kalerkantho

ডাউন দ্য উইকেট

বিপিএল ‘ধূম্রজাল’!

সাইদুজ্জামান

৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



বিপিএল ‘ধূম্রজাল’!

‘ধূম্রজাল’ শব্দটি নিয়ে হালে ক্রিকেটপাড়ায় বেশ চর্চা হচ্ছে। অতি সম্প্রতি একটি সংবাদ সম্মেলন থেকে এর উদ্ভব। শব্দটি অবশ্য পুরনো এবং নানা জটিল পরিস্থিতিতে বহুল ব্যবহৃতও। তবে ক্রিকেটে এর সদ্যই অভিষেক, আভিধানিক অর্থের চেয়েও যা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন বটে!

ক্রিকেটে ‘ধূম্রজালে’র আগমন বিপিএলের হাত ধরে। কদিন আগে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি পরিচালক জালাল ইউনুস বলেন, ‘বিপিএল নিয়ে আপনাদের (সংবাদকর্মী) মনে যে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে, সেটি দূর করতেই এ সংবাদ সম্মেলন।’ সেসব দূর করার কাজটি করেছেন বিসিবির আরেক পরিচালক মাহবুবুল আনাম, যিনি বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের কেউ নন। বিপিএল যেহেতু বিসিবির টুর্নামেন্ট, সেহেতু মুখপাত্র হিসেবে যেকোনো বোর্ড পরিচালকই আবির্ভূত হতে পারেন। তবে মঞ্চে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি, সদস্যসচিব, টেকনিক্যাল কমিটির প্রধান এবং বিসিবির প্রধান নির্বাহী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও মাহবুব আনামকেই কেন ধূম্রজাল দূরীকরণের দায়িত্ব দেওয়া হলো, তা বোধগম্য নয়। তবে কি বিপিএলের দলবদলকে ঘিরে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের জন্য যোগ্য কোনো কর্মকর্তা নেই গভর্নিং কাউন্সিলে?

এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে চেয়ে লাভ নেই। কারণ গত ছয়টি আসরে বিপিএল এমন একটি ভাবমূর্তি তৈরি করেছে যে, দেশের সবচেয়ে বিত্তশালী টুর্নামেন্টকে ঘিরে সব সময়ই প্রশ্ন উঠেছে কিন্তু যথারীতি উত্তর মেলেনি। উত্তর যদিও মিলেছে, তবে তার কোনো মাথামুণ্ড নেই। বিপিএলের পঞ্চম আসরে যেমন, রংপুর রাইডার্স ও কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মধ্যকার ম্যাচটিকে ঘিরে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল তাতে মনে হতেই পারে যে, বিপিএলের কোনো বাইলজই বোধ হয় নেই! না, বাইলজ ছিল। তবে সেটি টুর্নামেন্ট শুরুর আগে কেউ পড়ে দেখেননি সম্ভবত। আর যে বা যাঁরা পড়েছেন, তিনি বা তাঁরা সেটির ভুল ব্যাখ্যা করে উল্টো ভজকট পাকিয়েছিলেন সেদিন। আরেক আসরে রেজিস্ট্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা না সেরেই বিদেশি খেলোয়াড় নামিয়ে দিয়েছিল একটি ফ্র্যাঞ্চাইজি। পরে অবশ্য জানা গেছে, ভুলটি ওই ফ্র্যাঞ্চাইজির যতটা না, তার চেয়ে বেশি বিসিবির এক দায়িত্বশীলের।

‘বিপিএল ধূম্রজাল’ তালিকার শেষ এখানেই নয়। প্রথম আসর থেকেই খেলোয়াড়দের পাওনা না পাওয়া নিয়ে বিশ্বজুড়ে নিন্দিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেট। দ্বিতীয় বছরে পা দিয়েই আক্রান্ত স্পট ফিক্সিং কাণ্ডে। তবে  এক বছর বিরতির পর ২০১৫ সালে নবোদ্যমে যাত্রার পর থেকে অবশ্য খেলোয়াড়দের বকেয়া নিয়ে কোনো হৈচৈ নেই। স্পট ফিক্সিংয়ের নতুন কোনো খবরও ছড়িয়ে পড়েনি। যদিও বিপিএলকেন্দ্রিক জুয়ার আসর এখন দেশের আনাচে-কানাচেও বসছে। যাক, সেসবে তো আর বিসিবি কিংবা বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের দায় নেই। দেশের ক্রিকেটের জন্য এমন ক্ষতিকারক দুটি উপাদান মুক্ত রাখতে পারার জন্য বিপিএল-সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ প্রাপ্য।

কিন্তু সেই ধন্যবাদ আমদানি করতে গিয়ে আশঙ্কাজনক এক অপবাদ বয়ে এনেছেন বিপিএলের বর্তমান আধিকারিকরা, প্রকারান্তরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। সেটি পক্ষপাতের। এই যেমন, সাকিব আল হাসান আসন্ন মৌসুমের জন্য দলবদল করতেই ‘ধূম্রজাল’ দূর করতে উদ্যোগী হলো বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। এর পেছনে মোটা দাগে সবাই কামান দেগেছেন ঢাকা ডায়নামাইটসকে। এ ফ্র্যাঞ্চাইজিকে খুশি করতেই নাকি এমন তৎপরতা বিপিএল পরিচালকদের।

এমন অভিযোগের পেছনে যুক্তিও রয়েছে। সাকিবের অনেক আগে পুরনো দল ছেড়ে তামিম ইকবাল নাম লিখিয়েছেন খুলনা টাইটান্সে। বিশ্বকাপ চলাকালে ইংল্যান্ডে বসেই শুনেছি দল বদলে মুশফিকুর রহিমের কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সে যাওয়ার কথা। এরপর ঢাকা ডায়নামাইটসও বিশ্বজয়ী ইংলিশ অধিনায়ক এউইন মরগানকে দলে ভেড়ানোর সুখবর দিয়েছে। অথচ বিপিএল কমিটি এত কিছুর প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সাকিব আল হাসানকে রংপুর রাইডার্স সাইন করানোর পর। বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারের দলবদল নিয়ে ঢাকার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে, দু-এক দিনের মধ্যেই তারা এ ব্যাপারে কথা বলবে। কিন্তু ঢাকা আর প্রকাশ্য হয়নি। দুদিন পর তাদের পরিবর্তে সাকিবের দলবদলের বৈধতা বাতিল করে দিয়েছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। এ কমিটির সদস্যসচিব বেক্সিমকোর চাকরিজীবী। আর ঢাকার মালিক বেক্সিকোর শীর্ষকর্তা। অতএব দুয়ে দুয়ে চার মিলে গিয়ে সেদিনের সংবাদ সম্মেলন করে কার্যত ঢাকা ডায়মাইটসের পরিবর্তে টেবিলে আরেকবার খেলে দিল বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলই!

নির্দিষ্ট একটি দলের পক্ষাবলম্বনের অভিযোগ যেকোনো আয়োজকের জন্যই মানহানিকর। বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলও খুব ভালো করে জানে যে তাদের বিরুদ্ধে পক্ষাবলম্বনের সমস্বর অভিযোগ আছে। এই যেমন নতুন চুক্তির কথা বলে সাকিবের দলবদলকে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের ‘অগ্রাহ্য’ করার অন্যতম কারণও ঢাকা ডায়নামাইটসের সন্তুষ্টির জন্যই বলে মনে করে আমজনতা।

যেমন মনে করে, প্রতিটি আসরের আগে প্লেয়ার্স ড্রাফট ডিজাইনই করা হয় ঢাকা ডায়নামাইটসকে বাড়তি সুবিধা দেওয়ার চিন্তা থেকে। এ অভিযোগের সূত্রপাত অংশগ্রহণকারী অন্য ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর দপ্তর থেকেই। বিশেষ বিশেষ ম্যাচের আম্পায়ারিং নিয়েও আতঙ্কে থাকে অনেকে। টুর্নামেন্টের সূচি তৈরির সময়ও অগ্রাধিকার দেওয়া হয় বিশেষ একটি দলকে। একাধিক ফ্র্যাঞ্চাইজি প্রতিনিধির কাছ থেকে শোনা যে, বিশেষ কোনো ইস্যুতে বিপিএল সভা শেষ হয়ে যায় বিশেষ একটি দলের প্রতিনিধির অভিমত জানার পরই! অবধারিতভাবে বিশেষ সেই দলটি ঢাকা ডায়নামাইটস। এমন একতরফা অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে এসেছে বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। কিন্তু সবই অরণ্যে রোদন। বিপিএল পরিচালিত হয় ঢাকা ডায়নামাইটসের অঙ্গুলি হেলনে—এ ধারণা কিংবা এ জাতীয় ‘ধূম্রজাল’ শত চেষ্টাতেও বিলীন করতে পারেনি বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল।

