kalerkantho

ঘরেই মিলেছে ‘গোলের মানুষ’

১ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ঘরেই মিলেছে ‘গোলের মানুষ’

শেষ হতে চলল দীর্ঘ ফুটবল মৌসুম। মাঠের পারফরম্যান্সের ভালো-মন্দ মিলিয়ে ফুটবল গল্প অনেক। সেই গল্পের বড় একটা অংশজুড়েই থাকবে  দেশি ফরোয়ার্ডদের পায়ে সুরভি ছড়ানো ফুটবলের কথা। দেশি নতুনেও আলোকিত হয়েছে ফুটবল, সঙ্গে আবার নতুন চ্যাম্পিয়নও। এই ধারাবাহিকে ফুটবলের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন সনৎ বাবলা। ধারাবাহিকের দ্বিতীয় কিস্তি ছাপা হলো আজ।

প্রায় বিলুপ্ত হতে যাওয়া দেশি স্ট্রাইকারের জাতটা হঠাৎ গোলের ফুলে সুশোভিত-সুরভিত! ৯ বছর পর ঘরোয়া মৌসুমে গোলের ফুল ফুটেছে দেশি স্ট্রাইকারদের পায়ে। এত এত বিদেশির ভিড়ে প্রতিবারের মতো হারিয়ে না গিয়ে নাবিব নেওয়াজ-মতিন-তকলিছরা গোলে গোলে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন।

পেশাদার ফুটবলের এখন একাদশ মৌসুম চলছে। শুধু একবারই গোল গড়াগড়ি খেয়েছিল এক দেশি ফুটবলারের পায়ে। এনামুল হক আবাহনীর হয়ে ২০০৯-১০ মৌসুমে ২১ গোল করে সবাইকে ছাপিয়ে হয়েছিলেন সেরা। এরপর আর কেউ সেরা হতে পারেননি। হওয়ারও খুব সুযোগ ছিল না, ক্লাবগুলোর বিশেষ ভালোবাসার পাত্র হয়ে গিয়েছিল আফ্রিকান খেলোয়াড়রা। গোলের দক্ষতা থাক বা না থাক, প্রত্যেক দলে আফ্রিকানরাই গোলের মানুষ। তাদের আধিপত্যে বুড়িগঙ্গার ওপারে চলে যাওয়ার দশা হয়েছিল দেশি স্ট্রাইকারদের! দু-একজন অনিয়মিতভাবে খেললেও গোল তেমন পাননি। এবার হঠাৎ কী হলো কে জানে, দুই তরুণের পায়ে গোলের অফুরন্ত ফুলঝুরি! অথচ অবস্থাও বিশেষ বদলায়নি, আগের মতোই ক্লাবগুলোতে গোলের মূল ভরসার জায়গায় বিদেশিরা। আবার বিদেশির সংখ্যা বেড়ে চারে উন্নীত হয়েছে, তাই লড়াই হয়েছে আরো কঠিন। এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও বিদেশিদের সঙ্গে লড়ে আবাহনীর নাবিব নেওয়াজ ১৭ গোল করে লিগের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। এনামুলের সেই ২১ গোলের ৯ বছর পর কেউ পৌঁছেছেন এত কাছাকাছি। আরেকজনের হয়েছে আশ্চর্য ভাগ্য বদল। আগের মৌসুম সাইফের রিজার্ভ বেঞ্চে কাটিয়ে মতিন মিয়া বসুন্ধরা কিংসে এসে ১১ গোল করে দেশিদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে। ফিরতি লেগে ভাগ্য বদলে সাদা-কালোর তকলিছ আহমেদও করে বসেছেন ৭ গোল।

২০১৫ সাল থেকে নাবিব নেওয়াজ খেলছেন আবাহনীতে। তবে একাদশে নিয়মিত হতে পারেননি। আগের মৌসুমে পর্যাপ্ত সুযোগ পেয়েও গোল মিস করেছিলেন মুড়ি-মুড়কির মতো। সেই নাবিব এবারের লিগে ১৭ গোল এবং ৬ অ্যাসিস্টে দারুণ এক ‘ম্যাচ উইনার’। তবে পুরনো ক্ষোভ এবং প্রশান্তি মিশিয়ে এই স্ট্রাইকার বলছেন, ‘বিদেশিরা মিস করলেও একাদশে তাদের জায়গা নিশ্চিত থাকে। দেশিরা মিস করলে জায়গা হারাতে হয়, এটাই এখানকার বাস্তবতা। মারিও লামোসের কারণে আমি নিয়মিত খেলার সুযোগ পেয়েছি এবার, তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তিনি আমার ওপর ভরসা রেখেছেন এবং ম্যাচ খেলার সুযোগ দিয়েছেন। আমিও ট্রেনিংয়ে নিয়মিত শ্যুটিং ও ফিনিশিং প্র্যাকটিস করেছি, সুফলও পেয়েছি ম্যাচে।’

