kalerkantho

টাচলাইন থেকে

ক্রিকেট অ্যাপ্রিসিয়েশন

মোস্তফা মামুন

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ক্রিকেট অ্যাপ্রিসিয়েশন

একসময় পত্রিকায় চিত্রসমালোচনা লিখতাম। বিদগ্ধ সমালোচনা নয়, স্যাটায়ারধর্মী লেখা, যাতে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপই থাকত বেশি। বিদ্রূপ-সমালোচনা মানুষের কাছে সাধারণত উপভোগ্য, কাজেই বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে গেল লেখাটা। দেখে অভিভাবক শ্রেণির একজন পরামর্শ দিলেন, ‘সিনে সমালোচনা তো বেশ লিখছেন। এক কাজ করেন না!’

‘কী কাজ?’

‘একটা ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্স করে ফেলেন। লেখায় গভীরতা বাড়বে।’

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে সব কাজের জন্যই সময় থাকে। ঢুকে গেলাম একটা স্বল্পমেয়াদি কোর্সে। সমস্যা দেখা দিল এরপর। লেখায় গভীরতা বাড়ার বদলে কমতে থাকল। যেকোনো কিছু আর আগের মতো সাবলীলভাবে লিখতে পারি না। লিখতে গেলেই পরিচালক আর চিত্রনাট্যকারদের দৃষ্টিভঙ্গি সামনে চলে আসে, সমালোচনা করতে গেলে মায়া হয়। আবার শিল্পবোধ সম্পর্কে নতুন ধারণা তৈরি হওয়াতে ভয়ও লাগে।

লেখা আক্রান্ত হলো। কিন্তু আবার অবিশ্বাস্যরকম উপকৃত হলাম। সাদা চোখে দেখা একটা সাধারণ জিনিসের ভেতরের লুকানো সব মাত্রা আবিষ্কার হওয়াতে সিনেমা-নাটক দেখার অন্য চোখ খুলল। বাড়তে থাকল উপভোগ্যতার সীমানা।

এত বছর পর ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশনের সেই স্মৃতিটা আবার মাথাচাড়া দিচ্ছে, কারণ এখন মাঝেমধ্যে মনে হয়, ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশনের মতো ক্রিকেট অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সও বোধহয় খুব দরকার হয়ে পড়েছে। খেলাটাকে বোঝার-দেখার এবং জানার মধ্যে যে বিভ্রান্তি সেটা এক বিস্তৃত জাল হয়ে আসল জায়গা থেকে অনেক দূরে নিয়ে ফেলছে আমাদের। উন্নতি করতে গিয়ে ভুল দরজায় কড়া নাড়ছি। সেই দরজা দিয়ে ঢুকে বসে থাকছি ভুল ঘরে।

মোটা দাগে আমাদের ক্রিকেট দেখার দর্শনকে তিন-চার ভাগে ভাগ করা যায়। আরো কিছু উপভাগ থাকলেও এর মধ্যেই মোটামুটি সবাইকে ধরা যায়।

সবচেয়ে বড় পক্ষটা বোধহয় তারকা খেলোয়াড়দের অন্ধ অনুসারী দল। এরা নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স নিয়ে এত বেশি মত্ত যে ক্ষেত্রবিশেষে দল বা দলের পারফরম্যান্স দ্বিতীয় স্থানে চলে যায়। এবং এর কিছু কিছু গ্রুপে নিজের পছন্দের খেলোয়াড়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় প্রতিদ্বন্দ্বী তারকা খেলোয়াড় সম্পর্কে এমন সব উগ্র মতামত প্রকাশিত হয় যে সেটা দেখলে মনে হবে, সেই একজন খেলোয়াড়ই বোধহয় বাংলাদেশ দলে খেলেন। যেভাবে সম্ভাব্য অন্য প্রতিপক্ষদের সেখানে তুলাধোনা করা হয় তাতে সংশয় জাগে, নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় এরা বাকিদের ব্যর্থতা কামনা করে না তো! আশা করি উত্তরটা ‘না’, কিন্তু মানুষ কোনো কিছুতে অন্ধ হয়ে গেলে সেই অন্ধত্ব তার করা উচিত নয় এমন অনেক কিছুই তাকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারে। তাহলে এরা প্রবলভাবে বাংলাদেশ ক্রিকেটের অনুসারী হয়েও কিন্তু ঠিক দেশের ক্রিকেটের শুভাকাঙ্ক্ষী নয়। দল আর দলীয় সাফল্য তো এদের কাছে গৌণ।

দ্বিতীয় আরেকটা পক্ষ হচ্ছে ‘হারলেও বাংলাদেশ, জিতলেও বাংলাদেশ।’ এরা অতিরিক্ত দলপ্রেমী। এবং যথারীতি অতিরিক্ত প্রেমের পরিণাম সম্পর্কে অসচেতন। এদের বড় একটা অংশ ক্রিকেটের সঙ্গে দেশ-জাতীয়তা ইত্যাদি ব্যাপকভাবে মিশিয়ে ক্রিকেটটাকে আর ক্রিকেটের জায়গায় রাখে না। দেশের সম্মান-ভাবমূর্তি ইত্যাদি বিষয় চলে আসে। এবং সে জন্যই তাদের মতে, দল হারলেও সমালোচনা করা যাবে না। বিপদে দলের পাশে থাকার বিষয়টাকে ভুলভাবে বিশ্লেষণ করে খারাপ করলেও দলের প্রশংসা করতে হবে এমন দাবি তাদের।

আরেকটা পক্ষ এর ঠিক বিপরীত। ক্রিকেট নিয়ে এদের খুব বেশি কিছু আসে যায় না। কিন্তু যেহেতু খেলার সময় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হয়ে ওঠে খেলা, তাই তখন একটু খোঁজখবর রাখতে হয়। পূর্বাপর কিছু জানে না বলে দিনের খেলার ভিত্তিতেই তার সিদ্ধান্ত। যে কম রান করেছে কিংবা উইকেট পায়নি তার তীব্র সমালোচনায় মেতে উঠবে। ‘ওকে বাদ দাও’ ‘বিদায় করো’—এ রকম আওয়াজ তুলে দিয়ে অন্য সময় মোটামুটি হাওয়া।

চতুর্থ এবং এই মুহূর্তে সবচেয়ে সংখ্যালঘু পক্ষটা হলে তারা যারা ক্রিকেটটাকে ঠিক উগ্র সমর্থনের সীমানায় আটকে রাখতে চায় না। বাংলাদেশের সাফল্য ওরা চায় কিন্তু অন্য দেশের, অন্য কোনো খেলোয়াড় প্রশংসনীয় হলে তাঁকেও সম্মান করে। এদের বড় একটা অংশ বাংলাদেশ যখন ক্রিকেট সার্কিটে আসেনি তখন থেকেই ক্রিকেটের অনুসারী। ফলে, খেলাটার মহিমাটাই ওদের কাছে আগে। কিন্তু এই উগ্র জাতীয়তাবাদযুক্ত এবং ব্যক্তিপূজাসর্বস্ব সময়ে এরা একটুখানি মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া। ঠিক তাল মেলাতে পারে না বলে চুপচাপ থাকে। নিজের মতো করে খেলাটা উপভোগ করে যায়। কখনো কখনো উগ্রতার সঙ্গে লড়তে যায় এবং তুমুলভাবে পরাজিত হয়।

এই বহুমুখী ক্রিকেট দর্শনে খালি চোখে খুব সমস্যার কিছু ধরা পড়ে না। সমাজের আর দশটা ব্যাপারের মতো খেলাটাকেও একেকজন একেকভাবে দেখবে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয়, এই উগ্র অংশের মতামত, যেটা বেশি করে প্রচারিত হয় বলে এর মাধ্যমেই প্রভাবিত হয়ে পড়েন সিদ্ধান্তগ্রহীতারা। এটাকেই ধরে নেন জনদাবি। সেই দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ক্রিকেটীয় বিচার-বিবেচনা পড়ে যায় পেছনের কাতারে। এবং তারা বুঝতে পারে না যা আসলে ক্রিকেটকেও ঠেলে নিয়ে যায় পেছনের কাতারে।

ফিল্ম অ্যাপ্রিসিয়েশন কোর্সের গল্পে আবার ফিরে যাই। এখন আর আগের মতো জোরালোভাবে মত দিতে পারছি না শুনে অভিভাবক মানুষটি বললেন, ‘এর মানে কাজ হয়েছে?’

‘কোথায় কাজ হলো?’

‘তোমার মধ্যে মাত্রাজ্ঞান তৈরি হয়েছে।’

মানলাম। এ সংক্রান্ত নিজের লাভটাও বুঝতে পারি। তা থেকেই প্রশ্ন করলাম, ‘এই যে এখন অনেক কিছু বুঝতে পারছি, তা দেখে সাধারণ দর্শকের জন্য সহানুভূতি হয়।’

‘সহানুভূতি?’

