kalerkantho

টাচলাইন থেকে

মজিদ ভাস্কর এবং...

মোস্তফা মামুন

১৫ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



মজিদ ভাস্কর এবং...

‘কলকাতার মাঠে বসে দেখেছেন এমন ক্রীড়াবিদদের মধ্যে সেরা কে?’

‘মজিদ ভাস্কর।’

থ হয়ে গেলাম। মজিদ ভাস্কর! এক-আধটু জানি। ইরানিয়ান এই ফুটবলার আশির দশকের শুরুতে কলকাতা মাত করেছিলেন। তাই বলে, যিনি কলকাতার মাঠে বসে ভিভ রিচার্ডস, গাভাস্কার, মার্শাল থেকে শুরু করে প্রায় সব কিংবদন্তিকে খেলতে দেখেছেন, যাঁদের কারো কারো কিছু কীর্তি ক্রিকেট ইতিহাস বইতে নতুন অধ্যায় তৈরি করেছে, তাঁদের ছাপিয়ে সীমিত পরিমণ্ডলের ফুটবলার মজিদ ভাস্কর! তার ওপর ইনি ক্রিকেট সাংবাদিক। ক্রিকেট বা ক্রিকেটারদের প্রতিই তো পক্ষপাত থাকার কথা।

বিষয়টা মাথা থেকে গেল না। পরদিন তাঁরই সমসাময়িক মধ্যবয়সী আরেক ক্রিকেট সাংবাদিককে একই প্রশ্ন। একটুও না ভেবে উত্তর। মজিদ ভাস্কর।

বছর দশেক আগে এভাবেই জেনেছিলাম কলকাতার হৃদয়ে মজিদ ভাস্কর সোনালি সিংহাসন নিয়ে বসে আছেন। সেই সিংহাসনটা যে কত বড় সেটা জানলাম এই সপ্তাহে। ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের শতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে এই বছর। ইতিহাস-কীর্তি-স্মৃতি সব কিছুকে একাকার করে মহাসমারোহের আয়োজন। তাকে পূর্ণতা দিতে আনা হয়েছে মজিদ ভাস্করকেও। মজিদ নাকি প্রথমে আসতে রাজি হননি, ইস্টবেঙ্গলে খেলেছেন দুই মৌসুম মাত্র, মানুষ তাঁকে মনে রেখেছে এটাই নাকি বিশ্বাস হতে চায়নি। এরপর মাঝখানে মাদক-বিতর্ক-অনিয়ম এসবে জড়িয়ে এমন কর্দমাক্ত পথে চলে গিয়েছিলেন যে একটা হীনম্মন্যতাও কাজ করছিল বোধ হয়। কিন্তু ইস্টবেঙ্গল নাছোড়। শতবর্ষের সেরা বিদেশিকে না আনলে ওদের আয়োজন ঠিক জমে না বলেই মনে হয়েছে। তো শেষে এলেন। ১২ আগস্ট গভীর রাতে। এবং প্রথমবারের চেষ্টায় বিমানবন্দর থেকে বেরোতেই পারলেন না। ওই গভীর রাতেও হাজারো সমর্থক বিমানবন্দরে। মজিদকে একবার দেখবেন। একবার ছোঁবেন। একটি ছবি ওঠাবেন। আশির বাদশা এই ২০১৯-এও অতটা জীবন্ত। শরীর থেকে যৌবন খসে গেছে, পাক ধরা চুলে বীরত্বের লেশ নেই আর, তবু আছেন কী প্রবল উপস্থিতি দিয়ে। শরীর-বয়স সব যায় জৈবিক নিয়মে। কিন্তু ভালোবাসার নিয়ম অন্য। থেকে যায় অনন্ত হয়ে।