নাবিব নেওয়াজের সতীর্থ নাইজেরিয়ান সানডে চিজোবা ২০ গোল করে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেও বড় ম্যাচে থাকেন নিজের ছায়া হয়ে। সেই তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে নাবিব অনেক সপ্রতিভ, অনেক গুরুত্বপূর্ণ গোলের সঙ্গে আছে ফ্রি-কিক গোলও। ঘরোয়া ফুটবলে বদলে যাওয়া এ স্ট্রাইকার আত্মবিশ্বাসটা জাতীয় দলে সঞ্চার করতে চান, ‘একটি ম্যাচে একটি গোল আমাকে পরের ম্যাচে অনুপ্রাণিত করেছে। এখন মাঠে নামলেই মনে হয়, গোল কত সহজ ব্যাপার, এ রকম আত্মবিশ্বাস কাজ করে ভেতরে। এটা জাতীয় দলে নিয়ে যেতে পারলে...।’

জাতীয় দলে গোলের খুব দরকার। সেখানে গোলের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন আরেক তরুণ ফরোয়ার্ড মতিন মিয়া। দ্বিতীয় ম্যাচ থেকে বসুন্ধরা কিংসের জার্সিতে তাঁর লিগ শুরু। আবাহনীর বিপক্ষে সেই ম্যাচ তিনি দুর্দান্ত খেলে এবং একটি গোল করে দেন অপার সম্ভাবনার বার্তা। সেই থেকে সিলেটে ‘খেপ’ খেলে বেড়ে ওঠা এই ফুটবলার কিংসের নিয়মিত একাদশে। এত বিদেশির ভিড়ে জায়গা পাওয়াটাই ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, ‘সত্যি বললে, একাদশে জায়গা পাব কি না সে নিয়েই দুশ্চিন্তা ছিল বেশি। খেলার সুযোগ পেয়েই আমি গোল করেছি আর এতেই আমার জায়গা পাকা হয়ে যায় দলে। তবে এত ভালো মৌসুম আমি কল্পনাও করিনি।’ লিগে ১১ গোল করার আগে ফেডারেশন কাপ ও স্বাধীনতা কাপে করেছেন দুটি করে গোল, অর্থাৎ মৌসুমে তাঁর গোল সংখ্যা ১৫।

দুই ফরোয়ার্ডের পায়ে গোল হতে দেখে দারুণ খুশি জাতীয় দলের কোচ ডেমি ডে। তাঁর বড় আক্ষেপ ছিল গোলের মানুষ নিয়ে। সারা মাঠ খেললেও গোল করার মতো ভরসার কাউকে খুঁজে পাননি তিনি। এখন এই ব্রিটিশ কোচ আশায় বুক বাঁধছেন, ‘জীবন (নাবিব নেওয়া) ও মতিনের গোল পাওয়াটা জাতীয় দলের জন্য খুব ইতিবাচক। গোল জিনিসটাই হলো অভ্যাসের ব্যাপার। এত দিন ঘরোয়া লিগে নিয়মিত খেলার সুযোগ পায়নি বলে জাতীয় দলে গোলের সিচ্যুয়েশনে তারা নার্ভাস হয়ে পড়ত। এখন গোলের অভ্যাসটা তাদের তৈরি হয়েছে।’ ওই দুজন জাতীয় দলে খেলছেন, পাশাপাশি তকলিছ আহমেদও ৭ গোল করে আবার জাতীয় দলে ফেরার স্বপ্ন দেখছেন। আবাহনীকে ৪-০ গোলে হারানোর ম্যাচে আছে মোহামেডানের এই স্ট্রাইকারের জোড়া গোল। দেশি খেলোয়াড়দের পায়ে গোল দেখে রোমাঞ্চিত জাতীয় দলের সাবেক তারকা স্ট্রাইকার জাহিদ হাসান এমিলিও, ‘অনেক বছর পর আমাদের দেশের স্ট্রাইকাররা গোলের সুসংবাদ দিয়েছে। গত ছয়-সাতটি লিগে এটা দেখাই যায়নি। অনেক গোল করে তারা গোলদাতার তালিকায় ওপরের দিকে জায়গা করে নিয়েছে, এটা আমাদের সামগ্রিক ফুটবল এবং জাতীয় দলের জন্য খুব ইতিবাচক। দলের চার বিদেশির সঙ্গে লড়াই করে জীবন, মতিন, তকলিছরা গোল করে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। এটা দুর্দান্ত ব্যাপার।’

প্রথমে চার বিদেশির সঙ্গে লড়াই করে দলে জায়গা করার চ্যালেঞ্জ, এরপর গোল করে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করা। সব পরীক্ষায় উতরে তাঁরা হয়েছেন গোলের মানুষ।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা