kalerkantho

নতুন প্রতিভার ঝলকও আছে

শেষ হতে চলল দীর্ঘ ফুটবল মৌসুম। মাঠের পারফরম্যান্সের ভালো-মন্দ মিলিয়ে ফুটবল গল্প অনেক। সেই গল্পের বড় একটা অংশজুড়েই থাকবে নতুনদের পায়ে সুরভি ছড়ানো ফুটবলের কথা। দেশি নতুনেও আলোকিত হয়েছে ফুটবল, সঙ্গে আবার নতুন চ্যাম্পিয়নও। এই ধারাবাহিকে ফুটবলের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন সনৎ বাবলা। ধারাবাহিকের তৃতীয় কিস্তি ছাপা হলো আজ।

২ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নতুন প্রতিভার ঝলকও আছে

বাংলাদেশের ফুটবলে এখন পালাবদলের সময়। পুরনোদের ক্ষয় আর নতুনের জয়ে ফুটবলের বৃত্ত পূরণ হয়। চিরকালীন এই ধারায় ফুটবল মৌসুমে এবারও নতুনের ঝঙ্কার শোনা গেছে। প্রতিভার ঝলক দেখা গেছে পাঁচ-ছয়জনের পায়ে, তাঁদের মধ্যেও যেন একটু আলাদা করে নজর কেড়েছেন রাকিবুল ইসলাম ও ইয়াসিন আরাফাত।

কোচদের বিচারে এ দুজন এগিয়ে থাকলেও সম্ভাবনার জায়গায় দাঁড়িয়ে আরো চার-পাঁচজন উঠতি ফুটবলার। চলতি মৌসুমে সব দলের খেলা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছেন চট্টগ্রাম আবাহনীর কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু। সেই পর্যবেক্ষণ থেকে এই তরুণ কোচ খুঁজে পেয়েছেন বেশ কিছু সম্ভাবনাময় তরুণকে, ‘উঠতি খেলোয়াড় বাছাই করলে চার-পাঁচজনকে পাওয়া যাবে। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো পারফরমার রহমতগঞ্জের রাকিব, উইংয়ে চমৎকার খেলে ছেলেটি। এ ছাড়া সাইফের আরাফাত ও ফাহিম, আরামবাগের মানিক, মোহামেডানের গালিবের কথা বলতে পারি। আরো ভালো খেলার সামর্থ্য আছে তাদের মধ্যে। এ জন্য খেলাটাকে বুঝতে হবে এবং টেকনিক্যালি ওদের আরো উন্নতি করতে হবে।’

রহমতগঞ্জের কোচ গোলাম জিলানীর হাতে গড়া এই রাকিবুল। গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে খেলেছেন ভিক্টোরিয়ার হয়ে। এ বছর রহমতগঞ্জের জার্সিতে প্রিমিয়ারে ক্যারিয়ার শুরু করা এই উইঙ্গার লিগে করেছেন মাত্র তিন গোল। অবশ্য তাঁর খ্যাতি গোলে নয়, গোল তৈরিতে। দুই পায়ের স্কিল ও গতিতে প্রতিপক্ষকে চমকে দেন ১৯ বছর বয়সী এই ফুটবলার। কোচ জিলানী অপার সম্ভাবনা দেখছেন তাঁর মধ্যে, ‘সে দুই উইংয়ে খেলতে পারে আর প্রতিপক্ষ রক্ষণকে সব সময় চ্যালেঞ্জ জানানোর সামর্থ্য রাখে। ট্রেনিংয়ে মনোযোগী থাকলে সে হতে পারে দেশের সেরা উইঙ্গার। খেলাটিকে যত ভালোবাসবে এবং ট্রেনিংয়ে যত মনোযোগী হবে, তার ফল পাবে ভবিষ্যতে।’ রাকিবেরও স্বপ্ন ‘আইডল’ জাহিদ হোসেনের মতো জাতীয় দল রাঙাতে। ইতিমধ্যে অবশ্য বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ ও ২৩ দলে খেলা হয়ে গেছে তাঁর।