পরের কয়েক দিন কৌতূহল থেকে কলকাতার টিভি বা পত্রিকাগুলো অনুসরণ করেছি। আর বিস্মিত হয়ে মাথা নুইয়েছি। বিনোদনের ঋণ বোধ হয় এভাবেই শোধ করতে হয়। বিস্মৃতিতে চলে যাওয়া জনৈক মজিদে ওদের মত্ততা ক্রীড়া অনুরাগী হিসেবে আনন্দময়। কিন্তু আবার মন খারাপও করেছে। তুলনায় এসে মনে হয়েছে আমরা কি আমাদের এখানে ফুটবল রোমাঞ্চ ফেরি করে যাওয়াদের অতটা হৃদয়ে ধরে রেখেছি? বছর কয়েক আগে নাসের হেজাজি মারা গেলেন। সমর্থনের দিক থেকে বিরোধী পক্ষের ছিলেন, কিশোর জীবনে কত মন খারাপের ঘটনা ঘটিয়েছেন এই মানুষটি, তবু সেদিন অদ্ভুত এক শূন্যতা বোধ করলাম। পত্রিকায় মোটামুটি বড় করেই ছাপলাম। সম্ভবত আরো বড় করে দেওয়া উচিত ছিল। দিতে যে পারিনি তার কারণ এই প্রজন্ম আর সময়ের সঙ্গে যে আমরা হেজাজিদের ঠিক সংযোগ ঘটাতে পারিনি। বিভাগের কনিষ্ঠরা আমার বা আমার সময়ের মানুষদের হেজাজি নিয়ে এই আবেগ দেখে একটুখানি অবাক। গুগল আর স্যাটেলাইট যুগে ওরা বিশ্বসেরাদের প্রতি রাতে দেখে। এর তুলনায় কিসের এই হেজাজি। বিশ্বকাপ খেলেছিলেন, তা তো কতজনই খেলেন! যত হেজাজি-সামির শাকির-ঝুকভদের বড় করে দেখানোর চেষ্টা করি ওরা তত নিরুত্সাহ বোধ করে। সত্যি বললে, সেই রাতে মন খারাপের মধ্যে আরো কয়েকটি সত্যও আবিষ্কার করি। আমরা বা আমাদের আগের প্রজন্ম সেই প্রজন্মের কীর্তিটাকে সঠিকভাবে পরিবাহিত করতে পারিনি উত্তর প্রজন্মে। দ্বিতীয় হলো, দূর টিভির তারকা আর চোখের সামনের মাঠের মানুষদের আমরা এখন এক পাল্লায় মাপি। তাতে হেজাজিরা আর জাদুকরের শক্তি নিয়ে হাজির হন না। কোথায় খেলেছেন, কোন পর্যায়ে—এসব অঙ্কের হিসাবে মার খেয়ে যান এঁরা। এই টেলিভিশন, তথাকথিত বিশ্বায়ন ক্রীড়াক্ষেত্রেও থাবা বাড়িয়ে স্থানীয় আবেগকে শেষ করে দিচ্ছে। আমাদের ফুটবল যে শেষ হয়ে গেল এর পেছনে প্রজন্মের এই বিশ্বায়নজনিত ভুলভাল অঙ্কও দায়ী। আর এখানেই মজিদ অনন্য। গভীর রাতে বিমানবন্দরে স্রোত হয়ে যাওয়া মুখগুলো দেখছিলাম। বেশির ভাগই মধ্যবয়সী। পকেটে সেই সময়ের স্মৃতি। কিন্তু সঙ্গে তরুণও ছিল কিছু। ওরা মজিদকে দেখেনি। গল্প শুনেছে। মানতেই হলো, ওদের আগের প্রজন্মের গল্পের শক্তি ছিল। আমরা সেই গল্প শোনাতে ব্যর্থ হয়েছি।

২০১০ সাল। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের অ্যাক্রিডিটেশনের লাইনে দাঁড়িয়েছি। বিরাট লাইন। চারদিকে অচেনা সব মানুষ। এত বিচিত্র রকমের ভাষা ভেসে আসছে যে কোনো কোনোটার সঙ্গে পাখির কিচিরমিচিরের খুব পার্থক্য নেই। এর মধ্যেই রুশ একজনকে মিলল, যিনি ইংরেজি মোটামুটি পারেন। ঝুকভ লেভ ইয়াসিন বা ব্লোখিন নন যে সব ফুটবল সাংবাদিক চিনবে, তবু কী ভেবে যেন জানতে চাইলাম। কী আশ্চর্য, দেখা গেল ঝুকভকে তিনি চেনেনই না শুধু, খুব ভালো সম্পর্কও ছিল ওদের মধ্যে। তিনি বরং বিস্মিত, আমি কী করে চিনি? নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে প্রতি সপ্তাহে জাদুর মেলা নিয়ে বসতেন এই রুশ তরুণ, পা থেকে ঠিকরে বেরোত সুন্দরের অফুরান ঝরনা। তাতে ডুবে গিয়ে কী যে সব দিন কেটেছে আমাদের! কখনো কখনো স্টেডিয়াম থেকে বেরোনোর সময় ঘোরে আচ্ছন্ন থাকতাম। বিজয়নগর-কাকরাইল পেরিয়ে যেতাম, বাস ধরার কথা মনে থাকত না। আর কিনা প্রশ্ন হচ্ছে ওকে চিনি কি না? কেমন যেন একটা অদ্ভুত অধিকারবোধ কাজ করে। বলি, ‘ঝুকভ আমাদের ঋণে আবদ্ধ করে রেখেছে। টাচ ফুটবল, থ্রু—এসব ওর চেয়ে সুন্দর করে করতে দেখিনি কাউকে।’

