kalerkantho

সংস্কৃতি বদলেরও হাওয়া লেগেছে ফুটবলে

৩ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



সংস্কৃতি বদলেরও হাওয়া লেগেছে ফুটবলে

শেষ হতে চলল দীর্ঘ ফুটবল মৌসুম। মাঠের পারফরম্যান্সের ভালো-মন্দ মিলিয়ে ফুটবল গল্প অনেক। সেই গল্পের বড় একটা অংশজুড়েই থাকবে   ফুটবলের সংস্কৃতি বদলের কথা। দেশি নতুনেও আলোকিত হয়েছে ফুটবল, সঙ্গে আবার নতুন চ্যাম্পিয়নও। এই ধারাবাহিকে ফুটবলের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন সনৎ বাবলা। ধারাবাহিকের শেষ কিস্তি ছাপা হলো আজ।

দেশের ফুটবলে পালাবদল হচ্ছে। নতুন ফুটবলারের ঝংকার শোনার সময় ভালো বিদেশি আসতে শুরু করেছে। ক্লাবগুলোও নিজেদের ভেন্যু ঠিক করতে পেশাদারি কায়দায় এগোচ্ছে। শুধু খেলার মান কিংবা কায়দা-কানুনে বদল নয়, বদলাচ্ছে বাংলাদেশের ফুটবল সংস্কৃতিও। এই মৌসুমে দেখার মতো এবং শেখার মতো অনেক কিছুই ঘটেছে। 

দেশের ফুটবলে একটি অভিনব ব্যাপার ঘটেছে চ্যাম্পিয়ন দলকে ‘গার্ড অব অনার’ দেওয়া। দুই ম্যাচ হাতে রেখে লিগ শিরোপা নিশ্চিত করা বসুন্ধরা কিংস পরের ম্যাচ খেলতে গিয়েছিল ময়মনসিংহে। মাঠে নামার আগে স্বাগতিক দলের আয়োজন দেখে তারা রীতিমতো চমকে গিয়েছিল। সাইফ স্পোর্টিংয়ের খেলোয়াড়রা দাঁড়িয়েছিল সারিবদ্ধভাবে, চ্যাম্পিয়ন দল মাঠে নামতেই তাদের অভিনন্দন জানায় ফুলের তোড়া উপহার দিয়ে। এরপর ড্রেসিংরুমে স্পেশাল নাশতা পাঠিয়ে আরেক দফা চমকে দেয় চ্যাম্পিয়ন দলকে। শিরোপার এমন সম্মান ও স্বীকৃতিতে দারুণ অভিভূত হয়েছিল প্রিমিয়ারে নবাগতরা। প্রতিপক্ষ যখন এভাবে সাড়ম্বরে স্বীকৃতি দেয় তখন কার না ভালো লাগে। পরদিন তাই বসুন্ধরা কিংসের প্রেসিডেন্ট ইমরুল হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে ধন্যবাদপত্র পাঠিয়েছিলেন সাইফ স্পোর্টিংয়ে, ‘সাইফ স্পোর্টিং যেটা করেছে তা এ দেশের ফুটবলে কখনো হয়নি। আমরা মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী বলে পারস্পরিক সৌহার্দ-সৌজন্যটুকুও হারিয়ে ফেললে তো আর কিছুই থাকল না। প্রতিবার লিগে খেলে ১২-১৩টি দল, এর মধ্যে একটি দলই চ্যাম্পিয়ন হয়। এই সেরা দলকে অভিনন্দন জানানোর ক্রীড়াসুলভ মানসিকতা না থাকলে আমার ক্রীড়াঙ্গনে থাকার নৈতিক অধিকারও থাকে না। এটা আমার ভাবনা। সাইফ স্পোর্টিংকে আবারও ধন্যবাদ জানাই, তাদের দেখানো গার্ড অব অনারের রীতিটা ভবিষ্যতেও যেন টিকে থাকে আমাদের ফুটবল সংস্কৃতিতে।’

দেশের ফুটবল সংস্কৃতির মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধার বড় অভাব। কেউ কিছু অর্জন করলে তার খুঁত ধরা কিংবা কোনো দল সাফল্যের মগডালে পৌঁছালে তাকে কিভাবে টেনে নামানো যায়, সেই চেষ্টাই বেশি হয়। আবাহনী-মোহামেডানের এত এত সাফল্যেও তাই কোনো প্রতিপক্ষ কখনো হাততালি কিংবা ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে কুর্নিশ জানায়নি। আবার তাদের কাছ থেকেও কেউ পায়নি, যারা পথ দেখাবে তারাও যে কানা! এখানকার ফুটবল ঐতিহ্যটাই শুধু পুরনো, তাতে বিশ্ব ফুটবলের দখিনা হাওয়া কখনো লাগতে দেননি সংগঠকরা। হালের সংগঠকরা সেই হাওয়া গায়ে মেখে বড় হয়েছেন। তাই সাইফ স্পোর্টিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলতে পারেন, ‘বিশ্ব ফুটবল এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা তো উটপাখির মতো মুখ বুজে থাকতে পারি না। চ্যাম্পিয়ন দলকে গার্ড অব অনার দেওয়ার সৌজন্যটুকু দেখিয়েছি আমি।’