রাকিবের সঙ্গে এ বছর বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দলে খেলা ইয়াসিন আরাফাত এবার সাইফ স্পোর্টিংয়ের রক্ষণে নজর কেড়েছেন। আগের বছর খেলেছেন তৃতীয় বিভাগে কদমতলা সংসদের হয়ে, মাঝের তিনটি ধাপ না খেলেই তিনি এবার এক লাফে উঠে এসেছেন প্রিমিয়ারে! কারণ তাঁর রক্ষণকাজ ভালো, সঙ্গে ওভারল্যাপ করে আক্রমণে ওঠার ক্ষমতাটাই আলাদা করে দিয়েছে এই লেফট ব্যাককে। লিগের প্রথম ম্যাচ থেকেই ভালোভাবে করেছেন এই কাজটা। ১৯ বছর বয়সীর এ রকম এক মুভ রহমতগঞ্জের কোচ গোলাম জিলানীর স্মৃতিতে দগদগে ঘা হয়ে আছে, ‘প্রথম ম্যাচে সে ওভারল্যাপ করে উঠে একদম লাইন থেকে দুর্দান্ত এক গোল বানিয়ে দিয়েছিল স্ট্রাইকারকে। এই গোলে আমরা হেরে যাই।’ ইয়াসিনের এই ওভারল্যাপিংয়ের অনুপ্রেরণা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার মার্সেলো, ‘মার্সেলোর মতো ওভারল্যাপ করে গোলে সাহায্য করতে চাই আমি। লিগে আমার পাঁঁচটি অ্যাসিস্ট আছে।’

এ ছাড়া সাইফের ফাহিম, নোফেলের আশরাফুল, মোহামেডানের মিডফিল্ডার গালিব, আরামবাগের মানিকের খেলাও অনেকের চোখে পড়েছে। তবে এক মৌসুমের পারফরম্যান্সে বড় খেলোয়াড়ের সিলমোহর দেওয়া যায় না। তাঁদের এখন সম্ভাবনার জায়গায় রাখতে চান জুলফিকার মাহমুদ মিন্টু। তাঁদের উত্তরণের জন্য সামনের দিনগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন এই কোচ, ‘একজন খেলোয়াড়ের উন্নতি নির্ভর করে তার পরিশ্রম এবং সঠিক কোচের সাপোর্টের ওপর। নিজের চেষ্টার সঙ্গে কোচের ট্রেনিং ও কয়েকটি টিপস ভালোভাবে অনুসরণ করলে উঠতি খেলোয়াড়রা আরো ভালো করবে। এ বছর যেমন কোচ ও নিজের চেষ্টা মিলিয়ে রবিউল দুর্দান্ত ফুটবল খেলেছেন, আরামবাগের হয়ে ওর চমৎকার কিছু গোল আছে। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে রবিউলের পারফরম্যান্স এবার সবার চোখে পড়েছে। এবারের সম্ভাবনাময়ীদের সে রকম পারফরম করে দেখাতে হবে সামনের মৌসুমে।’ আরামবাগে চমৎকার খেলেছেন রবিউল। তার আগেই অবশ্য জাতীয় দলে ডাক পেয়েছেন, এই মৌসুমে লাল-সবুজ জার্সিতে এই অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার দুর্দান্ত দুটি গোলও করেছেন কম্বোডিয়া ও লাওসের বিপক্ষে।

এমন পারফরমার হওয়ার সুযোগ আছে রাকিবুল-আরাফাতদের সামনে। কোচিং-ট্রেনিং ছাড়াও উন্নত বিদেশির সঙ্গও যে বিশেষ প্রভাবক হয়ে কাজ করতে পারে। এটাকে ফুটবল শিক্ষার একটা দারুণ মাধ্যম হিসেবে দেখছেন শেখ রাসেল কোচ সাইফুল বারী টিটু, ‘রাকিব ও আরাফাতের মতো কয়েকজনের খেলা বিশেষভাবে চোখে পড়েছে। ওদের মাঝে প্রতিভা আছে, সুতরাং আরো এগোনোর সুযোগ আছে। যেখানে ঘাটতি সেগুলো কোচিং-ট্রেনিং করে পুষিয়ে নেওয়া যায়, তেমনি ভালো বিদেশির সঙ্গে খেলেও নিজেকে তৈরি করা। আমার মনে আছে, সাব্বির ভাইয়ের চোখে পড়ার মতো উন্নতিটা হয়েছিল ইরানি নালজেগার, হেজাজি, বোরহানজাদের সঙ্গে খেলে। আগ্রহ ও মনোযোগ থাকলে এই উন্নতিটা আপনা-আপনি হয়ে যাবে।’ নব্বইয়ের দশকে যেমন জুকভের সঙ্গে খেলতে খেলতে আবাহনীর জাকির হয়ে উঠেছিলেন দুর্দান্ত এক মিডফিল্ডার।  

তাই ভালো বিদেশি ফুটবলারও দেশিদের মানোন্নয়নের বড় একটা মাধ্যম হতে পারে। এখানকার ফুটবলে আস্তে আস্তে নাইজেরিয়ানদের আধিপত্য খর্ব করে ঢাকার ফুটবল আলোকিত হচ্ছে ভালো বিদেশিতে। তাঁদের সঙ্গ এবং নিজের চেষ্টায় রাকিবুল-আরাফাতদের পায়েও যোগ হতে পারে ফুটবলের মোহিনী মায়া।

মন্তব্য