সাংবাদিকটি তখনো একটু অবাক। রুশ ফুটবলের বিশালত্বের তুলনায় কত সাধারণ সামান্য এই ঝুকভ। হয়তো আমাদের ফুটবলবোধ নিয়েও ওর প্রশ্ন দেখা দিল। কিন্তু তাতেও বিব্রত হই না। ওই যে মজিদ ভাস্করের মতো। কাছ থেকে দেখা, স্থানীয় আবেগের সঙ্গে সংযুক্ত, আমার দলের হয়ে জীবন দিয়ে দিচ্ছে—এ রকম অঙ্কই মানকে পেছনে ফেলে অমর করে রাখে বিদেশিদের। আর এই বোধ আর দর্শনটাই আসলে বাঁচিয়ে রাখে স্থানীয় ফুটবলকে। এভাবেই নিজস্ব জাদুকরের জন্ম হয়। ওদের নিয়েই মত্ত থাকে বিশ্ব পরিমণ্ডল। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে বিস্ময়কর ব্যতিক্রম। অদ্ভুত এক উত্তরাধুনিকতায় আমরা মান যাচাই করতে বসি। আর এভাবেই বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পেছন থেকে আরো পেছনে যাই। মাঠে যাই না, স্থানীয়দের নিয়ে হাসি-তামাশা করি। এবং দেশ-দুনিয়ার খোঁজখবর ঠিক রাখি না বলে এটাও জানি না যে আমরা এবং আমাদের ফুটবলই আসলে হাসি-তামাশার যোগ্য। আমাদের মতো করে ভাবলে পৃথিবীতে সবাই শুধু মেসি-রোনালদোর খেলা দেখত। নিজেদের মাঠ ফাঁকা পড়ে রইত। আর কোনো লিগ হতো না। টিভি তো সব দেশেই আছে। ম্যারাডোনা বার্সেলোনায় অত বড় তারকা নন, কারণ বার্সেলোনায় তিনি এমন কিছু করেননি। সেখানে সবাইকে ছাপিয়ে যান লাজলো কুবালা, সমর্থকের ভোটে আমাদের চেনা মহারথীদের পেছনে ফেলে তিনিই তাদের শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড়। কারণ, কাছ থেকে ওর জাদু আর নিংড়ানো নিবেদনটা দেখেছে মানুষ। হ্যাঁ, মাঠে বসে। গ্যালারি কাঁপিয়ে।

মজিদ-হেজাজি-ঝুকভদের কথা ভাবতে ভাবতে এই ভাবনাও আসছে যে বহু বছর পর আমাদের ঘরোয়া ফুটবলটা দারুণ হয়েছে। সমর্থকের প্রত্যাশিত উপস্থিতি ছাড়া প্রায় সবই ছিল। এর মূল কারণ কিন্তু সেই বিদেশিরা। কলিনদ্রেস, বখতিয়ার, মাসি সাইগানি, সানডেদের নৈপুণ্যে মানসম্মত খেলা। প্রাণবন্ত লড়াই। মাঝাখানে যে নিচে নেমে গিয়েছিল এরও কারণ নিম্নমানের দেহসর্বস্ব আফ্রিকান। ওদের বৃত্ত থেকে বেরোতেই সৌরভ ছড়ানো ফুটবল। এর আগে যে সময়টাকে আমরা সেরা সময় মনে করি, সেই ’৮৬-৮৭ থেকে ’৯২-৯৩, তখনো কিন্তু মূলে ছিলেন বিদেশিরা। হেজাজি, নালজেগার, এমেকা, রহিমভ, ভিজন তাহিরি মোহামেডানে। আবাহনীতে সামির শাকির-করিম মোহাম্মদ-ঝুকভ-প্রেমলাল-পাকির আলী। এবার বিদেশি কে আসছেন! আগেরবারের চেয়ে ভালো তো? এই অঙ্কেই রাত দিন হতো। আবার মুন্না-সাব্বির-আসলাম-কায়সাররা যখন ওদের সঙ্গে সমানে তাল দিতেন, সেটাও অন্য এক ধরনের তৃপ্তি দিত। আমাদের এঁরাও তো কম নন। এভাবেই বিদেশি ফুটবলাররা সুন্দরের ফেরি করে গেছেন অক্লান্তে। আবদ্ধ করেছেন বিনোদনের ঋণে।

কলকাতা সেই ঋণ মনে রাখে। শোধ করে।

আমরা মনে রাখি না। ভুলে যাই।

তাই ওরা এগোয় পুনর্জন্মের দিকে। আমাদের পথ পতনের দিকে।

মন্তব্য