! এই নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ডকে এর আগে খুব সপ্রতিভ না দেখালেও হঠাৎ তাঁর পায়েই যেন আবাহনীর ভাগ্য খুলতে শুরু করে। টুটুল হোসেন বাদশার লম্বা লবটি ধরে এমন দুর্দান্ত ফিনিশ করেন সানডে। গোলের জন্য মরিয়া হতে গিয়েই কোরিয়ার রক্ষণ ফাঁকা হয়ে যাচ্ছিল। ৫৭ মিনিটে এই সুযোগ নিয়েই নিজের প্রথম গোল করেন সানডে চিজোবা। এরপর ৬১ মিনিটে আরেকটি দুর্দান্ত মুভের শুরু বেলফোর্টের পায়ে। এই হাইতিয়ানের গায়ে গায়ে লেগে ছিল তিন ডিফেন্ডার, তাঁদের ফাঁকি দিয়ে বাড়ান সুন্দর ফরোয়ার্ড পাস। সেটি আয়ত্তে নিয়ে সানডে দুই ডিফেন্ডারকে বডিডজে ছিটকে একটু জায়গা করে বল জালে পাঠিয়ে আবাহনী শিবিরে ছড়িয়ে দেন জয়ের সৌরভ। ৪-২ গোলে লিডের পর তো আর হারা যায় না। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এটা খুব কঠিন হলেও ঠিক কেউ ভরসা রাখতে পারছিল না। শেষ মুহূর্তে গোল খেয়ে হারার বদ অভ্যাস আছে স্বাগতিকদের।

শঙ্কা যে রকম ম্যাচের নিয়তিও যেন সেদিকে মোড় নিচ্ছে! ৭৭ মিনিটে  কোরিয়ানরা ব্যবধান কমায় পার্ক সন রকের গোলে। আরেক গোল করার সময় হাতে অনেক। তা ছাড়া আবাহনীও মাঝমাঠ ছেড়ে দিয়ে নেমে যায় নিচে। উত্তর কোরিয়ানদের চাপে গোল হতে পারে যখন-তখন। সঙ্গে চার মিনিট অতিরিক্ত সময়। বল গিয়ে লাগে আবাহনীর ক্রসবারে, শটে কেঁপে ওঠেন গোলরক্ষক শহীদুল আলম। ভয়-শঙ্কার সময় ফুরিয়ে একসময় শেষ বাঁশি বেজে উঠলে দুর্দান্ত জয়ের উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে আবাহনী। অবিশ্বাস্য ম্যাচের পর আকাশি-হলুদের অকল্পনীয় এক জয়।  

আবাহনী : শহীদুল আলম, রায়হান হাসান, ওয়ালি ফয়সাল, টুটুল হোসেন বাদশা, মামুন মিয়া, সাদ উদ্দিন, সোহেল রানা, নাবিব নেওয়াজ, সানডে চিজোবা, বেলফোর্ট, লি তায়ে মিন।

মন্তব্য