এটা একটা ‘পারসেপশন’। এর যৌক্তিক কোনো ভিত্তিমূল্য নেই। আবার স্রেফ ধারণা বলে অভিযোগমালা ছুড়ে ফেলে দেওয়ারও সুযোগ নেই। একটার পর একটা ঘটনাই এ ধারণার পেছনে ইন্ধন জুগিয়েছে। বিসিবির বয়োকনিষ্ঠ কর্মীও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের পক্ষপাতমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ে আড়ালে হাসাহাসি করেন। ভেতরে-বাইরে যখন একই ধারণার ‘সংক্রমণ’ হয়, তখন ধরে নেওয়া যায় কিছু একটা গড়বড় হচ্ছে কোথাও। নইলে সবাই এক দিকেই অভিযোগের ঢিল ছুড়বেন কেন? সেই ঢিলও কিনা পড়ছে ঢাকা ডায়নামাইটসের গায়ে। যাদের গায়ে ঢিল পড়লে ‘আহত’ হতে পারেন পরাক্রমশালী বোর্ডের শীর্ষকর্তাও!

অবশ্য আজকাল কেউ আহত-টাহত হন বলে মনে হয় না। বরং অসীম ধৈর্য সহকারে আপন গতিতে আপনার পথে এগিয়ে যান তারা। তাই নতুন চুক্তির যুক্তি তুলে সাকিবদের দলবদলে বাগড়া দিয়ে যেমন পুরনো ‘পারসেপশন’কে নতুন করে জ্বালানি জুগিয়েছেন তারা।

অথচ এত দিনে বিপিএল সপ্তম আসরের চুক্তিই হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে জানা গেল সেসবের কিছু হয়নি। দলবদল কোন নিয়মে হবে, সেটিও অনির্ধারিত। কাজী ইনাম আহমেদ অনেকটা অনুনয়ের সুরেই বলেছেন, ‘পরের সাইকেলের (চার বছর মেয়াদি) জন্য খেলোয়াড় বদলের আইনটা যেন একই থাকে।’ তিনি বোর্ড পরিচালক এবং খুলনা টাইটান্সের কর্ণধার। তাই হুটহাট নিয়ম বদলের শিকার তিনি জানেন এর পেছনের কারণও।

আর এসব কারণেই বৈশ্বিক ক্রিকেটারদের মুখে আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ), সিপিএল (ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ), পিএসএল (পাকিস্তান সুপার লিগ) শোনা যায় বেশি বেশি। কেন? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা কর্তারা কখনো করেছেন? মনে হয় না। তেমনটা হলে সপ্তম আসরের চার মাস আগে অন্তত কয়টি দল খেলবে, সেটি অন্তত নিশ্চিত হয়ে যেত। প্লেয়ার্স ড্রাফটের নিয়ম কিংবা প্লেয়িং কন্ডিশনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর কথা বাদই দিলাম।

সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে উচ্চারিত আরেকটি উচ্চাশার কথা উল্লেখ না করলেই নয়—লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড! নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি যেহেতু আসতে পারে, তাই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি করার লক্ষ্যেই নাকি সাকিব এবং অন্যদের আগাম দলবদল ধর্তব্যে নিচ্ছে না বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল। শুনতে ভালো লাগে কিন্তু বিশ্বাস হয় না যে!

এমন অবিশ্বাস কিংবা নেতিবাচক ধারণাই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট বিশ্বে পেছনের কাতারে বসিয়ে রেখেছে বিপিএলকে। সেখান থেকে সামনের কাতারে উঠে আসার পথ একটাই—পেশাদারিত্ব দিয়ে বিপিএল পরিচালনা। বিশেষ কোনো ব্যক্তি কিংবা দল নয়, সত্যিকারের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডে’ বিপিএল আয়োজনই অবিশ্বাস দূর করার একমাত্র উপায়।

অবশ্য দেশের ক্রিকেট প্রশাসন যেভাবে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্টে’র জালে জড়িয়ে, তাতে পক্ষপাত থেকে মুক্তির আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। দেশীয় ক্রিকেটের সুবিধাভোগী অংশ ছাড়া আর কেউ দেখছেন বলে শুনিনি।

নাকি সবই ধূম্রজাল?

মন্তব্য