সৌজন্য-সম্প্রীতির আরেকটি দুর্দান্ত ঘটনা ঘটেছে মৌসুম শুরুর টুর্নামেন্টে। ফাইনালে তুমুল মারামারি শেষে বসুন্ধরা কিংসকে হারিয়ে ফেডারেশন কাপ জেতে আবাহনী। আবাহনীর মামুন মিয়ার ফ্লাইং কিক, কিংসের সুশান্তর লাথিতে ভীষণ আলোচিত এক ফাইনাল। এসব নেতিবাচক আলোচনা ও উত্তাপ ছড়ানো ফাইনালে হারা বসুন্ধরা কিংস পরদিন ফুলেল অভিনন্দন জানিয়েছিল আবাহনী ক্লাবে গিয়ে। সবচেয়ে বেশি টাকায় দল গড়েও ফাইনাল হারের যন্ত্রণা ও এএফসি কাপে নাম লেখাতে না পারার ব্যর্থতা তাদের সঙ্গী হওয়ার পরও তারা গিয়েছিল টুর্নামেন্ট সেরাদের সম্মান জানাতে। কারণ মাঠের লড়াইকে মাঠে রেখেই তারা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে সমুন্নত রাখতে চায়। এত বছরের ফুটবল সংস্কৃতিতে এটাও এক নতুন শিক্ষা, আগে ফাইনালে হেরে কেউ যেচে গিয়ে অভিনন্দন জানায়নি চ্যাম্পিয়ন দলকে।

বসুন্ধরা কিংস গিয়ে ফুটবল সংস্কৃতির নতুন অধ্যায় খুলেছে, তেমনি সাইফ স্পোর্টিংও চ্যাম্পিয়নদের কুর্নিশ জানানোর নতুন তরিকা দেখিয়েছে। মজা হলো, ঢাকার মাঠে অনেক ঐতিহ্যবাহী দল থাকলেও শেষ পর্যন্ত সংস্কৃতির হাওয়া বদলাচ্ছে দুটি নতুন করপোরেট দল! যাদের বদলানোর দায়িত্ব তারা বসে আছে পুরনো ধ্যান-ধারণা আঁকড়ে। তেমনি বাফুফের চরিত্রও খুব বদলায়নি, এত বছরেও পারেনি ঝড়-বৃষ্টিমুক্ত একটি ফুটবল মৌসুম চূড়ান্ত করতে। এবারও জানুয়ারিতে লিগ শুরু হয়েছিল ঝড়-বৃষ্টির ঝুঁকি মাথায় নিয়ে। বৃষ্টির কবলে পড়লেও খুব ক্ষতি হয়নি, এটাই ভাগ্য। তবে ইতিবাচক ছিল ভেন্যুগুলো। নোয়াখালীর ভেন্যু বাদে বাকি পাঁচটি ভেন্যুর মাঠ নিয়ে শোনা যায়নি কোনো অভিযোগ। ক্লাবগুলো নিজেদের দায়িত্বে ফুটবল উপযোগী করে তুলেছিল মাঠগুলোকে। তাই প্রথমবারের মতো কোনো ভেন্যুর খেলা শেষ মুহূর্তে ঢাকায় নিয়ে আসতে হয়নি।

লিগ শেষের পথে। এখন হবে প্রিমিয়ারের ক্লাবগুলোর বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট, এ দিয়েই শেষ হবে মৌসুম। প্রত্যেক ক্লাবে একটি করে যুব দল বাধ্যতামূলক করতেই বাফুফে চালু করেছিল এ টুর্নামেন্ট। কয়েক বছর এ টুর্নামেন্ট হলেও বাফুফে এখনো কোনো কাঠামোই দাঁড় করাতে পারেনি এই টুর্নামেন্টের। এখানে কত বছর বয়সীরা খেলবে, সেটাই নাকি ঠিক করতে পারেনি পেশাদার লিগ কমিটি। তাই বসুন্ধরা কিংসের প্রেসিডেন্ট খুব বিরক্ত, ‘আমরা এখনো জানি না, অনূর্ধ্ব-১৭ নাকি অনূর্ধ্ব-১৮ বছরের ছেলেদের নিয়ে খেলা হবে। তার চেয়েও বড় কথা, এটা টুর্নামেন্ট হবে কেন? লিগ হতে সমস্যা কোথায়? দেড় বছর ধরে আমরা একাডেমি চালাচ্ছি কি দুই-তিনটি ম্যাচ খেলার জন্য! অথচ বাফুফে কর্মকর্তারাই বলেন, ক্লাবের কাজ খেলোয়াড় তৈরি করা, একাডেমি গড়া।’ দেড়-দুই বছর ধরে বসুন্ধরা কিংস ও সাইফ স্পোর্টিং একাডেমির আদলে খেলোয়াড় তৈরির কাজ করছে। যুব দলও তৈরি করেছে। এ রকম একাডেমির কথা বাফুফে প্রেসিডেন্ট কাজী সালাউদ্দিনের কথা প্রায়ই শোনা যায়। অথচ তাদের খেলার টুর্নামেন্টেরই কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। সত্যি বললে বাফুফের কোনো প্ল্যান-প্রগ্রামই থাকে না, একেক সময় কর্মকর্তারা একেক ধরনের কথা বলেন। তাই ক্লাবগুলোও থাকে অন্ধকারে। ফুটবলকে আলোর পথ দেখাতে হলে বাফুফের অন্ধকারই আগে কাটাতে হবে আগে। ক্লাবগুলো কিন্তু ফুটবল সংস্কৃতি বদলের পথে আছে।

মন্তব্য