‘হ্যাঁ। কত কিছু থেকে বঞ্চিত হচ্ছে ওরা।’

মানুষটি হাসলেন। ‘এটাও ভুল। শিল্প এমন একটা জিনিস যে এতে বঞ্চিত হওয়ার কিছু নেই। এই যে সাধারণ দর্শক, গভীরভাবে দেখছে না কিন্তু তার নিজের মতো করে তো একটা আনন্দ পাচ্ছে। ব্যস, এতেই চলবে।’

‘তাহলে এই যে বোঝার চেস্টা, অ্যাপ্রিসিয়েশন...সেসবের দরকার কী?’

‘সেসব হচ্ছে কিছু মানুষের জন্য। যারা তাদের বোধ দিয়ে জনরুচি তৈরি করে দেবে। এদের বলতে পারো সাংস্কৃতিক অভিভাবক।’

এই জায়গাটায় থামি। মেলাতে সুবিধা হবে। এই যে সাংস্কৃতিক অভিভাবকত্ব, সেটারই এখন দরকার ক্রিকেটের ক্ষেত্রে।

সাধারণ দর্শক যেমন ইচ্ছা দেখবে। যে যার মতো উপভোগ করবে। এই উপভোগ্যতাটা মাত্রা ছাড়িয়ে ক্ষতির দিকে যেতে দেখলেই অভিভাবকরা দাঁড়াবেন প্রহরী হয়ে। কিংবা আগে থেকেই সতর্ক করবেন এই বিষাক্ততা সম্পর্কে। মোটের ওপর হাওয়াই আর হুজুগে চিন্তাকে এঁরা জাতীয় ক্রিকেট দর্শন হতে দেবেন না। আর এই চর্চায় ধীরে ধীরে উন্নতি ঘটবে সামগ্রিক বোধের। আজ যারা ব্যক্তিপূজায় মত্ত, সম্প্রসারিত হবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি। ক্রিকেটের সঙ্গে জাতীয়তা কতটা মেলাবে আর কতটা দূরে রাখবে ‘দেশপ্রেমিকদের’ সেই সংযমটুকও তৈরি হয়ে যাবে সময়ে। ‘একে নাও, তাকে ফেলো’ এই অধৈর্য উন্মাদনাও কমবে।

আমাদের সীমাবদ্ধ ক্রিকেট কাঠামোয় আলাদা করে কোনো অভিভাবকশ্রেণি তৈরির সময় হয়নি, তাই ক্রিকেট বোর্ড আর কর্তাদেরই করতে হবে অভিভাবকত্ব। জনপ্রিয়তাবাদের লোভ সামলাতে হবে। আবেগী চিন্তাকে সম্মান করে এর সঙ্গে রাখতে হবে সবিনয় দূরত্ব। ক্রিকেট চলতে হবে ক্রিকেটীয় চিন্তার জ্বালানিতে। না হলে কিন্তু মরতে হবে জ্বলে-পুড়ে।

শেষে আরেকটা গল্প। বিশ্বকাপে উপমহাদেশের ক্রিকেটমুখিতা এবং ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার নিস্পৃহতা নিয়ে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে আলোচনা হচ্ছিল এক অভিজ্ঞ সাংবাদিকের সঙ্গে। অনেক দীর্ঘ আড্ডা, সবটা বলার নয়, বলার মতো যেটা সেটা বলি।

ভদ্রলোক এক পর্যায়ে হাসতে হাসতে বললেন, ‘আচ্ছা তোমরা বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলে কিন্তু শত্রু বাড়াচ্ছ?’

‘শত্রু বাড়াচ্ছি।’ আমি স্তম্ভিত।

‘ধরো, ভারতের সঙ্গে খেলা হলে বড় প্রতিবেশী হিসেবে সব রাজনৈতিক হিসাব মেলাতে চাও। পাকিস্তানের সঙ্গে খেলা হলে মুক্তিযুদ্ধ। ইংল্যান্ড হলে সেই পুরনো শোষণের কাহিনি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অভিযোগ, তোমাদের আমন্ত্রণ জানায় না। সবার সঙ্গেই দেখি তোমাদের সমস্যা! এ রকম উগ্রতা নিয়ে এগোলে তোমরা তো ক্রিকেটবিশ্বে বন্ধুশূন্য হয়ে যাবে।’

এমন উল্টা ব্যাখ্যা শুনে থ। আমরা তো ভাবছি ক্রিকেট দিয়ে পুরো বিশ্বে পরিচিত হচ্ছি, কিন্তু ভুল বিবেচনাবোধে শত্রুও যে তৈরি করছি সমান্তরালে সেটা বোধহয় খেয়ালই করছি না। 

এটাকে যদি ভাবনার বিষয় মনে হয় তাহলে একটু ভাবুন। আর যদি তা মনে না হয়...

তাহলে সকালে তালি আর বিকেলে গালি দিন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা